২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

নিউজিল্যান্ড থেকেই বিশ্বকাপ প্রস্তুতি

বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম - সংগৃহীত

আগামী ৩০ মে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসে শুরু হতে যাচ্ছে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ১২তম আসর। যাকে সামনে রেখেই ইতোমধ্যে মানসিক প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী দশটি দল। যার ধারাবাহিকতায় আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু করছে সফরকারী বাংলাদেশ দল।

অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ দিয়ে আগামী বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশন কঠিন, তারপরও ওয়ানডে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।
তবে সে স্বপ্নের পথে সফরের শুরুতেই হোচট খেয়েছে টাইগাররা। দলের সেরা অস্ত্র সাকিব আল হাসান থাকছেন না ওয়ানডে সিরিজে। হাতের আঙ্গুল ইনজুরিতে পড়ে নিউজিল্যান্ড সফরের ওয়ানডে সিরিজ থেকে ছিটকে পড়েছেন সাকিব। সাকিবের না থাকাটা দলের জন্য দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জ বলছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। তারপরও দলে যারা আছেন তাদের নিয়ে লড়াই করার প্রতিজ্ঞা ম্যাশের কণ্ঠে।

নেপিয়ারে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথমটি শুরু হবে বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায়।

চলতি বছরের শুরুতে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) টি-২০ টুর্নামেন্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সেখানেও ছিলো তাদের। তবে বিশ্বকাপের আসল প্রস্তুতি নিউজিল্যান্ড সফর দিয়ে শুরু করতে যাচ্ছে টাইগাররা।

এবারের সফরে তিনটি করে ওয়ানডে ও টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। তাই দুটি ফরম্যাট থেকেই বিশ্বকাপের জন্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে টাইগাররা। কারণ নিউজিল্যান্ড কন্ডিশনের সাথে ইংল্যান্ড কন্ডিশনের যথেষ্ঠ মিল রয়েছে। নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের সেরাটা দিতে পারাটাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনের সাথে বিশ্বকাপ দোড় গোড়ায় কড়া নাড়ায় এবারের সফরটি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। এমনটা উপলব্ধি করতে পারছেন বাংলাদেশ দলের প্রতিটি খেলোয়াড়। দেশ ছাড়ার আগে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ কোচ স্টিভ রোডস ও অধিনায়ক মাশরাফি।

রোডস বলেন, ‘নিউজিল্যান্ড সফরেই বুঝা যাবে ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে আমরা দল হিসেবে কি অবস্থায় আছি। কারণ আমাদের প্রধান টার্গেট বিশ্বকাপ। অবশ্য বিশ্বকাপের আগে আমরা ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টও খেলবো। বিশ্বকাপের আগে ঐ টুর্নামেন্টটিই হবে আমাদের শেষ প্রস্তুতি। কিন্তু নিউজিল্যান্ড সফরটি আমাদের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।’

ওয়ানডে সিরিজে ভালো করার ব্যাপারেও আশাবাদি রোডস। সাম্প্রতিক সময়ে দলের খেলোয়াড়দের নৈপুন্যে স্বপ্ন দেখাচ্ছে রোডসকে। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি খেলোয়াড়দের দুর্দান্ত পারফরমেন্সে আমরা বেশ খুশি। ওয়ানডে সিরিজে ভালো করার ব্যাপারে আমরা আশাবাদি। কারণ ওয়ানডে ক্রিকেটেই আমরা ভালো পারফরমেন্স করে আসছি। নিউজিল্যান্ডেও আমরা ভালো করতে সমর্থ হবো আশা করছি।’

ওয়ানডে সিরিজে ম্যাচ জয়ের ইঙ্গিতও দিলেন রোডস, ‘আশা করি এবার জিততে পারবো আমরা। আমাদের জন্য ভালো হবে, যদি আমরা কিছু ম্যাচ জিততে পারি। কারণ সেখানে ম্যাচ জয় করা কঠিন, সেটা গতবারের সফরেই প্রমাণ হয়েছে। তবে আমরা খুবই সন্তুষ্ট ছেলেদের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সে।’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই শুধু নয়, সদ্য শেষ হওয়া বিপিএলে পারফরমেন্সে উজ্জল ছিলেন তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মাশরাফি, মুশফিকুর রহিমরা। স্থানীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী ছিলেন তামিম। ১৪ ম্যাচে ৪৬৭ রান করেছেন তিনি। ১টি সেঞ্চুরি ও ২টি হাফ-সেঞ্চুরিও রয়েছে তার। ফাইনালে ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে করেছেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি। ১০টি চার ও ১১টি ছক্কায় ৬১ বলে অপরাজিত ১৪১ রানের ইনিংস খেলেন তামিম।

তামিমের পরই ব্যাট হাতে সফল ছিলেন মুশফিক। চিটাগং ভাইকিংসের এই অধিনায়ক ১৩ ম্যাচে ৩টি হাফ-সেঞ্চুরিতে ৪২৬ রান করেন।

বল হাতে সেরার কাতারে ছিলেন আন্তর্জাতিক টি-২০কে অনেক আগেই বিদায় বলা মাশরাফি। ১৪ ম্যাচে ২২ উইকেট শিকার করেছেন ম্যাশ। তার সাথে উইকেট শিকারে পারদর্শী ছিলেন তাসকিন আহমেদ, রুবেল হোসেন ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। তাসকিন-রুবেল ২২টি করে ও সাইফউদ্দিন ২০টি উইকেট নেন। ইনজুরির কারণে নিউজিল্যান্ড সফর অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে তাসকিনের। তাসকিনের মত র্দুভাগা সাকিবও।

বিপিএলে লীগ পর্বের ম্যাচে গোড়ালির ইনজুরিতে পড়েছিলেন তাসকিন। আর ফাইনালে আঙ্গুলের ইনজুরিতে পড়েন সাকিব। তাই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের শুরু থেকে থাকছেন না তিনি। এমনকি টেস্ট সিরিজও মিস হতে পারে সাকিবের।

তবে অতীতে সাকিবের অনুপুস্থিতিতে যেভাবে দল খেলেছে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর কথা মনে করিয়ে দিতে ভুল করেননি মাশরাফি, ‘দলে সাকিবের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা বলার প্রয়োজন নেই। গেল বছর তাকে ছাড়া আমরা বেশকটি ম্যাচ খেলেছি, ফলে আমাদের ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা নিউজিল্যান্ড সফরে কাজে লাগাতে চাই। এশিয়া কাপে সাকিবকে ছাড়া আমরা খেলেছি। তাই আমাদের যা আছে, তা নিয়েই এখানেও ভালো খেলতে চাই।’

সাকিবকে ছাড়া সিরিজ জয় কঠিন মানছেন মাশরাফি। তবে অসম্ভব কিছু না বলেও জানা তিনি, ‘ওয়ানডে সিরিজ জয় সম্ভব, আমরা জিততে পারবো না এটি সত্যি নয়। সাকিবের না থাকা অনেক কঠিন করে দিয়েছে সম্ভাবনাকে, কিন্তু সম্ভব। এটি করার জন্য আমাদের বিশ্বাস ও মানসিকভাবে শক্ত থাকা দরকার এবং পাশাপাশি আমাদের পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে কার্যকর করার প্রয়োজন আছে। যদি আমরা তা পারি, তবে সম্ভব হবে।’

সাকিবের না থাকাটা কতটা যে কঠিন হয়ে গেল বাংলাদেশের জন্য, তা বিপিএলে তার পারফরমেন্সের দিকে চোখ বুলালেই দেখা যাবে। ব্যাট হাতে ১৫ ম্যাচে ৩০১ রান ও বল হাতে সর্বোচ্চ ২৩ উইকেট শিকার করে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জিতেছেন বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-২০ দলপতি সাকিব। তার পরিবর্তে ওয়ানডে সিরিজে কে খেলবেন তা এখনো জানায়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

তারপরও দলে যারা আছেন, তারা জ্বলে উঠলে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথম জয়ের স্বাদ এই সিরিজেই পেয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ১০টি ম্যাচ খেলে সবগুলোই হেরেছে টাইগাররা। এখানে বাংলাদেশ জিরো থাকলেও, নিজ দেশ ও নিরপেক্ষ ভেন্যুতে নিউজিল্যান্ডকে দশবার হারানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে টাইগারদের। দেশের মাটিতে আটবার ও নিরপেক্ষ ভেন্যুতে দুবার নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে বাংলাদেশ।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ জয় ২০১৭ সালের জুনে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। কার্ডিফের ওই ম্যাচ জয়টি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। কারণ ওই জয়ই প্রথমবারের মত আইসিসির কোন টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে তুলেছিলো বাংলাদেশকে।

গ্রুপ পর্বের ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৬৫ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর দাঁড় করিয়েছিলো নিউজিল্যান্ড। জবাবে ৩৩ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিলো বাংলাদেশ। এখানেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো বাংলাদেশের হার।

কিন্তু বাংলাদেশকে হারের মুখ থেকে রক্ষা করেন দলের দুই সেরা তারকা সাকিব ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। পঞ্চম উইকেটে ২০৯ বলে ২২৪ রানের দুর্দান্ত এক জুটি গড়েন সাকিব-মাহমুদুল্লাহ। ম্যাচ সেরা সাকিব ১১৪ রানে থামলেও মাহমুদুল্লাহ নামের পাশে ১০২ রান রেখে দলের জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন। তাই ৫ উইকেটের জয়ে সেমিতে উঠে বাংলাদেশ। শেষ চারে ভারতের কাছে ৯ উইকেটে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় টাইগাররা।

২০১৬ সালে সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয় টাইগাররা। নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করার সুখস্মৃতি রয়েছে বাংলাদেশেরও। ২০১০ ও ২০১৩ সালে দেশের মাটিতে দুবার কিউইদের হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। প্রথমবার চার ও পরেরবার তিন ম্যাচের সিরিজে নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের দল (সম্ভাব্য): মাশরাফি বিন মুর্তজা (অধিনায়ক), তামিম ইকবাল, লিটন দাস, সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহিম, মোহাম্মদ মিথুন, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, মেহেদি হাসান মিরাজ, নাঈম হাসান, রুবেল হোসেন, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, শফিউল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান ও সাব্বির রহমান।

নিউজিল্যান্ড দল (সম্ভাব্য): কেন উইলিয়ামসন (অধিনায়ক, প্রথম দুই ম্যাচ), টড অ্যাস্টল, ট্রেন্ট বোল্ট, কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম, লুকি ফার্গুসন, মার্টিন গাপটিল, ম্যাট হেনরি, টম ল্যাথাম, কলিন মানরো, জেমস নিশাম, হেনরি নিকোলস, রস টেলর, মিচেল স্যান্টনার ও টিম সাউদি।

নিউজিল্যান্ড সফরে বাংলাদেশের সূচি:
তারিখ ম্যাচ ভেন্যু
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রথম ওয়ানডে নেপিয়ার
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দ্বিতীয় ওয়ানডে ক্রাইস্টচার্চ
২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তৃতীয় ওয়ানডে ডুনেডিন
২৮ ফেব্রুয়ারি-৪ মার্চ ২০১৯ প্রথম টেস্ট হ্যামিল্টন
৮-১২ মার্চ ২০১৯ দ্বিতীয় টেস্ট ওয়েলিংটন
১৬-২০ মার্চ ২০১৯ তৃতীয় টেস্ট ক্রাইস্টচার্চ


আরো সংবাদ