২৩ অক্টোবর ২০১৯

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসির উত্তরপত্র জালিয়াতির ঘটনায় ৪ কর্মচারী বরখাস্ত

-

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসির উত্তরপত্র জালিয়াতির সাথে সরাসরি চারজন কর্মচারী জড়িত বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এদের মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে শিক্ষা বোর্ডের রেকর্ড সাপ্লায়ার গোবিন্দ চন্দ্র পাল, অফিস সহায়ক মনির হোসেন, নিতাই ও শংকর চন্দ্র। এইচএসসিতে উচ্চতর গণিত বিষয়ে জালিয়াতি ধরা পড়ার পর গত ৮ আগস্ট গোবিন্দকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর ঘটনা তদন্তে গত ১৮ আগস্ট মাউশির বরিশালের পরিচালক প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘ এক মাস পরে গত ২৪ সেপ্টেম্বর তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয় কমিটি। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে গত ১ অক্টোবর অফিস সহায়ক মনিরুল ইসলাম, শংকর চন্দ্র ও নিতাইকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে স্বীকার করেন শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মো: ইউনুচ।
তদন্ত কমিটির প্রধান মাউশির পরিচালক প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আমরা সুপারিশ করেছিলাম দুই-একজনকে গ্রেফতার করে আসল ঘটনা উদঘাটনের পর যেন বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু চেয়ারম্যানকে আগেই বরখাস্ত করায় তারা হয়তো পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
কিভাবে তদন্ত করল কমিটি
শিক্ষা বোর্ডে উত্তরপত্র জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ার পর চলতি বছরের ১৮ আগস্ট বিকেলে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে চিঠি দেন শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন। সদস্য ছিলেন শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক লিয়াকত হোসেন সিকদার ও বিদ্যালয় পরিদর্শক আব্বাস উদ্দীন। যেদিন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় ওই দিনই অফিস করেছে প্রধান অভিযুক্ত গোবিন্দ চন্দ্র পাল। কমিটি গঠনের প্রায় এক সপ্তাহ পর কাজ শুরু করে তদন্ত কমিটি। ততদিনে হাওয়া হয়ে যান গোবিন্দ্র চন্দ্র পাল। ১৮ আগস্টের পর থেকে গোবিন্দকে আর কোথাও দেখা যায়নি। কেউ বলছেন, গোবিন্দ ভারতে, কেউ বলছেন দেশেই। তদন্ত কমিটির সদস্যরা শিক্ষা বোর্ডের ৫০ জন কর্মচারী, উচ্চতর গণিতের পরীক্ষক, নিরীক্ষক, প্রধান পরীক্ষক ছাড়াও জালিয়াতির সাথে জড়িত পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলেন। তবে শুরুর দিকে আসল ঘটনা বের করতে ব্যর্থ হয় কমিটি। কারণ অভিভাবকেরা কমিটির সামনে কথা বলেন ওকালতি ভাষায়। প্রত্যেক অভিভাবককে আলাদাভাবে জিজ্ঞেস করা হলেও প্রত্যেকের মুখে ছিল শেখানো বুলি। তাদের সাফ কথাÑ গোবিন্দ ছাড়া তারা আর কাউকে চেনেন না, জানেন না।
তদন্ত কমিটির সামনে একপর্যায়ে আশার আলো নিয়ে হয়ে আসেন শিক্ষা বোর্ডে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে একজন কমান্ডার ও একজন সহকারী কমান্ডারের নেতৃত্বে ১২ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি রাতে দায়িত্ব পালন করেন দুইজন সদস্য। মে মাসে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে কমিটি। সেখানে প্রত্যক্ষদর্শী আনসার সদস্যরা স্বীকার বলেন, ‘মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন ও খাতা বণ্টনের সময় প্রায় দিনই রাতে স্ক্রিপ্ট রুমে কাজ করত গোবিন্দ, মনির ও শংকর। তারা রাত সাড়ে ৯টার পরে বের হয়ে যেত। আমরা তাদের জিজ্ঞেস করলে বলত, ‘পরীক্ষার কাজ অনেক বেশি।’ বিষয়টি বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানে। তাদের অনুমতি নিয়েই কাজ করছি।
আলাপকালে তদন্ত কমিটির প্রধান প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমরা ঘটনার সাথে ছয়-সাতজন জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছি। একটি সিসিটিভি ফুটেজে কয়েকজন কর্মচারীর কর্মকাণ্ড রেকর্ড রয়েছে। ওই ফুটেজের সিডি বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে জমা দিয়েছি। ফুটেজের সূত্র ধরে বাকি কাজ এখন সিআইডি করবে।
উত্তরপত্র জালিয়াতির ঘটনায় গত ২৬ আগস্ট বিমানবন্দর থানায় গোবিন্দ চন্দ পালকে প্রধান আসামি করে মামলা করে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। মামলায় ১৮ পরীক্ষার্থীকে আসামি করা হয়। কিন্তু পুলিশ মামলায় কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ২১ সেপ্টেম্বর মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন সিআইডির উপ-পুলিশ পরিদর্শক মনিরুজ্জামান। জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা তদন্ত কাজ শুরু করেছি।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ দিন ধরেই বরিশাল বোর্ডে ফলাফল জালিয়াতি করছে একটি চক্র। এর সাথে গোবিন্দ চন্দ্র পাল ছাড়াও আরো অনেকে জড়িত রয়েছে। টাকার বিনিময়ে জিপিএ ৫ এমনকি ফেল থেকে পাস করিয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রতি বছর জালিয়াতি হলেও বিষয়টি ধরা পড়ে ২০১৯ সালের এইচএসসি পরীক্ষার খাতা নিরীক্ষণের সময়। উচ্চতর গণিত বিষয়ের নিরীক্ষক নলছিটি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আবু সুফিয়ান খাতা নিরীক্ষণের সময় জালিয়াতির বিষয়টি বুঝতে পারেন। তিনি খাতা নিরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন ১৮ পরীক্ষার্থী শিক্ষা বোর্ডের দেয়া উত্তরপত্র হুবহু খাতায় তুলে রেখেছে। কোনো দাঁড়ি, কমাও ভুল নেই। বিষয়টি তার সন্দেহ হয়। উত্তরপত্রে যে নিয়মে অঙ্ক সেই অঙ্কই হুবহু ১৮টি খাতায় তুলে ধরা হয়েছে। আর ১৮ জনের খাতা গেছে একই পরীক্ষকের কাছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন প্রধান পরীক্ষক পিরোজপুর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের সাথে। প্রধান পরীক্ষক খাতাগুলো বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেন। উত্তরপত্রে একটি অঙ্ক ১৩ লাইনে শেষ হয়েছে। ওই পরীক্ষার্থীদের খাতায়ও ঠিক সেইভাবে ১৩ লাইনে অঙ্ক উঠানো। উচ্চতর গণিতে লিখিত পরীক্ষায় নম্বর ৫০। এর মধ্যে ক অথবা খ যেকোনো গ্রুপ থেকে কমপক্ষে দু’টিসহ পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। কিন্তু চারজন পরীক্ষার্থী ফাঁস করা উত্তরশিট দেখে সব অঙ্কই একই গ্রুপ থেকে তুলে রেখেছেন। ফলে তাদের ৪০ দেয়া হয়েছে। বাকি ১৪ জন পেয়েছেন ৫০ এর মধ্যে ৫০। শুধু তা-ই নয়, একটি অঙ্ক আছে, যেটি করতে গেলে শিক্ষকদেরও অন্তত ১০ বার কাটাছেঁড়া করতে হবে। অথচ ১৮ পরীক্ষার্থী এমন নিখুঁতভাবে অঙ্কটি তুলে রেখেছে, যা দেখলে যে কারোই সন্দেহ হবে। প্রধান পরীক্ষক শহিদুল ইসলাম বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে খাতাগুলো নিয়ে যান। এরপরই বেরিয়ে আসে আসল রহস্য। ওই ১৮ শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে খাতায় কিছু না লিখে সাদা খাতা জমা দেয়। প্রত্যেকটি খাতায় একটি লাল দাগ টানা ছিল। এরপর খাতা বোর্ডে জমা দেয়ার পর রেকর্ড সাপ্লায়ার খাতাগুলো বের করে কোনো একজনকে দিয়ে ১৮ জনের খাতায় হুবহু উত্তরপত্রে করা অঙ্কগুলো তুলে রাখে। ওই ১৮ জন পরীক্ষার্থী বিভিন্ন কেন্দ্রে হলেও সব খাতা যায় পরীক্ষক মনিমোহনের কাছে। শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান এরপর ১৮ শিক্ষার্থীকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে পরীক্ষার্থীরা উত্তরপত্র জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করে। তারা জানায়, টাকার বিনিময়ে গোবিন্দ্র চন্দ্র পাল এ কাজটি করেছে। এরপর ১৮ পরীক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত করা হয়। শুধু তা-ই নয়, আগামী তিন বছর পর্যন্ত তারা পরীক্ষায় বসতে পারবে না। গত ১৮ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক প্রফেসর মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক লিয়াকত সিকদার ও বিদ্যালয় পরিদর্শক আব্বাস উদ্দীন।


আরো সংবাদ