২৬ আগস্ট ২০১৯

টঙ্গীতে ভ্যাট অফিসের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী হয়রানির অভিযোগ

-

টঙ্গীতে ঢাকা উত্তর কাস্টম কর্মকর্তাদের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড ও অত্যাচারে শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে অস্বস্তি ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ আছে, ভ্যাট অফিসের নানা ধরনের অনৈতিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলেই শিল্প মালিকদের উপর অত্যাচারের খড়গ নেমে আসছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্প মালিক এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসের অসৎ কর্মকর্তাদের অত্যাচারে বর্তমানে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। ইতোমধ্যে তাদের কারখানা ঋণগ্রস্ত, রুগ্ন ও দেওলিয়া হয়ে যাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রুগ্ন শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলেও ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন।
শিল্প মালিকরা অভিযোগ জানান, ভ্যাট নিবন্ধিত কারখানাগুলোকে প্রতিমাসে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসে নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে নির্ধারিত হারের মাসোহারা ছাড়া ভ্যাট অফিসে রিটার্ন গ্রহণ করা হয় না। এমনকি মাসোহারা ছাড়া ভ্যাট অফিসে রিটার্ন নিয়ে যেতে নিষেধ করে দেয়া হয়। যেসব ব্যবসায়ী অনৈতিক দাবির বিনিময়ে রিটার্ন দাখিল করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তাদের বিরুদ্ধে রিটার্ন দাখিল না করার অভিযোগে অনিয়মের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। কথিত অনিয়মের এসব মামলায় জবাব ভ্যাট অফিসের মনমতো না হলে জবাব গ্রহণ করা হয় না। কর্মকর্তাদের নিজস্ব মতামত ও নির্দেশনা অনুযায়ী জবাব দাখিল করতে বলা হয়। প্রকৃত সত্য ও বাস্তব অবস্থা তুলে ধরে জবাব দাখিল করতে বাধা দেয়া হয়। মামলার জরিমানা থেকে অব্যাহতি দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের (রাজস্ব কর্মকর্তাদের) ইচ্ছেমতো জবাব দাখিল করতে বলা হয়। অনেকে সরল বিশ^াসে রাজস্ব কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী জবাব দাখিল করার পর জবাব সন্তোষজনক না হওয়ার অজুহাতে তাদের উপর মোটা অংকের জরিমানা আরোপ করা হয়। ভ্যাট অফিসের এমন আদেশের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে গেলে সেখানেও একইভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন ব্যাবসায়ীরা। মামলার জবাব ছাড়াও মূল্য ঘোষণা ও যেকোনো চিঠিপত্র জমা দিতে গেলে ভ্যাট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগে পালাক্রমে পড়ে দেখেন। তারা সন্তষ্ট হলে পরে টাকার বিনিময়ে পত্র গ্রহণ করেন। অন্যথায় ফেরত দিয়ে দেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এসব অভিযোগ করলে অভিযোগ আমলে না নিয়ে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তার সাথেই আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিয়ে ফেরত পাঠানো হয় বলে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন।
একজন ব্যবসায়ী জানান, কাস্টম কর্মকর্তারা ভ্যাট আইনের ৬২ ধারায় ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রেখেছেন। কথায় কথায় এসব রাজস্ব কর্মকর্তা ৬২ ধারার উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা এই ধারা অনুযায়ী চলি। আমাদের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো অভিযোগ করা যাবে না। এই আইনটি পড়ে যান, পারলে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু কইরেন।’ ভ্যাট অফিস দ্বারা হয়রানি ও আরো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যবসায়ীরা এসব অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগী প্রবাসী তরুণ ব্যবসায়ী আমির হোসেন জানান, তিনি তার কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিসিকের একটি কারখানায় বিনিয়োগ করেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রতারণা করে তার টাকা আত্মসাৎ করেন এবং সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও ব্যক্তির কাছে ঋণী হয়ে যান। একপর্যায়ে আদালত কোম্পানিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে আদালত কোম্পানির আয় থেকে দায় শোধ করার জন্য দেওলিয়া ঘোষিত রুগ্ন শিল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে দায়িত্ব ন্যাস্ত করেন।
নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সমাজের বঞ্চিত, অশিক্ষিত, শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের কাজে লাগিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। কোম্পানিটি প্লাস্টিক স্যান্ডেলের জুতা উৎপাদন করে। যার বর্তমান মূল্য ২৫ টাকা হতে ৭৫ টাকার মধ্যে। বর্তমান ভ্যাট আইনে দেড় শ’ টাকার প্লাস্টিক জুতার মূল্য ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত। তথাপি কাস্টম অফিসে শূন্যহারে রিটার্ন দাখিল করতে গেলে মাসোহারা না দেয়ার কারণে কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে বিভিন্নভাবে নাজেহাল করা হচ্ছে। সর্বশেষ কাস্টম কর্মকর্তারা গত ৬ মার্চ কোম্পানির যাবতীয় কাগজপত্র এমনকি ভ্যাট সংশ্লিষ্ট নয় এমন কাগজপত্র ও দলিলাদি জব্দ করে নিয়ে যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ফেরত দেয়ার আশ^াস দেয়া হলেও এগুলো আজো ফেরত দেয়া হচ্ছে না। কাগজপত্র ফেরত চেয়ে উত্তরায় কাস্টম অফিসে কারখানা কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করলে তাদের চার কোটি টাকার কাল্পনিক হিসাব ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়, ‘আপনারা চার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন, এতে ৬০ লাখ টাকার ট্যাক্স ফাঁকির আদেশ হবে। আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে আপিল করতে গেলে ১০ ভাগ টাকা আগাম জমা দিতে হবে। এতে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, এখন কী করবেন আপনি সিদ্ধান্ত নেন।’
ব্যবসায়ী আমির হোসেন বলেন, আমি কোনো ভ্যাট ফাঁকি দেইনি বরং আমার পণ্য ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত থাকা সত্ত্বেও এর সুফল ভোগ করতে পারছি না। উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কারণ, আমার কোম্পানি দেওলিয়া ও ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে সরাসরি কাঁচামাল আমদানি করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে অন্যের সাহায্য নিয়ে কমার্শিয়াল লাইসেন্সের মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানিকালে ৫% অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি) দিয়ে থাকি। এতে আমার কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, যা ফেরত পাচ্ছি না। এতে সরকার লাভবান হচ্ছে।
এই বৈষম্যের কারণে রুগ্ন শিল্প আরো রুগ্ন হচ্ছে। এতে আমরা বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছি না। আমি কাস্টম কর্মকর্তাদের অনুরোধ করে বলি, আপনাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ, এখন আমার ডকুমেন্টগুলো ফেরত দিয়ে দেন। তখন তারা এই অফিস থেকে সেই অফিস, এক অফিসার থেকে অন্য অফিসার এভাবে আমাকে অহেতুক ঘুরাতে থাকেন। টঙ্গী বিভাগের এসি আব্দুল হান্নান বলেন, কমিশনার অফিসে আপনার জব্দকৃত মালামাল আছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে মামলা হবে। তারপর জব্দকৃত মালামাল ফেরত পাবেন। কিন্তু মামলা হচ্ছে না, আবার মালামালও ফেরত দেয়া হচ্ছে না। অপর দিকে, গত ১৫ এপ্রিল একটি কাল্পনিক দাবি ধার্য করে ১৫ দিনের মধ্যে এর জবাব চাওয়া হয়। এর আগে গত ১৮ মার্চ মালামাল ফেরত নেয়ার জন্য টঙ্গী বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) বরাবরে লিখিত আবেদন জানাই। কিন্তু জব্দকৃত মালামাল এখনো ফেরত দেয়া হয়নি। এ অবস্থায় গত ২৭ এপ্রিল নোটিশের জবাবে আমরা জানাই, আমাদের দলিলাদি ও প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জব্দ করা আছে আপনাদের অফিসে, আমাদের হাতে কিছুই অবশিষ্ট নাই। শুধুমাত্র স্মৃতি দিয়ে জবাব দেয়া সম্ভব নয়। আমাদের জব্দকৃত মালামাল ফেরত দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা ও নোটিশের জবাব দেয়ার সুযোগ দানের অনুরোধ জানাই। তথাপি অদ্যাবধি কাগজপত্র ফেরত না দিয়ে আমাদের প্রতি মারমুখী আচরণ করেন ঢাকা উত্তর বিভাগের ডেপুটি কমিশনার শরফুদ্দিন মিয়া। এভাবে আমাদের ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ দিকে এ ব্যাপারে কাস্টম, এক্সাইজ ও ভ্যাট, টঙ্গী বিভাগের সহকারী কমিশনার ও বিভাগীয় কর্মকর্তা মো: আব্দুল হান্নানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ব্যবসায়ী আমির হোসেনের আলোচিত প্রতিষ্ঠানে আমরা নিজেদের সিদ্ধান্তে অভিযান পরিচালনা করিনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমরা তার কারখানায় পরিদর্শন বা অভিযান পরিচালনা করেছি। এখানে আমাদের কিছুই করার ছিল না। ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে অভিযানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত হলে পণ্যের গায়ে অমোচনীয় কালি দ্বারা মূল্য লেখা থাকার নিয়ম রয়েছে। সেখানে এই নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে কি না তাও তদন্ত করে দেখতে হবে।


আরো সংবাদ