১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

থ্যালাসেমিয়ার ওষুধ উৎপাদন করছে জুলফার বাংলাদেশ

-

মাঠের একপাশে উদাস মনে বসে আছে তের বছর বয়সী রাফি। চোখ মাঠে খেলতে থাকা প্রায় তারই সমবয়সী শিশুদের দিকে হলেও মনে হচ্ছে সে আসলে কিছুই দেখছে না। কেন সে শিশুদের সাথে খেলছে না- কাছে গিয়ে জানতে চাইলে রাফি প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। তারপর আস্তে করে বলে, আমি দৌড়াতে পারি না। অল্পতেই হাঁপিয়ে যাই। তখন মনে হলো আসলেই তো রাফিকে কেমন জানি রোগা মনে হচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে সে জানায়- তার থ্যালাসেমিয়া। তিন মাস পর পর রক্ত দিতে হয়। ডাক্তার বেশি দৌড়-ঝাঁপ করতে নিষেধ করেছেন।
সূত্র মতে, বাংলাদেশের শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ মানুষ থ্যালাসেমিয়া ও হিমোগ্লোবিন-ই বাহক রোগে আক্রান্ত। দেশে প্রতি বছর প্রায় সাত হাজার শিশু এ রোগ নিয়ে জন্ম নেয়।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের থ্যালাসেমিয়া সেন্টারের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা: ওয়াকার এ খান বলেন, থ্যালাসেমিয়া মূলত জন্মগত রক্তঘাটতিজনিত একটি রোগ, যা শিশুর শারীরিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে এবং তাদের দুর্বল করে দেয়। যদি বাবা-মা দু’জনেই থ্যালাসেমিয়া রোগটি বহন করে তবে তাদের শিশুদের থ্যালাসেমিয়া রোগের মাত্রা বেশি থাকে। তবে থ্যালাসেমিয়া বহন করে এমন দু’জন নারী-পুরুষ যদি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হন তবে শিশুর ক্ষেত্রে এ রোগ অনেকটা প্রতিহত করা যায়।
ওয়াকার এ খান বলেন, এ রোগে রক্তের লাল সেলটি নষ্ট হয়ে যায় এবং তা অনেক সময় অ্যানিমিয়াতে রূপ নেয়। এর ফলে শিশুরা অক্সিজেন কম গ্রহণ করতে পারে। কারণ তার শরীরে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিনের অভাব হয়। এতে করে শরীরে আরো নানা ধরনের রোগব্যাধি বাসা বাঁধে।
ডা: ওয়াকার বলেন, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুরা যে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না- তা কিন্তু নয়। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত একজন শিশু অ্যানেমিয়ায় ভোগে এবং শারীরিকভাবে দুর্বল থাকে। শিশুটি অন্য সুস্থ শিশুর মতো খেলাধুলা করতে পারে না এবং প্রায় সময় সে শ্বাসকষ্টে ভোগে। লিভার ও প্লীহা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে অস্থিমজ্জা ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে পুরোপুরি এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তবে এ চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক ব্যয়বহুল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে থ্যালাসেমিয়া রোগ বহন করে এমন ব্যক্তি বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ না হওয়া অথবা বিয়ে করলেও যেন তারা সন্তান ধারণ না করে। তবেই নতুন শিশু এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। এ জন্য বিয়ের আগে নারী-পুরুষ উভয়ের অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। যাতে করে আগে থেকেই যেন বুঝা যায় কেউ এ রোগ বহন করছে কি না।
এ দিকে দেশে প্রথমবারের মতো থ্যালাসেমিয়ার ওষুধ উৎপাদন করছে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বহুজাতিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জুলফারের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান জুলফার বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির সিইও সেলিম সোলায়মান বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পাশে থাকার অংশ হিসেবে আমরা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়রন চিলেটর হিসেবে ব্যবহৃত ওষুধ ডেফেরাসিরক্স চিলোভা উৎপাদন শুরু করেছি। এ ছাড়া বাংলাদেশের সব সরকারি হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে ব্লাড টেস্ট করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, মূলত অসচেতনতার কারণে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষ যদি একটু সচেতন হয় তবে বাংলাদেশে এ রোগের সংখ্যা অনেক কমে যাবে। তিনি বলেন, রোগটির চিকিৎসা আসলেই অনেক ব্যয়বহুল। তিনি গরিব রোগীদের চিকিৎসায় এগিয়ে আসার জন্য ধনী ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান।


আরো সংবাদ