১২ ডিসেম্বর ২০১৯

ঘরোয়া ক্রিকেটে আম্পায়ারাই ম্যাচের ফল নিয়ন্ত্রণ করেন!

‘আম্পায়ার দ্বারা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা একটা নিয়মিত দৃশ্য, এটা ওপেন সিক্রেট। অনেক দল দেখবেন আপনি, যে পায়ে বল লাগাতে ভয় পাচ্ছে। অনেকে দুই পা পেছনে থেকে বল করে, এটা এমনি বুঝবেন না, যে ক্রিকেটারের সাথে অন্যায় হচ্ছে সেই অনুভব করছে এটা কেমন কষ্টের’। কথাগুলো দ্বিতীয় বিভাগ লিগের একজন ক্রিকেটারের।

ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় এই প্রেক্ষিতে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। একটা বড় অভিযোগ আসে এই ক্রিকেটারের বক্তব্যে, ‘নির্দিষ্ট কিছু ক্লাবই এই সুবিধা পেয়ে থাকে, এটাকে ম্যাচ পাতানো বলবেন কি না জানিনা; কিন্তু আমরা জানি আজ এই ম্যাচ আমরা হারবো।’

সম্প্রতি ক্রিকেটাররা যে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন তার একটা দাবি ছিল আম্পায়ারদের নিয়ে। যেখানে সাকিব আল হাসান বলেছিলেন, ঢাকার লিগের কোন ম্যাচে কোন দল জয়লাভ করবে, খেলার আগে থেকেই সেটা সবাই জানে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের ক্রিকেটে আম্পায়ারিং নিয়েও ক্রিকেটাররা সোজাসাপটা অভিযোগ করেছেন।

সাকিব আল হাসানের বক্তব্য এখানে তুলে ধরা হল, ‘একটা ক্রিকেটারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ডিভিশন ক্রিকেটের ওপর। একটা প্লেয়ার ভালো একটা বলে আউট হতেই পারে; কিন্তু দুটো বা তিনটি ম্যাচে যদি বাজে সিদ্ধান্তের কারণে আউট হয় সেক্ষেত্রে সেই নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারে এটার প্রভাব পড়ে।’

এই অভিযোগ আবারো আলোচনায় এসেছে সাম্প্রতিক একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। তৃতীয় বিভাগের একটি ম্যাচের পর দুই আম্পায়ারকে ঘিরে ধরে প্রতিবাদ করে ক্রিকেটাররা। দুই আম্পায়ারের মধ্যে কারো সাথেই কথা বলা সম্ভব হয়নি এবং ম্যাচ রেফারি এই ম্যাচ নিয়ে বা এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টার পর তিনি জানান, যে তিনি একটি ম্যাচে ব্যস্ত আছেন পরে যোগাযোগ করতে, পরে আর কোনো ফোন তিনি ধরেননি।

ম্যাচ শেষে আম্পায়ারদের রিভিউ ডায়রিতে ৩০ এর মধ্যে ৬ পান দুই আম্পায়ার, অর্থাৎ প্রতিটি স্তরে সর্বনিম্ন এক করে দেন অভিযোগকারী দলের অধিনায়ক।

অভিযোগকারী ক্লাবের কর্মকর্তা বলেন, ‘ম্যাচের শুরু থেকে আমাদের বিপক্ষে একের পর এক বাজে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আম্পায়াররা। তবু আমরা ক্রিকেটের স্বার্থে খেলা চালিয়ে গেছি। লড়াই করেছি। জয়ের মতো অবস্থাও সৃষ্টি করেছি। কিন্তু আম্পায়ারদের জন্য পারিনি।’

৫০ ওভারের ম্যাচে একটি দল অলআউট হয়েছিল ১৪৮ রানে। রান তাড়া করতে নেমে অভিযোগকারী দল ৪০ রানে ৫ উইকেট হারায়। এক পর্যায়ে রান ছিল ৫ উইকেটে ১১৯। সেখান থেকে ৯ রানের মধ্যে পড়ে যায় তাদের শেষ ৫ উইকেট। ম্যাচ হেরে যায় তারা ২০ রানে।

প্রতিপক্ষ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তিনি বলেন, এই ম্যাচে বা কোনো ঘটনায় ক্লাবের কেউ উপস্থিত ছিল না। তাই এই বিষয়ে তারা মন্তব্য করতে চান না।

বিসিবি আম্পায়ার্স কমিটি কী বলছেন
আম্পায়ার্স কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ক্লাব কর্তৃপক্ষ একটি অভিযোগ এনেছে যে ম্যাচের একজন আম্পায়ার ঢাকার একটি ক্লাবের প্রতিনিধি। একজন ক্লাব প্রতিনিধি কীভাবে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।

এনিয়ে কথা বলেছি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আম্পায়ার্স কমিটির সদস্য সচিব, সয়লাব হোসেন টুটুলের সাথে। তিনি বলেন, ‘এনামুল হক মনি ডিওএইচএসে খেলতো, সব আম্পায়ারই কোনো না কোনো দলে খেলেছে। কোনো ক্লাবের সাথে যুক্ত থাকা মানে যে নিরপেক্ষ নয় তা না।’

টুটুলের মতে, আম্পায়াররা সবাই পরীক্ষা দিয়েই এই পর্যায়ে এসেছেন। তিনি উক্ত ম্যাচ নিয়ে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন, আবার বলেন সকল তথ্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অর্থ্যাৎ বিসিবি সভাপতি ও প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠানো হয়েছে।

তার মতে, একটা ম্যাচে যারা হেরে যায়, তারা এমনটা বলেই থাকে। ‘এইটাতে (ভিডিওর কথা ইঙ্গিত করেন তিনি) কী প্রমাণ করে, একটা পরাজিত দল আম্পায়ার মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় আক্রমণ করে। এই লিগের আট নম্বর রাউন্ড চলছে এখন এসে এসব কথা কীভাবে বলে।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপনের উদ্ধৃতি নিয়ে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সাহেব নিজেই বলেছেন, মাঠে ক্যামেরা আছে। আমরা সেটা নিয়ে কাজ করবো। আমরা প্রেসিডেন্ট ও সিইওকে পাঠিয়েছি। শুধু ওই একটা ফুটেজ দেখে আম্পায়ারকে দোষারোপ করার অবস্থা তো নেই। পরাজয় হলেই খারাপ আর জিতলেই ভালো আম্পায়ারিং হবে ব্যাপারটা কী এমন?- এমন প্রশ্ন রেখেছেন আম্পায়ার্স কমিটির কর্মকর্তা সয়লাব হোসেন টুটুল।

আম্পায়ারিং নিয়ে প্রায়ই এমন কথা শোনা যায় যেখানে আসলে আম্পায়ারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন নজির বাংলাদেশের ক্রিকেটে নেই। এমন কথার বিরোধীতা করেন সয়লাব হোসেন টুটুল, ‘ক্যামেরা লাগানো হয়েছে তো এখন, আম্পায়াররা তো এমন কেউ নয় যে তারা বিচারের উর্ধ্বে। তাদের বিচার করার মতো অবস্থা হলে বিচার হবে।’

তিনি বলেন, এসব অভিযোগের কোনো শেষ নেই।

সমস্যার মূলে কী আছে
ক্রীড়া সাংবাদিক এম এম কায়সার বলেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ লিগের নিয়মিত ঘটনা এমন আম্পায়ারিং।

কিন্তু প্রতিবাদ প্রতিনিয়ত হয় না, ‘গেল তিন চার বছরে আম্পায়ারিং এর কথা যদি বলি তাহলে দেখবেন আম্পায়ারিং বেশ করুণ অবস্থায় আছে। অনেক ম্যাচে এমন সিদ্ধান্ত আসে যে ক্রিকেটের আদর্শই নষ্ট হয়ে যায়।’

এমন আম্পায়ারিংয়ের পেছনে কারণ বলে মনে করেন তিনি কাউন্সিলরশিপ। কী এই কাউন্সিলরশিপ?, ‘এই ক্লাবগুলোর সাথে যেসব কর্মকর্তারা জড়িত তারা কাউন্সিলরশিপ পাওয়ার জন্যই আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকেন। এরপর বিসিবিতে বিভিন্ন পদে তারা বসেন।’

মূলত যেসব ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকরা কাউন্সিলরশিপ পান, তারা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনে দুটো ভোট দেয়ার অধিকার লাভ করেন। যেমন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ক্রিকেটের সেরা ছয়টি ক্লাব, অর্থাৎ সুপার সিক্স পর্যায়ে উত্তীর্ণ ক্লাবগুলোই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

এম এম কায়সার বলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটে এসব ঘটনা এমনভাবে আসে যেন এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা; কিন্তু এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা হয়েই আসছে, হঠাৎ কেউ প্রতিবাদ করলে দু-একটা কথা হয়, নতুবা হয় না।

ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ধর্মঘটের পরপরই অবশ্য বলেন, ‘মাঠে ক্যামেরা লাগানো হয়েছে, আমি যদি তিন বছর পর্যন্ত থাকি এসব কোনোকিছুকেই সুযোগ দেয়া হবে না।’

এই বক্তব্য দেয়ার এক মাসের মধ্যেই তৃতীয় বিভাগ লিগে এই ঘটনা ঘটে।

৪ বলে ৯২! ১ ওভার ১ বলে ৬৯!
এর আগেও নানা ঘটনায় উঠে আসে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আম্পায়ারিং নিয়ে নানা অভিযোগ। যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ৪ বলে ৯২ রান দিয়ে ১০ বছর নিষিদ্ধ হওয়া এক ক্রিকেটার। ঘটনাটি ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে, ৪ বলে ৯২ রান দেওয়া বোলার সুজন মাহমুদ দশ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হন। আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছিল লালমাটিয়া ক্লাব।

একই ধরনের অপরাধে নিষিদ্ধ হয়েছিল ফিয়ার ফাইটার্স ক্লাব এবং তার বোলার তাসনিম।

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের ১১ তারিখ ঢাকার দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লীগের এক ম্যাচে এক ওভারের প্রথম চার বলে ৯২ রান হওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট নানা জনপ্রিয় খবরের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল।

লালমাটিয়া ক্লাবের বোলার সুজন মাহমুদ প্রতিপক্ষ এক্সিওম ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে বল করতে গিয়ে নো-বল এবং ওয়াইড বল দেন। চার বলে ওয়াইড করেন ৬৫ বার। রান গিয়ে দাঁড়ায় ৯২।

লালমাটিয়া ক্লাবের পক্ষ থেকে বলা হয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে প্রতিবাদে বোলার এই কাণ্ড করেছেন। ঐ ঘটনার পরপরই জানা যায় আগের দিনও এক ম্যাচে একই রকম ঘটনা ঘটেছে।

ফিয়ার ফাইটার্স নামের এক ক্লাবের বোলার তাসনিম আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে ১ ওভার ১ বলে ওয়াইড আর নো বল করে ৬৯ রান দেন। বোলার সুজন মাহমুদ এবং তাসনিমকে ক্রিকেট থেকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। লালমাটিয়া ক্লাব এবং ফিয়ার ফাইটার্সকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের যে মুখপাত্র তখন ঘটনার পরে শাস্তির কথা বলেন, তার ভাষ্যমতে এই ক্রিকেটাররা বিদেশে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করেছে। এই ম্যাচের দায়িত্বে থাকা আম্পায়ারকে ৬ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ডিসিপ্লিনারি কমিটি।

এই রিপোর্টের বিষয়ৈ ক্রিকেট বোর্ডের নানা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু এই বিষয়ে কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি। এতে বোঝা যায় যে কতটা স্পর্শকাতর এই নির্দিষ্ট বিষয়টি।

এমনকি বোর্ডের কর্মকর্তারা নিজেরাই বিভিন্ন ‘নাম’ নিয়ে পরামর্শ দিয়েছে কথা বলার জন্য কিন্তু তারা কেউই এই বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি এবং বলেছেন যে এই বিষয়ে তারা কিছুই জানেননা।

তবে একজন বোর্ড কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিছু কথা বলেছেন যার সারমর্ম, বাংলাদেশে চক্ষুলজ্জ্বার খাতিরে প্রথম বিভাগ লিগে মোটামুটি ঠিকঠাক আম্পায়ারিং হয়, এর নিচে নামলে এটা একটা ওপেন সিক্রেট যে কিছু আম্পায়ারদের দেখলে ক্রিকেটাররা ভয় পান রীতিমত।

তিনি বলেন, ‘আপনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের আম্পায়ারদের প্যানেল দেখলেই বুঝতে পারবেন, যে মান কোথায়।’

বাংলাদেশের চারজন আম্পায়ার আন্তর্জাতিক আম্পায়ারদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন, তারা হলেন- শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ, তানভির আহমেদ, মাসুদুর রহমান মুকুল ও গাজী সোহেল।

তারা বাংলাদেশের ম্যাচ বিশেষত যেসব ম্যাচ বাংলাদেশের মাটিতে হয় সেখানেই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বিবিসি


আরো সংবাদ