২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

দ্বিতীয় শ্রেণীতে বিশের নামতা!

-

দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি পাঠ্যবইয়ে ১০ পর্যন্ত গুণের নামতা রয়েছে; কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক শাখায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে ২০ পর্যন্ত গুণের নামতা শেখানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিশের নামতা ব্যবহার করে চার অঙ্কের সংখ্যাকে ভাগ করা পর্যন্ত শেখানো হচ্ছে।
অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, ক্লাসে ১৯ বা ২০-এর নামতা ব্যবহার করে তিন বা চার অঙ্কের সংখ্যাকে ভাগ করা শেখানো হলেও বাস্তবে এসব শিশুরা শিখতে পারছে না। কারণ এটা ধারণ করার বয়স তাদের হয়নি। রাজধানীর বনশ্রীতে অবস্থিত নাম করা একটি বেসরকারি স্কুলের একজন অভিভাবক এ প্রতিবেদককে তার দ্বিতীয় শ্রেণী পড়–য়া সন্তানের হোমওয়ার্ক ও ক্লাস খাতা দেখান। চলতি সপ্তাহের একটি হোমওয়ার্ক খাতায় দেখা যায়, ৯৬৯কে ১৯ দিয়ে ভাগ করানো হয়েছে। এ অভিভাবক বলেন, তার সন্তান তাকে বলেছে, ক্লাসে ৯৬৯কে ১৯ দিয়ে ভাগ করানো শেখানো হয়নি। শিক্ষক শুরু করেছিলেন; কিন্তু শেষ করতে পারেননি। ঘণ্টা পড়ে গেছে।
ওই অভিভাবক বলেন, দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি শিশুকে ২০ ঘর পর্যন্ত নামতা মুখস্থ করতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। তাদেরকে পিটিয়ে হয়তো নামতা মুখস্থ করানো যায়; কিন্তু এর প্রয়োগ তো তাদের শেখানো যাচ্ছে না। কারণ ১৯, ২০-এর নামতা দিয়ে চার অঙ্কের সংখ্যাকে ভাগ তাদের শেখানো যাচ্ছে না। এটা ধারণ করার বয়স তাদের হয়নি। তা ছাড়া জোর করে ২০ পর্যন্ত নামতা মুখস্থ করানো গেলেও তা তাদের জন্য মনে রাখা খুব কঠিন। দীর্ঘ ও নিয়মিত চর্চা দরকার। আর সেটিও করাতে হয় তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে।
একজন অভিভাবক জানান, অনেক মা-বাবা শিশুদের পড়তে বসার জন্য পেটায়। এরপর পড়তে বসে পড়ায় অনোযোগী হলে পেটায়, আর পড়ায় বা লেখায় ভুল করলেও পেটায়। ক্লাস টেস্টে নম্বর কম পেলে অনেক মা-বাবা বাসায় এনে সন্তানদের পেটায়। এভাবে পদে পদে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিশুরা। এর প্রধান কারণ লেখাপড়া শিশুদের জন্য অনেক কঠিন করা হয়েছে।
এ দিকে অনেক অভিভাবক সরকারি স্কুলে শিশুদের ভর্তি করানোর বিষয়ে আগ্রহী হলেও রাজধানীতে রয়েছে সরকারি স্কুলের তীব্র সঙ্কট। অনেক এলাকায় একেবারেই কোনো সরকারি প্রাইমারি স্কুল নেই। আবার যেসব এলাকায় সীমিত স্কুল রয়েছে তার নিম্নমানের কারণে অনেকে চাইলেও তাদের সন্তানদের শেষ পর্যন্ত ভর্তি করানোর সাহস পান না।
রাজধানীতে বিপুল জনসংখ্যার বিপরীতে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের তীব্র সঙ্কটের কারণে হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে দীর্ঘ পরিক্রমায়। একজন অভিভাবক বলেন, বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করছে কে কত বেশি বই পাঠ্য করতে পারে আর লেখাপড়া কত কঠিন আর ভারী করা যায় সে জন্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বেসরকারি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ মনে করে বেশি বই পাঠ্য না করলে বা পড়ালেখা কঠিন না করলে অভিভাবকেরা আগ্রহী হন না সন্তানদের ভর্তি করাতে। বেশি বই পাঠ্য করলে আর পড়ালেখা কঠিন করলে সন্তানরা অধিক শিখবে বলে মনে করেন অনেক অভিভাবক। এ ছাড়া অনেক অভিভাবক এসে বলেন, অমুক স্কুলে অমুক বই পড়ায়; আপনারা পড়ান না কেন। এভাবে অধিক বই পড়ানোর বিষয়ে অভিভাবকদেরও চাপ থাকে অনেক ক্ষেত্রে। তা ছাড়া কেউ নতুন কোনো স্কুল প্রতিষ্ঠা করলে তাদের অনেকে অনুসরণ করে নাম করা স্কুলের লেখাপড়ার পদ্ধতি। এভাবে রাজধানীর প্রায় সব বেসরকারি স্কুলের প্রাথমিক শাখার লেখাপড়া দিনে দিনে শুধু কঠিন আর ভারী হয়েছে।


আরো সংবাদ