২৫ এপ্রিল ২০১৯

সাক্ষাতকারে বিস্ফোরক মন্তব্য ‘দুর্ভাগা’ মুশফিকের

মুশফিকুর রহিম - সংগৃহীত

সম্ভবত ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে এখন মুশফিকুর রহিম৷ দীর্ঘ এ কথোপকথনে নিজের ব্যাটিং, বিশ্বকাপ স্বপ্নসহ সব বিষয়েই তিনি স্বতস্ফূর্ত, সাবলীল৷ অধিনায়কত্ব ও সাবেক কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহেকে নিয়ে বলেছেন রীতিমতো বিস্ফোরক সব কথা৷

ডয়চে ভেলে : দুর্দান্ত এক বিপিএল কাটালেন৷ সেখানে ১৩ ম্যাচে করেছেন ৪২৬ রান৷নিউজিল্যান্ড সফরের প্রস্ততিটা নিশ্চয়ই দারুণ হলো?

মুশফিকুর রহিম : সেটা তো অবশ্যই৷ হয়তোবা ওখানকার কন্ডিশন একেবারে আলাদা৷ কিন্তু যখন খেলার মধ্যে থাকেন এবং রান করেন- সেটি যে কোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্টের আগে আত্মবিশ্বাস দেয়৷ আর বিপিএল বিশ্বমানের টুর্নামেন্ট; এর মান এখন অনেক উঁচুতে৷ এখানে বিশ্বমানের ক্রিকেটাররা আসেন৷ গত বছর কিংবা আগের মৌসুমগুলোতে আসেননি এমন অনেক ক্রিকেটারও এসেছেন এবার৷ সব মিলিয়ে এবারের প্রতিযোগিতা তাই অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল৷ আর আমাদের দলের জন্যও কাজটি সহজ ছিল না৷ বিপিএলে আমি যে খুব ভালো দলে খেলার সুযোগ পাই, তা-ও না৷ এ নিয়ে ছয় আসরে কখনোই কাগজ-কলমে অন্তত চ্যাম্পিয়ন হবার মতো দলে খেলিনি৷ আমার জন্য এই বিপিএল অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল৷ আর এবার তো অনেক দিন পর অধিনায়কত্বও করলাম৷ সব মিলিয়ে মনে করি, টুর্নামেন্টটি ভালোই কেটেছে৷

বিপিএলে বেশ কয়েকটি ম্যাচ ব্যাটিংয়ে দলকে জিতিয়ে শেষ করে এসেছেন৷ ভবিষ্যতে জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এটি বড় কিছুর বিশ্বাস জোগাবে?

আমার জন্য এটি অনেক বড় ইতিবাচক দিক৷ যে কোনো ম্যাচেই দলকে খারাপ পরিস্থিতি থেকে বের করে আনাটা দারুণ ব্যাপার৷ এবারের বিপিএলে ১৩ ম্যাচের মধ্যে চার-পাঁচটি খেলায় আমি তা করতে পেরেছি৷ এক-দুই ম্যাচে হলে হয়তো মনে হতো, এমনি হয়ে গেছে৷ যেহেতু ধারাবাহিকভাবে করতে পেরেছি, সেটি তাই আমার জন্য ইতিবাচক৷ আর এই ফরম্যাটে ধারাবাহিকতা রেখে খেলা খুব চ্যালেঞ্জিং৷ সেদিক থেকে একটু হলেও খুশি৷ গতবারের চেয়ে এবার ধারাবাহিক ছিলাম৷ সামনে যে কোনো ফরম্যাটে এ পারফর্ম্যান্স আমাকে সাহায্য করবে৷

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গত বছর আপনি করেছেন ১৬৫৭ রান, এক পঞ্জিকাবর্ষে বাংলাদেশের যে কোনো ক্রিকেটারের জন্য যা সর্বোচ্চ রান৷ ছাড়িয়ে গেছেন ২০১০ সালে তামিম ইকবালের করা ১৬৪৬ রানকে৷ সে বছর পেরিয়ে নতুন বছরের শুরুতেই বিপিএলে এমন পারফর্ম্যান্স৷ মুশফিকুর রহিম কি এই মুহূর্তে ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন?

(হাসি) বেশ কয়েক বছর ধরেই তো এমন ভালো করছি৷ আপনার কাছে প্রথম না, আরো অনেকের কাছেই অনেকবার শুনেছি যে, এটি আমার সেরা সময়৷ আমি মনে করি, আমার মতো এমন বয়সে যে কারোই প্রতিটি টুর্নামেন্ট, প্রতিটি বছর এভাবে খেলা উচিত৷ পারফর্ম করা উচিত৷ এটিকে তাই অতিমানবীয় বলব না৷ এত বছর ধরে যে জাতীয় দলে খেলছি, সে অভিজ্ঞতা বলুন, পরিণতিবোধ বলুন, এসব কিছুর প্রতিদান দেবার চেষ্টা করছি৷ আমার এখনকার ফর্ম সেটিরই পুরষ্কার বলতে পারেন৷

সামনেই তো নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ৷ গতবার ওখানে ওয়েলিংটন টেস্টে ১৫৯ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেছেন৷ এবারের সফরে নিজের কাছে প্রত্যাশা কী?

গতবার আমি একটু দুর্ভাগাও ছিলাম৷ সফরের শুরুর দিকে প্রথম ওয়ানডেতে ইনজুরিতে পড়ে যাই৷ খুব খারাপ অবস্থা৷ দলও ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টিতে হেরে যায় সব ম্যাচ৷ এরপর প্রথম টেস্টে ফিরে আসা এবং অমন একটি ইনিংস খেলা আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল৷ গতবার যা করেছি, এবার যেন তা ছাপিয়ে যেতে পারি সেই চেষ্টা থাকবে৷ দল হিসেবে ভালো করার সামর্থ্য ও বিশ্বাস আমাদের রয়েছে৷ কারণ, গতবারের অনেক ক্রিকেটারের সেটি প্রথম নিউজিল্যান্ড সফর ছিল৷ এবার তাঁরা একটু হলেও অভিজ্ঞ হয়ে যাচ্ছে৷ এই সফরটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ এখানে যদি ভালো করি, তাহলে সামনের আয়ারল্যান্ড সফর কিংবা বিশ্বকাপেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে৷

জাতীয় ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা বলছেন, ২০১৯ বিশ্বকাপ জয়ের সামর্থ্য এখনকার বাংলাদেশের রয়েছে৷ আপনিও কি তা বিশ্বাস করেন?

এটি অস্বাভাবিক কোনো লক্ষ্য না৷ খুবই সম্ভব এক স্বপ্ন, যা পূরণ করার ভালো সুযোগ এবার আমাদের৷ আর এ বিশ্বকাপে তো সবার সঙ্গে সবার খেলা হচ্ছে৷ সেখানে ভালো খেলতে পারলে সেরা চারে থাকা সম্ভব৷ সেটিই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত৷ এরপর ফাইনাল খেলা আর চূড়ান্ত লক্ষ্য চ্যাম্পিয়নশিপ৷ আমার মনে হয়, চ্যাম্পিয়ন হবার সামর্থ্য অবশ্যই আমাদের দলের আছে৷ পাঁচজন সিনিয়র ক্রিকেটার রয়েছি; সঙ্গে মুস্তাফিজ, মিরাজ, সৌম্য, লিটনরা সবাই মিলে যদি সমন্বিতভাবে পারফর্ম করতে পারি, তাহলে বিশ্বকাপ জয় অস্বাভাবিক কিছু না৷ সে লক্ষ্যের পথে অনেক বড় চ্যালেঞ্জিং হবে নিউজিল্যান্ড সফর৷ বিশ্বকাপ জয়ের বিশ্বাস যেন এ সফর থেকেই তৈরি করা শুরু করতে পারি৷

গত বছর ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট, এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠেও শিরোপা জিততে পারেনি বাংলাদেশ৷ এমন একটি ট্রফি জিতলে বিশ্বকাপ জয়ের আত্মবিশ্বাস তৈরিতে তা কি সাহায্য করত না?

অবশ্যই৷ যে কোনো বাধা একবার টপকালে অমন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে আবার গেলে মনে হয় যে, এভাবে আমরা আগের বাধা টপকেছিলাম৷ ট্রফি জিতলে তাই নিঃসন্দেহে আলাদা বিশ্বাস থাকত৷ আবার আমার কাছে মনে হয়, গত চার-পাঁচ বছরে আমরা যেমন দুর্ভাগা ছিলাম, চ্যাম্পিয়নশিপের দোরগোড়ায় গিয়েও যেভাবে পারিনি, তাতে বিশ্বকাপ ফাইনালে এমন পরিস্থিতিতে পড়লে হয়তো আমাদের ভাগ্যে জয় লেখা হয়ে থাকতেও পারে৷ বলা তো যায় না৷ সব আক্ষেপের শেষ তাই এবারের বিশ্বকাপ ফাইনালেই হতে পারে৷

২০১৯ বিশ্বকাপ জয়ের বিশ্বাসের কথা বলছেন৷ চার বছর আগের ২০১৫ আসরে নিশ্চয়ই ওই লক্ষ্য নিয়ে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ?

বিশ্বকাপের মতো এত বড় আসর, তার ওপর অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মতো আমাদের জন্য কঠিন কন্ডিশনে৷ অনেকে ভাবতে পারেননি, ওই কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যাবো৷ কিন্তু যখন টুর্নামেন্টটি ভালোভাবে শুরু করলাম এবং ভালো খেলতে লাগলাম, তখন নিজেদের মনে হয়েছে, আমরা অন্তত সেরা চারে যাবার মতো দল৷ সেবারের অভিজ্ঞতা এবারের বিশ্বকাপে কাজে দেবে৷ ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি অভিজ্ঞতাও; যেখানে আমরা সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলেছিলাম৷ এখন আমরা জানি, কোনো কোনো জায়গায় আরেকটু উন্নতি করতে হবে৷

গত বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে আপনার ওয়ানডে-টি টোয়েন্টি অধিনায়কত্ব যায়৷ আগের টানা তিন বছরের বেশি সময় তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন৷ ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজে নেতৃত্ব হারান৷ এটি মেনে নেওয়া কতটা কঠিন ছিল? আর বিশ্বকাপে দেশের অন্যতম সেরা পারফর্মার আপনি; ৬ ম্যাচে ২৯৮ রান করেন ৪৯ দশমিক ৬৬ গড়ে৷ অধিনায়কত্ব হারানো মেনে নিয়ে পারফর্ম করাও কতটা কঠিন ছিল?

অবশ্যই ভাই, এটি আমার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল৷ সবসময় বিশ্বাস আছে, সৃষ্টিকর্তা যা করেন, ভালোর জন্য করেন৷ খেয়াল করে দেখুন, ২০১৪ সালেও আমি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান করেছিলাম৷ নিজের চেষ্টার দিক থেকে কোনো কমতি রাখিনি৷ আসলে আমার কাছে তখন এখনকার মতো দলে যথেষ্ট ভালো বোলার-ব্যাটসম্যান ছিল না, যাদের দিয়ে ভালো ফল বের করে আনবো৷ হয়তো ব্যক্তিগতভাবে ভালো খেলা কিছু ক্রিকেটার ছিল৷ কিন্তু একটা টুর্নামেন্ট জয় বা সিরিজ জয়ের জন্য যথেষ্ট ভালো দল ছিল না৷ এদিক থেকে আমি অধিনায়ক হিসেবে দুর্ভাগা৷ নেতৃত্ব চলে যাবার পর পরিবার থেকে খুব সমর্থন পাই৷ ওই সময় আমার নানা ছিলেন সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী৷ উনি বলেছিলেন, ‘‘ভাই, তুমি কখনো মন খারাপ কোরো না৷ আল্লাহ যে সম্মান তোমাকে দিয়েছেন, সেটি যদি আবার নিয়ে নেন, তাতে তোমার কোনো হাত নেই৷ সে-ই নিয়ে নিলে ভালোর জন্যই কিছু হবে৷ আমার বিশ্বাস, অধিনায়কত্ব চলে যাবার পর তুমি আগের চেয়ে ভালো খেলতে পারবে৷'' নানার এই কথা আমার ভেতরে অন্যরকম কাজ করেছে৷ উনি আমার খুব কাছের মানুষ, কিন্তু ক্রিকেট ততটা বোঝেন না৷ তারপরও তাঁর বিশ্বাস রয়েছে, আমি আগের চেয়ে ভালো করতে পারবো৷ এটি আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে৷ তাই চেয়েছি, যেভাবে এতদিন পারফর্ম করেছি, তার ধারাবাহিকতা যেন থাকে৷ অধিনায়কত্ব চলে যাবার কোনো প্রভাব যেন না পড়ে৷

অধিনায়কত্ব পাওয়া, কিংবা যাওয়া – কোনো কিছুতে আপনার পারফর্ম্যান্সে প্রভাব পড়েছে বলে দেখিনি৷ পরিসংখ্যানও তাই বলছে৷ প্রথম যখন জাতীয় দলের অধিনায়ক হন, সেই ২০১১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম খেলাতেই ম্যান অব দ্য ম্যাচ৷ আবার ওয়ানডে অধিনায়কত্ব চলে যাবার পর ২০১৪ সালে জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে প্রথম সিরিজেই আপনি ম্যান অব দ্য সিরিজ৷ টেস্ট অধিনায়কত্ব যাবার পর প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রামে করেন ৯২ রান৷ এটি কিভাবে সম্ভব? এত সব ওলট-পালটের মধ্যেও ব্যাটসম্যান মুশফিককে আলাদা করে রাখেন কিভাবে?

দেখুন, আমি সব সময় পরিস্থিতি মেনে নেবার চেষ্টা করি৷ আর সত্যি বলতে কী, অধিনায়কত্ব যাবার পেছনে কেবল আমার একার দায় ছিল, তা কিন্তু নয়৷ যদি একাই খারাপ করে তা হতো, তাহলে সেটি অনেক বেশি ভাবাতো৷ হয়তো মনে হতো, আমার জন্যই এত কিছু হয়ে গেল৷ আমি মনে করি, আমি এমন কোনো ভুল, এমন চরম কোনো ভুল করিনি যে কারণে দল এত খারাপ করবে কিংবা অধিনায়কত্ব চলে যাবে৷ আমার পরিপার্শ্বের কিছু ক্রিকেটার ওই সময় হয়তো ভালো পারফর্ম করতে পারেনি, যে কারণে দলের ফলও ভালো হয়নি৷ এখানে অবশ্যই অধিনায়কের দায় রয়েছে৷

তবে সব দোষই তার, এমন নয়৷ আমি সেভাবেই ভাবার চেষ্টা করেছি৷ আর মনের ভেতর থেকে একটা চ্যালেঞ্জ নেবার চেষ্টা করেছি৷ অধিনায়ক থাকি বা না থাকি, একজন খেলোয়াড় হিসেবে আমার মূল কাজ পারফর্ম করা৷ দলে থাকতে হলে পারফর্ম করে থাকতে হবে, সেটি ব্যাটসম্যান হিসেবে হোক কিংবা উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে৷

‘ব্যাটসম্যান হিসেবে হোক কিংবা উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে' কথাটা উল্লেখ করলেন৷ এ জায়গায় নিজেকে খানিকটা দুর্ভাগা মনে হয় কিনা? আপনাকে একটি পরিসংখ্যান জানাই৷ আপনার প্রথম ৫০ টেস্টে তিন সেঞ্চুরি৷ ৫১ ও ৫২তম টেস্টে নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেন৷ দুটিই প্রতিপক্ষের মাঠে, দুটিই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে৷ তবু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫৩তম টেস্ট খেলতে নামার সময় আপনার কিপিং গ্লাভস কেড়ে নেয়া হয়; যদিও তখনো আপনি টেস্ট দলের অধিনায়ক৷ কতটা উথাল-পাথাল সময় গেছে তখন?

একটু হলেও খারাপ লেগেছে৷ এটাই তো স্বাভাবিক৷ তবে আমি সবসময় চেষ্টা করি, দলের ভালোর জন্য অবদান রাখতে৷ আমাকে একাদশ থেকে বাদ দিলে দল প্রতি ম্যাচে জিতে যাবে, এ নিশ্চয়তা পেলে তা করতেও রাজি৷ আমার কাছে সবসময়ই দল আছে৷ টিম ম্যানেজম্যান্ট তখন বলেছিল, শুধু ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দিলে দলে আরো বেশি অবদান রাখতে পারব৷ আমার চেয়ে আরো ভালো কেউ রয়েছেন, যে উইকেটরক্ষক হিসেবে ভালো করতে পারবে৷ তা আমি সহজেই মেনে নিয়েছি৷ তারা তো বলেননি যে, ‘তুমি ভালো খেললে তোমার জন্য ভালো'; বলেছেন ‘দলের জন্য ভালো'৷ অমনভাবে বললে তা মেনে নেয়া সব খেলোয়াড়েরই কর্তব্য বলে মনে করি৷ সেটি আমি অধিনায়ক থাকি বা না থাকি৷

কিন্তু মুশফিক, পর র দুই টেস্টে উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করার পর আপনি আর কত ভালো করবেন? এমন পারফর্ম্যান্সের পরও আপনার পছন্দের উইকেটকিপিং কেড়ে নেয়ায় তা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল না?

কঠিন তো অবশ্যই৷ তারপরও যা বললাম, এটি নিয়ে বসে থেকে আমার খুব বেশি লাভ নেই৷ আমি তো কোনো ভুল করিনি৷ কেন আমার কাছ থেকে তা কেড়ে নিলো– এমনটা ভাবতে থাকলে নিজেকে বোঝাতে কষ্ট হতো৷

২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে অধিনায়কত্ব করার সময় কি বুঝতে পারছিলেন, আপনি মরা কাঠের উপর দিয়ে হাঁটছেন? জাতীয় দলের ওই সফরে আমিও ছিলাম দক্ষিণ আফ্রিকায়৷ দল খারাপ করছিল, আপনাকে বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডিংয়ের জন্য পাঠানো হলো, কারণ, দল ফিল্ডার হিসেবে আপনার ওপর আস্থা পাচ্ছিল না৷ এসব আমাদের সামনে এসে সংবাদ সম্মেলনে বলে গেছেন৷ তখন কি মনে হচ্ছিল, টেস্ট অধিনায়কত্ব বোধহয় চলেই যাবে?

একটা সিরিজে দল যদি সামর্থ্য অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারে, তাহলে এর দায় স্বাভাবিকভাবে অধিনায়ক-কোচের উপর পড়বেই৷ তবে আমার একার কারণে সব খারাপ হচ্ছে, সেভাবে ভাবিনি৷ ওই সফরে আমাদের কোনো ক্রিকেটার দুর্দান্ত পারফর্ম করেনি৷ একশ', দেড়শ' রান করেনি, পাঁচ উইকেটও নেয়নি৷ আর দক্ষিণ আফ্রিকায় খুব কম সফরকারী দলই ভালো করে৷ সেদিক থেকে আমি অবশ্যই দুর্ভাগা৷ কারণ, যে সময়টায় বাইরের সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সেই সময় কোনো সমর্থনই পাইনি৷ বিশেষত কোচের কাছ থেকে তো কখনোই পাইনি৷ টিম ম্যানেজমেন্টে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকেও পাইনি৷ শুধু আমার যাঁরা ঘনিষ্ট ক্রিকেটার, তাঁদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছি৷ তামিম ও রিয়াদ ভাই– এ দুজনের কাছ থেকে পেয়েছি সমর্থন; সাকিব তো টেস্টে ছিল না৷ আমি মনে করি, ওই সময়টায় সবার সমর্থন আরো বেশি প্রয়োজন ছিল৷ আমি অধিনায়ক থাকি বা না থাকি, সমর্থন পেলে দল হিসেবে বাংলাদেশ আরো ভালো করতে পারতো৷ প্রথম টেস্টের পর সেটি হলে দ্বিতীয় টেস্টে হয়তো আরেকটু ভালো করতে পারতাম৷ তবে এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি– মেনে নিতেই হবে৷ আমিও অস্বাভাবিকভাবে নিইনি৷ খারাপ সময়ে মানুষ কিছু না হলেও অনেক কিছু ভাবে৷ আবার অনেক সময় ঘটনা না শুনেই অনেক কিছু বলে দেয়৷ তবে হ্যাঁ, আমি মনে করি, আমার কিছু কথাবার্তাও হয়তো ভুল ছিল৷ খোলামেলা অনেক কিছু বলে দিয়েছি, যা বলা উচিত হয়নি৷ সত্যি বলতে কী, তখন অভিনয় করলে হয়তো নিজের অধিনায়কত্ব বাঁচাতে পারতাম৷

জাতীয় দলের তখনকার কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না৷ অধিনায়কের সঙ্গে কোচের সম্পর্ক ভালো না হলে দলের ওপর খারাপ প্রভাব পড়তে বাধ্য৷ আপনার কি মনে হয় না যে, শুধু ব্যক্তি মুশফিক না, দল হিসেবে বাংলাদেশও এর ভুক্তভোগী?

একটু হলেও তো ভুক্তভোগী৷ সাম্প্রতিক সময়ে দেখতে পাচ্ছেন, শ্রীলঙ্কার কোচ হিসেবে তাঁর সঙ্গে ক্রিকেটার ও টিম ম্যানেজমেন্টের সম্পর্কের কী অবস্থা৷ আমারই শুধু সমস্যা ছিল, সেটি তো না৷ ওই মানুষটারও নিশ্চয়ই সমস্যা ছিল, যা এখন অন্য জায়গায় গিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে৷ বাংলাদেশ তাই একটু হলেও এর খারাপ ফল ভোগ করেছে৷ আর সত্যি বলতে, হাতুরাসিংহের সময় বাংলাদেশ হয়তো অনেক ভালো কিছু ফল পেয়েছে, কিন্তু আমি তো এমন কোনো ক্রিকেটার দেখি না, যারা কিনা ওর সময় উঠে এসেছে৷ একজন কোচের শুধু ফল নিয়ে ভাবলে হয় না৷ তাকে এমন এক কাঠামো তৈরি করে দিয়ে যেতে হয়, যাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট যেন আরো পাঁচ-দশ বছর পরের প্রজন্মের ভালো ক্রিকেটারদের হাতে থাকে৷ এ জায়গায় আমরা অনেক ধুঁকেছি৷ হয়তোবা জাতীয় দলের ফল বিবেচনায় হাতুরাসিংহে সফল কোচ, কারণ, ওই সময় আমাদের সেরা পাঁচ-ছয় ক্রিকেটার ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফর্ম করেছে৷ আবার আমরা এদিক দিয়েও ভাগ্যবান যে, মোস্তাফিজ, সৌম্যর মতো তরুণ ক্রিকেটাররাও অসাধারণ পারফর্ম করেছে৷ তরুণদের কাছ থেকে যা সবসময় প্রত্যাশা করা যায় না৷ সব মিলিয়ে আমি তাই মনে করি, বাংলাদেশের কোচ হিসেবে হাতুরাসিংহে খুব ভাগ্যবান৷ ক্রিকেটারদের পারফর্ম্যান্সের কারণে তার রেকর্ড হয়তো ভালো৷ কিন্তু সামগ্রিকভাবে যদি বাস্তবতা বিবেচনা করেন, তাহলে ওর সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট অনেক নিচের দিকে নেমেছে৷ তখনকার অনেক তরুণ ক্রিকেটারকে ঠিকমতো পরিচর্যা করলে এখন এই প্রয়োজনের সময় আরো অনেক খেলোয়াড় পেতাম৷ এটি আমার ব্যক্তিগত মত৷

সাক্ষাত্‍কারের শেষ পর্যায়ে আপনার ব্যক্তিগত পারফর্ম্যান্সে আবার একটু আলো ফেলতে চাই৷ টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান আপনি৷ গত বছর করেন আরেকটি ডাবল সেঞ্চুরি৷ কোনটি বেশি তৃপ্তিদায়ক?

প্রথমটি অনেক তৃপ্তিদায়ক ছিল; পরেরটি অনেক চ্যালেঞ্জিং৷ জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে দলের পরিস্থিতিও বেশ খারাপ ছিল৷ সেখান থেকে এমন এক ইনিংস খেলা! দুই ডাবল সেঞ্চুরির মধ্যে পরেরটিই বেশি আনন্দ দিয়েছে বলতে পারেন৷

জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে করা ওই ডাবল সেঞ্চুরিতে নিজেকে কি ব্রায়ান লারা মনে হয়েছে? তুলনাটি এজন্য করছি, টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ৩৭৫ রানের যে বিশ্বরেকর্ড ওই ক্যারিবিয়ান করেন, তা প্রায় ৯ বছর পর ভেঙে দেন ম্যাথু হেডেন৷ ছয় মাসের মাথায় ৪০০ রানের ইনিংসে তা আবার নিজের করে নেন লারা৷ আপনি তো ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের ভীষণ ভক্ত বলে জানি৷ দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড গড়েছেন, সেটি হাতছাড়া হবার পর পুনরুদ্ধার করেছেন- এদিক থেকে জানতে চাইছিলাম, নিজেকে লারার মতো মনে হয়েছে কিনা...

কাকতালীয়ভাবে আমার আদর্শ ক্রিকেটার কিন্তু ব্রায়ান চার্লস লারা৷ অত্যন্ত প্রিয় ক্রিকেটার, অন্য রকম ভালো লাগার একজন৷ তাঁর মতো তো জীবনেও হতে পারব না৷ তবে অন্তত লারা যেমন সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড নিজে করে পরে আবার পুনরুদ্ধার করেছেন, আমি তো একটুখানি হলেও তার মতো দেশের সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটির বেলায় করেছি– এটি অনেক ভালো লাগার বিষয়৷ আমার জন্য অনেক বড় ব্যাপার৷

হাতুরাসিংহে কোচ থাকার সময় আপনার উইকেটকিপিং নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে৷ কিন্তু আপনিই ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলে করেছেন দুটো ডাবল সেঞ্চুরি৷ কিপিং করেও যে ব্যাটিং করতে পারেন, এর পক্ষে এই রেকর্ডটি কি বড় এক বিবৃতি নয়?

তা তো অবশ্যই৷ কাজটি খুব সহজ ছিল না৷ এই রেকর্ডটি করতে পেরে আমি আনন্দিত৷ তবে এখানেই শেষ নয়৷ সামনে যদি সুযোগ পাই, তাহলে চেষ্টা করব যেন আরো বেশ কয়েকটি ডাবল সেঞ্চুরি করতে পারি৷ এই চ্যালেঞ্জ নেবার ইচ্ছে রয়েছে৷

ট্রিপল সেঞ্চুরি?

দেখা যাক৷ অসম্ভব তো কিছু না৷ চেষ্টা থাকবে আরো অন্তত কয়েকটি ডাবল সেঞ্চুরি করার৷

ছোট্ট করে কিছু বিষয় জানতে চাই৷ আপনার কাছে নিজের ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস কোনটি?

বেশ কয়েকটি আছে৷ গত বছরের ডাবল সেঞ্চুরির কথা বলা যায়৷ আসলে গত বছর আমার জন্য দারুণ ছিল৷ যেমন কন্ডিশনে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছি, সেটি নিজের জন্য অন্য রকম পাওয়া৷ আমি যে সব ফরম্যাটে কিছু অসাধারণ ইনিংস খেলতে পারি এবং ম্যাচ জেতাতে পারি, সেটি দেখিয়েছি৷ নিদহাস ট্রফির ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অপরাজিত ছিলাম (৭২ রান), ওয়ানডেতে এশিয়া কাপের ১৪৪, টেস্টে জিম্বাবোয়ের বিপক্ষে অপরাজিত ২১৯– আমার খেলা তিন ফরম্যাটের তিনটি সেরা ইনিংস৷

তিন ফরম্যাটে ক্যারিয়ারের সেরা তিনটি ইনিংসই গত বছরের!

হ্যাঁ৷

তাহলে শুরুতে যে জানতে চাইছিলাম, এটি আপনার ক্যারিয়ারের সেরা সময় কিনা– তা তো এখন বলাই যায়৷ সামনে নিশ্চয়ই আরো ভালো হবে৷ যা-ই হোক, একটু যদি বলেন, আপনার মুখোমুখি হওয়া সেরা বোলার কে?

অনেকের বল খেলাই তো কঠিন৷ তবে অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফের কথা বলতে পারি৷ যদিও সেটি আমার ক্যারিয়ারের একেবারের শুরুর দিকের, কিন্তু ওর বল খেলা খুব কঠিন মনে হয়েছে৷ আর স্পিনারদের মধ্যে মুত্তিয়া মুরালিধরনের বিপক্ষে ব্যাটিং করা ভীষণ কঠিন৷

প্রতিপক্ষের কোনো ব্যাটসম্যানকে দেখে মনে হয়েছে, ইস্, যদি এমন ব্যাটিং করতে পারতাম?

মনে না হওয়ার কারণ নেই৷ বিরাট কোহলির ব্যাটিং দেখে মনে হয়, কিছুটা হলেও যদি ওর মতো খেলতে পারতাম!

জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে হতাশাজনক হার কোনটি?

অবশ্যই প্রথমেই আসবে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের কাছে হারটি৷ জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও ছোটখাট ভুলে হারি৷ আমিও সেদিন ভুল করেছিলাম৷ এটি ক্রিকেটার হিসেবের খুব হতাশার ছিল৷ আর নিদহাস ট্রফির ফাইনালটি৷ ভারতের কাছে এ দুটি হারই সবচেয়ে হতাশার৷

আবার জাতীয় দলের অধিনায়ক হবার ইচ্ছে আছে, যদি কখনো সুযোগ পান?

না ভাই, আর ইচ্ছে নেই৷ অধিনায়ক হিসেবে আমার যা দেবার, সেটি দিয়ে ফেলেছি বলে মনে হয়৷ অধিনায়ক হিসেবে আর কিছু দেবার নেই৷

আর ক্রিকেটার হিসেবে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কি বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা?

তা তো অবশ্যই৷ উঁচিয়ে ধরা বলতে, আমার তো আর প্রথম ট্রফি ধরার সুযোগ হবে না৷ অধিনায়কের হাত ধরেই যেন আমরা বিশ্বকাপ ট্রফি পাই৷

একেবারে শেষ প্রশ্ন৷ ২০০৫ সালে লর্ডসে আপনার অভিষেক৷ প্রায় ১৪ বছর ধরে খেলছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট৷ ৬৬ টেস্টে ৪০০৬ রান; গড় ৩৫ দশমিক ১৪; সেঞ্চুরি ৬টি৷ ১৯৮ ওয়ানডেতে ৩৪ দশমিক ৯৪ গড়ে ৫৩৪৬ রান; ৬ সেঞ্চুরি৷ এ রেকর্ডে আপনি সন্তুষ্ট? নাকি মনে হয় রান আরেকটু বেশি হতে পারতো, গড় আরেকটু বেশি হতে পারতো, আরো কিছু সেঞ্চুরি হতে পারতো?

তা তো অবশ্যই৷ দেখুন, ভালোর কোনো শেষ নেই৷ আমি না, যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই তা বলবে৷ যাঁর গড় ৫০, সে-ও বলবে যদি ৫৫ কিংবা ৬০-এর কাছাকাছি গড় নিয়ে যেতে পারতাম! কিন্তু যেভাবে আমি শুরু করেছিলাম, ২০-২২ গড় থেকে এখন যে জায়গায় এসেছি, সেটি অনেক বড় পদক্ষেপ৷ সেটি গত পাঁচ-সাত বছরের পরিশ্রমের ফল৷ পরের পাঁচ-সাত বছর যদি এ ধারাবাহিকতা রাখতে পারি, তাহলে আমি খুব আনন্দিত হবো৷ তাহলে মনে হয় অবসরের সময় আমার পরিসংখ্যান খুব একটা খারাপ হবে না৷

সূত্র : ডয়চে ভেলে

 


আরো সংবাদ

rize escort bayan didim escort bayan kemer escort bayan alanya escort bayan manavgat escort bayan fethiye escort bayan izmit escort bayan bodrum escort bayan ordu escort bayan cankiri escort bayan osmaniye escort bayan