১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নারায়ণগঞ্জে বেড়েছে নৃশংস খুন

ইমাম ও প্রহরীকে গলা কেটে হত্যা
-

নারায়ণগঞ্জে হঠাৎ করে বেড়ে গেছে নৃশংস খুনের ঘটনা। গত এক মাসের মধ্যে মসজিদের ইমামসহ পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি খুনের উদ্দেশ্যে ছুরিকাঘাতের ঘটনাও বেড়েছে অনেক। এসব ঘটনায় জনমনে বেড়ে গেছে আতঙ্ক।
জেলার সোনারগাঁও উপজেলার মল্লিকপাড়া এলাকার নারায়ণদিয়া বায়তুল জালাল জামে মসজিদের ইমাম দিদারুল ইসলামকে গলা কেটে হত্যার পর মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে পায়ের কাছে। রক্ত রঞ্জিত বিছানা। প্রথম দেখাতেই যে কেউ আঁতকে উঠবেন। মসজিদের ভেতরেই হত্যা করা হয় তাকে। ফজরের নামাজের সময় মুসল্লিরা এসে ইমামকে না পেয়ে নিজেরাই নামাজ আদায় করেন। পরে তারা ইমামের শয়ন কক্ষে ফ্যানের শব্দ শুনে সেখানে গিয়ে ইমামের গলাকাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেন। গত ২১ আগস্ট রাতে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরদিন পুলিশ ইমামের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে।
এর আগের দিন ২০ আগস্ট গলা কেটে হত্যা করা হয় ফতুল্লার শাহীবাজার এলাকার নৈশ প্রহরী আবুল কালাম আজাদকে (৫০)। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে নগরীর দেওভোগ নাগবাড়ি এলাকায় ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি সোলায়মান হোসেন অপুকে (২৮)।
ইমামকে গলা কেটে হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ বলেন, এখানে যে রুমে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সে রুমের পুরনো তালা খুলে ঘাতকেরা নতুন তালা লাগিয়ে গেছে। তাতে আমরা মনে করছি, কোনো একটি চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে খুন করেছে।
এসপি বলেন, খুলনার তেরখাদা এলাকায় নিহত ইমামের বাড়ি। তিনি (ইমাম) বেশি দিন হয়নি এখানে এসেছেন। ঈদের ছুটিতে সাত দিন নিজ বাড়িতে ছিলেন। আমরা সব কিছুই খতিয়ে দেখছি। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না তিনি কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
পুলিশ বলছে, এটি একটি ক্লুলেস মার্ডার। নিহতের বড় ভাই মিজানুর রহমান বাদি হয়ে এ ঘটনায় অজ্ঞাত আসামি করে সোনারগাঁও থানায় মামলা দায়ের করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সোনারগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ বলেন, এখনো কোনো ক্লু নেই। তবে আশার আলো দেখছি। আমরা তিনটি মোটিভ ধরে তদন্ত করছি। আশা করছি খুব শিগগিরই হত্যাকাণ্ডের রহস্য বের করতে পারব।
গত শুক্রবার রাতে ফতুল্লার দেওভোগে সন্ত্রাসীরা ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে অপু (২৮) নামক এক ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে। ফতুল্লা মডেল থানা সীমান্তে দেওভোগ নাগবাড়ী মন্দির এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত অপু ফতুল্লা থানার দেওভোগ তাঁতিপাড়া এলাকার আজিজ মিয়ার ভাড়াটিয়া রমজান মিয়ার ছেলে। গত শনিবার দুপুরে নিহতের বাবা রমজান মিয়া ফতুল্লা মডেল থানায় এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরো সাত-আটজনকে আসামি করা হয়েছে।
নিহত সোলেয়মান হোসেন অপু মণ্ডলপাড়ায় কাশেম ডেকোরেটরে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। তার বাবা রমজান ও মা শাহানার অভিযোগ, পাওনা টাকা নিয়েই অপুকে হত্যা করা হয়। পুলিশ হত্যাকাণ্ডের পরপরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পারভেজ নামে এক যুবককে আটক করেছে।
ফতুল্লা থানার ওসি আসলাম হোসেন জানান, এসব হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে। তবে এসব অপরাধের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে বা হচ্ছে। আগামীতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ রয়েছে।
গত ২১ আগস্ট ফতুল্লার পাগলা শাহিবাজার এলাকায় আবুল কালাম (৫০) নামে নৈশ প্রহরীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে এলে নৈশপ্রহরী বাধা দেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা পুলিশের। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করেছে।
গত ১২ আগস্ট ঈদের রাতে ফতুল্লার পাগলা এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন রাকিব (২০)। তার দেহের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে সন্ত্রাসীরা। নিহত রাকিব ফতুল্লার নয়ামাটি মুসলিমপাড়া এলাকার মজিদ হাওলাদারের বাড়ির ভাড়াটিয়া নওশেদ বেপারির ছেলে।
হত্যাকাণ্ডের সময় রাকিবের সাথে থাকা বন্ধু আবদুল্লাহ জানান, ভোর ৪টায় কেনাকাটা শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। তাদের বহন করা রিকশা পাগলা রেলস্টেশন এলাকায় এলে একই এলাকার মানিকসহ চার-পাঁচজন পথরোধ করে রিকশাটি আটকায়। তখন দুর্বৃত্তরা রাকিবকে চোর আখ্যায়িত করে ধাওয়া দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় চারজন গ্রেফতার হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধান আসামি মানিক ওরফে গিয়ার মানিককে গ্রেফতারের পরই সে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছে।
গত ১০ আগস্ট ফতুল্লার দেলপাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জুম্মন নামে এক যুবককে। নিহত জুম্মন কুতুবপুর ইউনিয়নের দেলপাড়া রঘুনাথপুর এলাকার কাইয়ুমের ছেলে। শাবল দিয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা।
গত ২৮ জুলাই রাতে ফতুল্লার দেওভোগ হাশেমনগর এলাকায় মো: শাকিল (৩০) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। রাত ১২টায় তিনি শহরের ২ নম্বর রেল গেট এলাকা থেকে মোটরসাইকেলে বাংলাবাজার বাসায় ফেরার পথে দেওভোগ হাশেমনগর এলাকায় একদল মুখোশধারী যুবক পথ রোধ করে তাকে এলোপাতাড়ি কোপায়। পরে হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান।

 

 


আরো সংবাদ