১৯ আগস্ট ২০১৯

টানা ধর্মঘটে নাগরিক সেবা ভেঙে পড়েছে সব পৌরসভায় ৮৭ শতাংশ পৌরসভার ২ থেকে ৭৫ মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া

-

বেতন-ভাতা পরিশোধসহ পেনশন চালুর দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়েছে পৌরসভাগুলো। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের সব পৌরসভায় নাগরিকসেবা অনেকটা ভেঙে পড়েছে। ৩২৮টি পৌরসভায় ৩২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। দাবি-দাওয়া নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজধানীতে অবস্থান করায় অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছেন মেয়ররা। এ দিকে অচল পৌরসভা সচল করার কার্যকর উদ্যোগও নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো: তাজুল ইসলাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সাথে দেখা করলেও মন্ত্রীদের বক্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারেননি বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। ফলে দাবি আদায়ে অনড় রয়েছেন তারা। তবে শিগগিরই সরকারের তরফ থেকে সঙ্কট সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হবে বলে মনে করছেন পৌরসভার মেয়র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির প্রতি আমাদের সহানুভূতি আছে। স্থানীয় সরকারের একটি আইনে আছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা পৌরসভা বহন করবে। কিন্তু নতুন পে-স্কেল চালু হওয়ার পর থেকে তাদের বেতন-ভাতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আংশিক হলে দিতে পারত। কিন্তু পুরো বেতন অনেক পৌরসভা দিতে পারছে না। তার পৌরসভায়ও চার মাসের বেতন বকেয়া পড়েছে বলে তিনি জানান। পৌরসভার বর্তমান সেবা কার্যক্রম প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা না থাকায় নাগরিক সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমসহ সব সেবা শুধু বিঘিœত হচ্ছে না, নাগরিক সেবা ভেঙে পড়েছে। সেবা দিতে না পেরে জনগণের কাছে আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ হতে হচ্ছে। আমরা আশা করছি, শিগগিরই সরকারের পক্ষ থেকে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।
রাজবাড়ী সদর পৌরসভার মেয়র মো: আলী চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঢাকায় অবস্থান করলেতো নাগরিক সেবা কার্যক্রমে ভোগান্তি হবেÑ এটা স্বাভাবিক। আগে পানি সাপ্লাই দিতাম তিনবার, এখন দিচ্ছি দুইবার।
রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গত রোববার দুপুর থেকে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছে বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। দাবি-দাওয়াসহ গতকাল নানা বিষয়ে কথা হয় রাজবাড়ী জেলা পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো: আব্দুর রবের সাথে। তিনি জানান, বারবার আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কড়া নাড়ছি। কিন্তু আশাতীত কোনো সাড়া পাচ্ছি না। গত ১৫ জুলাই স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সাথে দেখা করে আমাদের দাবির কথা জানিয়েছি। মন্ত্রী খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় আমরা এখনো অবস্থান করছি। মো: আব্দুর রব বলেন, এর আগে কর্মসূচি পালনকালে সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন। আশ্বাসের এক বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজবাড়ীর ১০১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ৯৩ জন এখানে অবস্থান করছি। যেহেতু এটা আমাদের শেষবারের দাবি, আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা যাব না। একই কথা বলেছেন, মৌলভীবাজার পৌরসভার অ্যাকাউন্ট্যান্ট উজ্জ্বল চন্দ্র দেব। তিনি জানান, ৬৪ জন স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রায় সবাই এখানে অবস্থান নিয়েছেন। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি। শান্তাহার পৌরসভার পাম্পচালক মো: তুহিন ইসলাম বলেন, ৬১ মাস বেতন হয় না। আমরা মানবেতর জীবন-যাপন করছি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো: আব্দুল আলীম মোল্যা নয়া দিগন্তকে বলেন, গত ১৪ জুলাই থেকে প্রেস ক্লাবের সামনে আমরা অবস্থান নিয়েছি। প্রবল ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে পলিথিন দিয়ে তাঁবু টানিয়ে বিভিন্ন পৌরসভা থেকে আগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। গত এক সপ্তাহে অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলামসহ ১০৯ জন অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ১৬ জুলাই চুনারুঘাট পৌরসভার সচিব মোবারক হোসেন আন্দোলনরত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি জানান, আজ (শনিবার) সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবের সাথে দেখা করে আমাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, বিষয়টি দেখবেন। কিন্তু মন্ত্রীর আশ্বাসে আমরা আশ্বস্ত হতে পারছি না। সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রস্তাব মন্ত্রী আমাদের দেননি, দাবিও মেনে নেননি। এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল আলীম মোল্যা বলেন, পুলিশকে দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে, চাকরিচ্যুতির হুমকি-ধমকি দিয়ে কোনো কাজ হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের দাবি আদায় না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। আশা করি, হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের দিকে তাকিয়ে প্রধানমন্ত্রী সমাধান করবেন।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, আগের বেতন স্কেল অনুযায়ী পৌরসভাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে ব্যয় হতো ৩৫৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। নতুন বেতন স্কেলে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা হয়েছে। যা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। নতুন স্কেলে বেতন পরিশোধ করা দুই শতাধিক পৌরসভার সক্ষমতা নেই। আর দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ পৌরসভার ২ মাস থেকে ৭৫ মাস পর্যন্ত বেতন বকেয়া পড়েছে।


আরো সংবাদ