২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

উপকূল সুরক্ষায় আরো এগিয়েছে সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্প

কৃষি শিল্প ও পর্যটনে নতুন দিগন্তের হাতছানি বিপুল

জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় বর্তমান সরকারের গৃহীত নানা মুখি কর্মপরিকল্পনার অন্যতম উপকূল সুরক্ষায় সুপার ডাইক নিমার্ণ প্রকল্প আরো এক ধাপ এগিয়েছে।

ইতোমধ্যে প্রকল্পের কারিগরী সমীক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কারিগরী কমিটিও ওই প্রকল্প অনুমোন করেছেন। আগ্রহী দাতা দেশ সমূহের কাছে প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে নেদারল্যান্ড ও চায়না উপকূল সুরক্ষা প্রকল্পে অর্থায়নে তাদের আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টি জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডে শীর্ষ কর্মকর্তাগণ।

প্রকল্পের কারিগরী সমীক্ষা, প্রকল্প অনুমোদন, আগ্রহী দাতা দেশ সমূহের কাছে প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়নের মধ্যদিয়ে আরো এক ধাপ এগিয়েছে উপকূল সুরক্ষায় সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্প।

বর্তমান সরকার বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকি মোকাবেলার সাথে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন ও স্ব নির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষে ডেল্টাপ্লান প্রণয়ন করেছেন। সরকারের গৃহীত ডেল্টাপ্লানের নানামুখি কর্ম পরিকল্পনার অংশ হিসাবে চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে কক্সবাজার থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের মীরেশ্বরাই হয়ে নোয়াখালীর রহমতখালী রেগুলেটর থেকে ফেনী রেগুলেটর পর্যন্ত পৃথক দুই প্রকল্পের ৬৪২ কিলোমিটার উপকূল সুরক্ষায় সুপার ডাইক নিমার্ণের উদ্যোগ গ্রহণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

একই সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ডে প্রধান প্রকৌশলী (নকশা) মোহাতার হোসেনকে প্রধান করে দেুইটি পৃথক কমিটি করে দেয়া হয়।

চলতি বছরের ১৮ আগস্ট দৈনিক নয়া দিগন্ত ও নয়া দিগন্ত অনলাইনে উপকূল সুরক্ষায় সুপার ডাইক নিমার্ণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ ও আপলোড করা হয়।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরকালে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আগামীতে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার বিপুল সম্ভাবনার কথা বলেছেন তা এই সুপার ডাইক বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাগণ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নেওয়া সুপার ডাইক নিমার্ণ প্রকল্পে রয়েছে কক্সবাজার জেলার বঙ্গোপসাগর উপকূল থেকে চট্টগ্রাম হয়ে জেলার মীরেশ্বরাই এবং ফেনীর রেগুলেটর থেকে নোয়াখালীর রহমতখালী রেগুলেটর ও পুরো হাতিয়াসহ ৬৪২ কিলোমিটার উপকূল সুরক্ষায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার উচু করে সুপার ডাইক নির্মাণ।

প্রথম পর্যায়ে ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০ হাজার ১৩২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এরমধ্যে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের মীরেশ্বরাই পর্যন্ত ৪৩০ কিলোমিটার সুপার ডাইক নিমার্ণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৪ হাজার ৩৬ কোট ৮৩ লাখ টাকা এবং অপর অংশে নোয়াখালীর রহমতখালী রেগুলেটর থেকে ফেনী রেগুলেটর পর্যন্ত ১২৬ কিলোমিটার ও পুরো হাতিয়া উপকূলের ৮৬ কিলোমিটারসহ ২১২ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রস্তাবিত সুপার ডাইক নিমার্ণ হবে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১০ মিটার উচু করে, এবং সুপার ডাইকের উপর দুই লেনের (মেটোরেভল পেভমেন্ট) সড়ক এবং তীরের দুই দিকে ঢাল সুরক্ষায় নেওয়া হবে বিশেষ ব্যবস্থা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিদের্শনার আলোকে গ্রহণকৃত প্রকল্পের আলোকে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা থেকে চট্টগ্রামের মীরেশ্বরাই পর্যন্ত ৪৩০ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের মধ্যে ১৯১ কিলোমিটার সন্দ্বীপ, ৬৩ কিলোমিটার কুতুবদিয়ায়, ধলঘাটায় ৩৮ কিলোমিটার এবং মহেশখালীতে ৯০ কিলোমিটার সুপার ডাইক নিমার্ণ করা হবে।

এছাড়া তা বাস্তবায়নে রেগুলেটর ৩০টি, কানেকটিং ব্রীজ ৭ টি(সাঙ্গু নদীতে ৬৮০ মিটার, জলকদর খালে ২৩২ মিটার, ছনুয়া খালে ১২০ মিটার, ইদগাহ খালে ১৪০ মিটার, বাকখালী খালে ২৫০ মিটার, মাতামুহুরী নদীতে ২৩০ মিটার ও বারুয়াখালী খালে নির্মিত হবে ১৬০ মিটার দীর্ঘ ব্রীজ)।

অপরদিকে, রহমতখালীর রেগুলেটর থেকে ফেনী রেগুলেটর পর্যন্ত ১২৬ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের মধ্যে ৭০টি রেগুলেটর, ১২টি ক্লোজার ও ব্রীজ একটি রয়েছে, এছাড়া পুরো হাতিয়ার ৮৬৯ কিলোমিটার সুপার ডাইক(ঢাল) নির্মাণ কাজ রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অলি আফাজ বলেন, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের মীরেশ্বরাই পর্যন্ত অংশে ৪৩০ কিলোমিটার সুপার ডাইক নিমার্ণে সম্ভাব্য ব্যয় এবার সংশোধিত করে ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নে কাজ খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে।

তিনি জানান, এই সমন্বিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকি ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসসহ যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত চট্টগ্রাম কক্সবাজার থেকে শুরু করে নোয়াখালী হাতিয়া জেলা পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের জীবন জীবীকার সুরক্ষার পাশাপাশি এই সুপার ডাইক কেন্দ্রকরে শিল্প পর্যটন ও কৃষি ক্ষেত্রে নতুন বিপ্লবের সূচনা ঘটবে।

তিনি বলেন, জেলার মীরেশ্বরাই বাস্তবায়নাধীন বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরী সীতাকুন্ড ইকোনোমিক জোন, কোরিয়ান ইপিজেড, চট্টগ্রাম বন্দর, বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন এস আলম কোল পাওয়ার প্লান্ট, কক্সবাজার জেলার মগনামাঘাট এলাকায় নৌবাহিনীর সাবসেনি স্টেশন, ধলঘাট এল এন জি টার্মিনাল ও কোল পাওয়ার স্টেশন, মহেশখালীর মেগা সিটি প্রকল্প, সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজমসহ শিল্প এলাকাসহ পুরো উপকূলীয় এলাকা সব ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগ হতে রক্ষা করবে এবং নতুন নতুন শিল্প কারকানা স্থাপনের মাইল ফলক হিসাবে কাজ করবে সুপার ডাইক। এছাড়া গৃহীত সুপার ডাইক প্রকল্পের অর্ন্তভুক্ত সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, ধলঘাটা ও মহেশখালী দ্বীপ পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষার মধ্যদিয়ে এই অঞ্চলের সামগ্রিক মান উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে উপকূলীয় এলাকার সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত সুপার ডাইকের সাগর অংশের বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চলে বৃক্ষ রোপনের মাধ্যমে টেকসই বনায়ন ও সমুদ্রের মধ্যে সম্মিলন ঘটিয়ে ইকোট্যুরিজম স্পট সৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। এছাড়াও প্রস্তাবিত সুপার ডাইক জুড়ে টেকসই উপকূলীয় বনায়নের মাধ্যমে পাখির অভয়ারণ্য সৃষ্টি করা হবে ফলে, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাকাসহ জীববৈচিত্রও সুরক্ষিত হবে বলে তিনি মনে করেন।

গৃহীত সুপার ডাইক প্রকল্পের অপর অংশ নোয়াখালীর রহমতখালী রেগুলেটর থেকে ফেনী রেগুলেটর পর্যন্ত ১২৬ কিলোমিটার ও পুরো হাতিয়া উপকূলের ৮৬ কিলোমিটারসহ ২১২ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণ প্রসংগে নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো নাসির উদ্দিন বলেন ইতোমধ্যে ২১২ কিলোমিটার সুপার ডাইক নিমার্ণের প্রকল্প প্রণয়ন কাজ খুব এগিয়ে চলছে বলে তিনি জানান।

সরকারের বিশেষ উদ্যোগ ডেল্ট পালানের অংশ হিসেবে সুপার ডাইকের আদলে গৃহীত চট্টগ্রামের মিরেশ্বরাইয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল (বেজা) বন্যা নিয়ন্ত্রণ সড়ক কাম বেড়িবাঁধ প্রতিরক্ষা নিষ্কাশন শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ ৫০ ভাগ সম্পন্ন হওয়ার মধ্যদিয়ে জাপান, কোরিয়া, চায়না, সৌদি আরব, সিংগাপুর, ভারতসহ দেশী বিদেশী বিনিয়োগকারীগণ ইতোমধ্যে ১৬.৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ শুরু করেছে বলে নিশ্চিত করেন সুপার ডাইক নিমার্ণ প্রকল্পের সদস্য সচিব ও পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম ডিভিশন-২ এর নিবার্হী প্রকৌশলী খ ম জুলফিকার তারেক।

তিনি বলেন, যেখানে শুধু মাত্র ২২.৫ কিলোমিটার অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ চলমান অবস্থায় দেশী বিদেশী বিনিয়োগকারিগণ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সেখানে পুরো উপকূল জুড়ে ৬৪২ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশে যে শিল্প বিপ্লব ঘটবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সুপার ডাইক প্রকল্পে চায়না ও নেদারল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলেও তিনি নিশ্চিত করে বলেন, দাতা দেশের সাথে এই প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ে সমঝোতার মধ্য দিয়ে খুব দ্রুত এই প্রকল্পের কাজ শুরু করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।


আরো সংবাদ