১০ ডিসেম্বর ২০১৯

গোলাপি বলে খেলতে ভারতের এতো ভয়?

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দলই এই প্রথম গোলাপি বলে টেস্ট ম্যাচ খেলবে। উভয় দলেই চলছে এই বল নিয়ে বিস্তর আলোচনা। কী আচরণ করবে এই বল, কতটা সুইং করবে, কীভাবে ব্যাটিং করতে হবে গোলাপি বলের বিরুদ্ধে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন নিয়ে কথা বলছেন খেলোয়াড়রা।

আজিঙ্কা রাহানে ভারতের টেস্ট দলের মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান, যিনি গোলাপি বল দিয়ে অনুশীলন করে রীতিমত ভীতি প্রকাশ করেছেন।‘বলটা ধীরে খেলতে হবে, ব্যাট ও শরীরের দূরত্ব কম রাখা প্রয়োজন,’ গোলাপি বলে অনুশীলন শেষেই কীভাবে খেলতে হবে তার একটা ধারণা দিতে চাইলেন তিনি।

গোলাপি বল নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে নানা গুঞ্জন, সেটা বোঝা গিয়েছিল বিরাট কোহলির ১৩ই নভেম্বরের এক সংবাদ সম্মেলনে। পরের দিনই ছিল প্রথম টেস্ট, যেটা কিনা লাল বলের। কিন্তু সেদিন সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ছিল গোলাপি বল নিয়ে - কী ভাবছেন কোহলি?

কোহলি বলেন,‘শুরুতে খানিকটা দেখে-শুনে খেলতে হবে, লাল বলে যতটা সহজে আপনি বলের সাথে মানিয়ে নেন গোলাপি বলে তেমনটা হবে না। তেমন শট খেলাও কঠিন হবে।সিম অনেক বেশি নড়াচড়া করে, বিশেষত যেসব মাঠে সুইং হয় সেসব মাঠে খেলা অনেক কঠিন হবে, যদি ঘাস থাকে তো কথাই নেই। এটা বেশ বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।’

তবে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার স্বার্থে এই খেলা পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেয়ার কথা বলেন কোহলি,‘টেস্ট ক্রিকেটে এখন নতুন উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে, সেখানে এই খেলাটিকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলবে।’

একদিন ব্যাট করেই বলের আচরণে একটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন কোহলি,‘এটা বেশি সুইং করে, এটায় বাড়তি ল্যাকার থাকবে (বলের ওপরের চকচকে রঙের স্তর)। ফাস্ট বোলারদের জন্য এটা বিশাল একটা সুবিধা। ল্যাকার কমে গেলে পুরোনো বল কেমন করবে - সেটাও হবে একটা দেখার বিষয়।’

ল্যাকার হচ্ছে সেই পদার্থ - যার কারণে নতুন লাল বা গোলাপী বলে ঔজ্জ্বল্য থাকে। উইকেটের সাহায্য ছাড়াও বল সাধারণত সুইং করে দুটো উপাদানের ওপর নির্ভর করে, যার একটি সিম, আর আরেকটি হলো বলে ল্যাকারের পরিমাণ। ল্যাকার যতো কমতে থাকে তত ঔজ্জ্বল্য কমতে থাকে। যে কারণে পুরোনো বল দিয়ে যেসব বোলার সুইং করাতে পারেন - তাদের কদর থাকে বাড়তি।

আজিঙ্কা রাহানে বলেন,‘আমরা এমন কিছু দিয়ে কখনো খেলিনি, আমরা অপেক্ষা করছি কী হয় আসলে, কীভাবে খেলবো তা ভেবে আমি খুব উত্তেজিত।’

দ্রুত মানিয়ে নিতে চাইছেন ভারত সহ-অধিনায়ক রাহানে,‘এই বলের মুভমেন্ট লাল বলের চেয়ে অনেক বেশি। মানিয়ে নেয়াটাই ব্যাপার। আশা করছি সবাই দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে। আমরা এখন সম্পূর্ণ অন্য ফরম্যাটে খেলব। টেকনিক্যাল স্কিলও একটা ভুমিকা রাখবে। মানসিকভাবে গোলাপি বলের সাথে মানিয়ে নেয়াটাই বড় কথা।’

ভারতের ঘরোয়া লিগ দুলীপ ট্রফিতে গোলাপি বল দিয়ে খেলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন টেস্ট ব্যাটসম্যান চেতেশ্বর পুজারা,‘যত খেলবো তত পেস ও বাউন্সের সাথে আমরা মানিয়ে নিতে পারবো, দুলীপ ট্রফিতে খেলেছি এই বল দিয়ে। তাই আমি কিছুটা হলেও জানি ঠিক কী করতে হবে।’

বাংলাদেশের প্রথম দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলার কথা ছিল আরো আগেই। নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড সর্বপ্রথম বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে প্রস্তাব দেয় গোলাপি বলে দিবা-রাত্রির টেস্ট ক্রিকেট খেলার কথা। কিন্তু সেবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড যথাযথ প্রস্তুতির অভাবের কথা বলে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নতুন প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলি, অধিনায়ক বিরাট কোহলির সাথে আলোচনা করে দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলার প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই বিষয়ে রাজি হয়। মিরপুর শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ৫ই নভেম্বর প্রথমবার গোলাপি বলে খেলে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।

জাতীয় লিগে খুলনা-রংপুরের ম্যাচ শেষে মিরপুরের মাঝের উইকেটে গোলাপি বল দিয়ে নেট করতে নামেন ইমরুল কায়েস ও মেহেদি হাসান মিরাজ। অনুশীলনের জন্য ইমরুলদের জন্য আনানো হয়েছে কুকাবুরার গোলাপি বল, ভারতে তাদেরকে খেলতে হবে এসজি বলে। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে গোলাপি এসজি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেটা নিয়েই টেস্ট খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিসিআই।

এজন্য ৭২টি বল অর্ডার করেছে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড, ভারতের গণমাধ্যমের খবরে এই তথ্য পাওয়া গিয়েছে।

প্রথমবার গোলাপি বলে অনুশীলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইমরুল বলেন লাল বলের সঙ্গে এর পার্থক্য,‘গোলাপি বল সুইংটা একটু বেশি করে বলে আমার কাছে মনে হলো। যেহেতু আমি প্রথমবার অনুশীলন করলাম, হয়তো এরপর আরেকটু ভালো করে বুঝতে পারবো আসলে কী হয়। মিরপুরের উইকেট একটু কঠিন ছিল, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় গোলাপি বল সুইং বেশি করে।’

বাংলাদেশের এই ওপেনিং ব্যাটসম্যান আরো বলেন,‘লাল বলে উজ্জ্বলতাটা নষ্ট হতে একটু সময় লাগে। কিন্তু গোলাপি বলে আমি যতটুক খেললাম আমার কাছে মনে হয় যে উজ্জ্বলতাটা দ্রুত কমে। তবে যতক্ষণ থাকবে সুইংটা একটু বেশি করবে।’

তবে বাংলাদেশের কোচ রাসেল ডমিঙ্গো গোলাপি বল দিয়ে প্রস্তুতি ম্যাচ না খেলার আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। সাধারণত কোনো টেস্ট সিরিজের আগে সফরকারী দল, স্থানীয় কোনো দলের সাথে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে থাকে কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

কোচ রাসেল ডমিঙ্গো এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের কোচ ডমিঙ্গো বলেন,‘খুব ভালো হতো গোলাপি বলে যদি দুই দিনের একটা ওয়ার্ম আপ ম্যাচ খেলা যেত। দক্ষিণ আফ্রিকা দলের সঙ্গে আমার সময়ে অ্যাডিলেডে টেস্টের আগে গোলাপি বলে একটা দুইদিনের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিলাম আমরা। প্রথম ও দুই টেস্টের মধ্যে মাত্র তিনদিনের ব্যবধান ছিল বলে কিছু খেলোয়াড়ের মধ্যে বেশ উদ্বেগ ছিল।’

রাসেল ডমিঙ্গো মনে করেন, গোলাপি বলে ব্যাটসম্যানদের জন্য সবচেয়ে বিপদজনক সময় সন্ধ্যা।

‘আমাদের একেবারে নির্দিষ্ট করে সূর্যাস্ত এবং আঁধার নামার মাঝের সময়টায় ব্যাট করতে হবে। এই সময়টাতে সংগ্রাম করতে হয় বেশি। রিস্ট স্পিনারদের বিপক্ষে খেলোয়াড়দের বেশ লড়তে হয়। কারণ, সিম দেখতে সমস্যা হয়।’

এই বলে খেলার শঙ্কার মূল কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সিম বোলারদের মানের পার্থক্য।

ভারতের বোলিং লাইন আপে এখন মোহাম্মদ শামি, ইশান্ত শর্মা, উমেশ ইয়াদাভের মতো বিশ্বমানের পেস বোলার আছেন যারা দুই দিকে বল সুইং করানো ও ব্যাটসম্যানদের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে বল করে সুবিধা নিতে পারেন উইকেটের।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে লম্বা ব্যাটিং লাইন আপ তৈরির জন্য ২ পেস বোলার নিয়ে নামে এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের এক ইনিংসে করা রানের চেয়েও ১৩০ রান কম করে দুই ইনিংসে অল-আউট হয়ে যায়। লাল বল রাতের অন্ধকারে দেখা বেশ কঠিন। বিশেষত যখন সেটা আকাশে ওঠে। তাই ২০০০ সাল থেকেই গোলাপি বলের পরিকল্পনা চলেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নানা বৈঠকে।

শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালে গোলাপি বল তৈরি করা হয় এবং সেটি দিয়ে ধীরে ধীরে খেলা শুরু করা হয়। ২০১৫ সালের ১৭ই নভেম্বর প্রথমবারের মতো অ্যাডেলেইডে দিবা রাত্রির টেস্ট ম্যাচ আয়োজিত হয় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে যেখানে ৩ উইকেটে অস্ট্রেলিয়া জয় পায়। সূত্র : বিবিসি।


আরো সংবাদ