২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কক্সবাজারে ৮ বছর আটকে আছে ৪৬৭ মামলা

থামছে না মাদক ও মানবপাচার
-

পুরিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নানামুখী অভিযানের পরও বন্ধ হচ্ছে না মাদক ও মানবপাচার। ঘাট পরিবর্তন ও কৌশলে চলছে আইন পরিপন্থী এসব অপরাধ। অন্য দিকে বিচারক সঙ্কট ও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে আদালতে আটকে আছে অনেক মাদক ও মানবপাচারের মামলা। মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানবপাচারের শিকার লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত ও বিচার বঞ্চিত।
মানবপাচার মামলার বিষয়ে বেসরকারি সংস্থা নোঙরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারের আট থানায় মানবপাচার মামলা হয়েছে ৪৬৭টি। এর মধ্যে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৯৭টি, রামু থানায় ২৪টি, উখিয়া থানায় ৬৮টি, টেকনাফ মডেল থানায় ২১৮টি, চকরিয়া থানায় ১৯টি, কুতুবদিয়া থানায় একটি, মহেশখালী থানায় ৩৬টি এবং পেকুয়া থানায় আটটি মামলা হয়েছে। থানার এসব মামলা ছাড়া ট্রাইব্যুনালেও অনেক মামলা রয়েছে।
মামলাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৪৬৭ মানবপাচার মামলার একটিও নিষ্পত্তি হয়নি। এর মধ্যে আসামি হাজিরার জন্য আছে ছয়টি মামলা। এফআইআর পর্যালোচনার জন্য আছে মাত্র একটি মামলা। চার্জ গঠনের অপেক্ষায় আছে ৭৪টি এবং তদন্তাধীন রয়েছে ২৮টি মামলা। আমলি আদালতে শুনানির (কগনিজেন্সের জন্য) অপেক্ষায় আছে ৮০টি মামলা। চার্জ গঠনের অপেক্ষায় আছে ৭৪টি। সাক্ষীর অভাবে ১২৮টি মামলায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এক প্রকার থমকে আছে মামলাগুলো। ১৫০টি মামলায় আসামিদের সম্পদ ক্রোকের জন্য আদালত আদেশ দিলেও একটিও কার্যকর হয়নি।
নোঙরের প্রধান নির্বাহী দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, কক্সবাজারে মানবপাচারের অহরহ ঘটনা ঘটলেও মামলা হয়েছে কিছু। এর মধ্যে একটি মামলারও সুরাহা হয়নি। এটা কোনোভাবে কাম্য নয়। যারা দুঃসাহস দেখিয়ে মামলা করার জন্য এগিয়ে এসেছে, তাদের সমাধান দিতে না পারাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা উল্টো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে।
তিনি আরো বলেন, মানবপাচার আইন অনুযায়ী এই মামলার ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলো, গত আট বছরে একটি মামলারও বিচারকাজ শেষ হয়নি। ফলে মানবপাচার প্রতিরোধে প্রণীত আইনের কোনো সুফল পাচ্ছে না ভিকটিমরা। পাচারও রোধ করা যাচ্ছে না।
কক্সবাজার আদালতের সিনিয়র আইনজীবী মুহাম্মদ আবদুল মন্নান জানান, কক্সবাজারের মানবপাচার মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে একমাত্র কারণ সাক্ষী ও বাদিদের আদালতে হাজির না হওয়া। সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে মানবপাচার মামলায় কোনো ধরনের অগ্রগতি নেই। মামলায় স্থবিরতা ও শাস্তি না হওয়ার কারণে মানবপাচারকারীরা আরো সুযোগ নিচ্ছে। সুযোগ পেলেই জড়িয়ে যাচ্ছে ফের মানবপাচারে। এ কারণে কক্সবাজার অঞ্চলে মানবপাচার বন্ধ হচ্ছে না।
মানবপাচারের শিকার সুমন বড়–য়া (৩২), বদিউল আলমসহ (৫২) বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মামলায় সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আদালত বা থানা থেকে কোনো ধরনের নোটিশ দেয়া হয় না। মাঝে মধ্যে আদালতে মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গেলে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), পেশকার ও দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানিয়ে দেন, মানবপাচার মামলাগুলোর বাদি সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মামলা পরিচালনা হচ্ছে। তাই সাক্ষীদের আদালতে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশের পক্ষ থেকেও কিছু জানানো হয় না। এই সুযোগে মানবপাচারকারীরা জামিনে বের হয়ে এসে সাক্ষীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
জেলা জজ আদালতের আইনজীবী শামসুল হক বলেন, সাক্ষীরা স্থানীয়ভাবে চেয়ারম্যান ও প্রভাবশালীদের চাপে অথবা প্ররোচনায় সামাজিকভাবে সমঝোতা করে। এর ফলে আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসে না তারা। এই মামলা কোনো অবস্থাতে আপস করা যাবে না। এই মামলার শাস্তি হবেই। হয়তো একটু দেরি হচ্ছে।
কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট সাকী-এ-কাউসার বলেন, মানবপাচার মামলা কোনোভাবেই আপসযোগ্য নয়। সঠিক সময়ে আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং শাস্তি নিশ্চিত হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট একরামুল হুদা বলেন, ভিকটিম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সঠিক সময়ে সাক্ষ্য দিতে আসেন না। অনেক ভিকটিম খবরও নেন না। সাক্ষীরা যদি সঠিকভাবে আদালতে এসে সাক্ষ্য দেন তাহলে মানবপাচার মামলা নিষ্পত্তি করা কোনো ব্যাপার না। নোঙরের উদ্যোগের ফলে কিছু কিছু সাক্ষী আদালতে আসতে শুরু করেছেন। এটি অব্যাহত থাকলে পাচারকারীদের শাস্তি হবেই।


আরো সংবাদ