১৯ মে ২০১৯

৬০০ প্রেক্ষাগৃহে কানের উদ্বোধনী আয়োজন

কানের ৭২তম আয়োজনের মূল প্রতিযোগিতার বিচারকরা এক মঞ্চে - এএফপি

বড় কোন উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান একাধিক টিভি চ্যানেলে লাইভ হওয়ার খবর অনেক আছে। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে! তাও আবার ৬০০টিতে একযোগে প্রচার হয়েছে বিশ্বের সবেচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন চলচ্চিত্র উৎসব কানের ৭২তম আয়োজন। প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি ফ্রান্সের ক্যানাল প্লাস নামের একটি টিভি চ্যানেলেও অনুষ্ঠানটি সরাসরি দেখানো হয়েছে। 

কানের পালে দে ফেস্তিভাল ভবনের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে মঙ্গলবার দিবাগত রাত বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ১০ মিনিটে কান উৎসব উদ্বোধন করেন অস্কারজয়ী স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ার বারদেম ও ফরাসি অভিনেত্রী-গায়িকা চার্লোট গেইন্সবুর্গ। উভয়ে এর আগে কানে সেরা অভিনেতা ও সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছেন।

লালগালিচায় হাভিয়ার বারদেম ও চার্লোট গেইন্সবুর্গঅনুষ্ঠানের শুরুতে পর্দায় ভেসে ওঠে ‘ভারদা বাই আনিয়েস’ ছবির দৃশ্য। এতে দেখা যায়, সাগরপাড়ে পরিচালকের চেয়ারে বসে একা একা কথা বলছেন প্রয়াত ফরাসি নারী নির্মাতা আনিয়েস ভারদা। এই দৃশ্য শেষ হতেই আলোকিত মঞ্চে দেখা যায়, সেই চেয়ারটি পড়ে আছে। তাতে লেখা ‘আনিয়েস ভি.’। তার তারুণ্যের সময়কার একটি স্থিরচিত্র নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের উৎসবের অফিসিয়াল পোস্টার। মঞ্চে শূন্য চেয়ার রেখে এই কিংবদন্তিকে আরেকবার সম্মান জানানো হলো।

গত মার্চে ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আনিয়েস ভারদা। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পিয়ানোতে সুর তুলে ‘আই’ম অ্যান এম্পটি হাউস উইদাউথ ইউ’ গানটি গেয়েছেন বেলজিয়ান গায়িকা অ্যাঞ্জেলা।

৭১তম আসরের মতো এবারের উদ্বোধনী আয়োজনে মাস্টার অব সিরিমনিস (সঞ্চালক) ছিলেন এদুয়া বেয়া। তিনি বলেন, ‘সিনেমাই মানুষের উদ্দীপনা। ৭২তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বাগতম।’

বেলজিয়ান গায়িকা অ্যাঞ্জেলা

সঞ্চালকের আমন্ত্রণে একে একে মঞ্চে আসেন প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারক ফরাসি গ্রাফিক ঔপন্যাসিক-নির্মাতা এনকি বিলাল, মার্কিন নারী নির্মাতা কেলি রাইকার্ড, গ্রিসের পরিচালক ইওর্গস লানতিমোস, ইতালিয়ান নারী নির্মাতা অ্যালিস রোরওয়াচার, ফরাসি নির্মাতা রবিন ক্যাম্পিলো, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর অভিনেত্রী-পরিচালক মায়মুনা এনদাই, পোল্যান্ডের অস্কার মনোনীত পরিচালক পাওয়েল পাওলিকস্কি ও মার্কিন অভিনেত্রী এল ফ্যানিং।

প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারক প্যানেলের সভাপতি আলেহান্দ্রো গঞ্জালেজ ইনারিতু মঞ্চে আসার আগে তার বিভিন্ন ছবির অংশবিশেষ দেখানো হয় পর্দায়। তিনি বলেন, ‘স্প্যানিশ ভাষা যারা বোঝে না তাদের কাছেও সিনেমার সুবাদে তা মধুর হয়ে ওঠে। সিনেমার আবেগী দিক এটাই।’

এরপর ছিল অফিসিয়াল সিলেকশনের (প্রতিযোগিতা বিভাগ, প্রতিযোগিতা বিভাগের বাইরে, আঁ সার্তে রাগার ও মিডনাইট স্ক্রিনিং) ছবিগুলোর অংশবিশেষ। পৃথিবী গ্রহের নামিদামি তারকা ও চলচ্চিত্র কলাকুশলীরা লালগালিচায় পা মাড়িয়ে প্রেক্ষাগৃহে এসেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জুলিয়ান মুর, ইভা লঙ্গোরিয়া, গঙ লি প্রমুখ। মাঝে আঁ সার্তে রাগার বিভাগের বিচারকদের প্রধান লেবানিজ নারী নির্মাতা নাদিন লাবাকি ও ক্যামেরা দ'র বিভাগের মূল বিচারক কম্বোডিয়ান নির্মাতা রীতি পানকে পরিচয় করিয়ে দেন সঞ্চালক।

উদ্বোধনী মঞ্চে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের সভাপতি আলেহান্দ্রো গঞ্জালেজ ইনারিতুউদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দেখানো হয় প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত জিম জারমাশের ‘দ্য ডেড ডোন্ট ডাই’। এর প্রেক্ষাপট সেন্টারভিল নামের ছোট্ট একটি শহর। সেখানে হঠাৎ চোখে পড়ে ভুতুড়ে সব ব্যাপার। দিনের আলোর স্থায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে যায়। চাঁদ কখনও স্বাভাবিকের চেয়ে বড়-ছোট হতে থাকে। প্রাণীরা অস্বাভাবিক আচরণ দেখায়। কেউই এসবের কারণ জানে না। বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কেউ বুঝতে পারে না শহরে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে বিপজ্জনক জম্বিরা। সমাধি থেকে বেরিয়ে জীবন্ত লাশ হয়ে জীবিতদের ওপর আক্রমণের উৎসব শুরু করে তারা! কিন্তু পিছপা হলে তো চলবে না। শহরের বাসিন্দারা তাই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামে। রসালো আমেজে সাহসিকতার গল্প বলা হয়েছে ছবিটিতে। মঙ্গলবার ফ্রান্সে মুক্তি পেয়েছে এটি। ১৪ জুন থেকে আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রেক্ষাগৃহে দেখা যাবে এই ছবি।

‘দ্য ডেড ডোন্ট ডাই’তে অভিনয় করেছেন হলিউডের একঝাঁক তারকা। এ তালিকায় আছেন বিল মারে, অ্যাডাম ড্রাইভার, টিল্ডা সুইনটন, ক্লোয়ি সেভিনি, স্টিভ বুসেমি, ড্যানি গ্লোভার, ক্যালেব লান্ড্রি জোন্স, রোসি পেরেজ, ইগি পপ, সেলেনা গোমেজ, সারা ড্রাইভার, অস্টিন বাটলার, লুকা সাবাত, এস্টার বালিন্ত, ক্যারোল কেন ও টম ওয়েটস।

লালগালিচায় অ্যাডাম ড্রাইভার, সেলেনা গোমেজ ও ক্লোয়ি সেভিনিআমেরিকান নির্মাতা জিম জারমাশের ১৩তম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘দ্য ডেড ডোন্ট ডাই’। তার বিখ্যাত ছবির মধ্যে আছে ওয়েস্টার্ন ধাঁচের ‘ডেড ম্যান’, সামুরাই ক্রাইম ঘরানার ‘গোস্ট ডগ: দ্য ওয়ে অব দ্য সামুরাই’, ভ্যাম্পায়ার ফিল্ম ‘অনলি লাভারস লেফট অ্যালিভ’, ‘নাইট অন আর্থ’।

১৯৮৪ সালে ‘স্ট্রেঞ্জার দ্যান প্যারাডাইস’ ছবির জন্য কান উৎসবে সেরা নবীন পরিচালক হিসেবে ক্যামেরা দ’র পুরস্কার জেতেন জিম জারমাশ। সেটি ছিল আমেরিকার নতুনধারার মুক্ত চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি ল্যান্ডমার্ক। ১৯৯৩ সালে ‘কফি অ্যান্ড সিগারেটস: সামহোয়্যার ইন ক্যালিফোর্নিয়া’ বানিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পাম দ’র জেতেন তিনি। ২০০৫ সালে তার ‘ব্রোকেন ফ্লাওয়ার্স’ কানের গ্রাঁ প্রিঁ জিতে নেয়।

লালগালিচায় জুলিয়ান মুরসবশেষ ২০১৬ সালে কানের প্রতিযোগিতা বিভাগে স্থান পায় জিম জারমাশের ‘প্যাটারসন’। একই আসরে মিডনাইট স্ক্রিনিংসে ছিল রকতারকা ইগি পপ ও তার ব্যান্ড দ্য স্টুজেসের ওপর তার বানানো সংগীতনির্ভর প্রামাণ্যচিত্র ‘গিমে ডেঞ্জার’।

সাল দুবুসি থিয়েটারে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও ‘দ্য ডেড ডোন্ট ডাই’ দেখানো হয় আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের। রাত সাড়ে ৯টায় সাল বাজিনেও তাদের জন্য ছিল ছবিটির প্রদর্শনী।

এবার প্রতিযোগিতা বিভাগে বিচারকদের প্রধান হিসেবে থাকছেন অস্কারজয়ী মেক্সিকান নির্মাতা আলেহান্দ্রো গঞ্জালেজ ইনারিতু। আগামী ২৫ মে তিনিই স্বর্ণপাম জয়ী ছবির নাম ঘোষণা করবেন। সমাপনী আয়োজনেও সঞ্চালক থাকবেন ফরাসি অভিনেতা-নির্মাতা এদুয়া বেয়া।

১২ দিনের এই উৎসবে নতুন সব ছবি ও নানান আয়োজনে মুখর থাকবে দক্ষিণ ফরাসি উপকূল। এর মাধ্যমে বড় পর্দায় আন্তর্জাতিক ফিল্মমেকিংয়ের বৈচিত্র্যকে উদযাপন করা হবে।


আরো সংবাদ