১২ ডিসেম্বর ২০১৯

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ : উনিশ বছর পরও পুরোনো হাহুতাশ

২০১৬ সালে ঢাকায় একটি টেস্টে ইংলিশদের ১০৮ রানে হারাতে সক্ষম হয় টাইগাররা। - ছবি : এএফপি

বাংলাদেশের জন্য টেস্ট ক্রিকেট যদি ধাঁধা হয়, সেটি সেই প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই। সেই পরিচয় আজ থেকে উনিশ বছর আগের এক নভেম্বরে।

অন্য অনেক দেশের যা জানতে অনেক দিন লেগেছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হয়নি। চার দিনের মধ্যেই টেস্ট ক্রিকেট পুরো বিপরীত দুই রূপ দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে। প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান করে বাকি ক্রিকেট বিশ্বের সাথে নিজেদেরও চমকে দেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৯০ রানে অলআউট! বৈপরীত্য আর কাকে বলে!

উনিশ বছর কেটে যাওয়ার পরও মনে হয়, টেস্ট ক্রিকেটের রহস্যময়তার সাথে বাংলাদেশের পরিচয়পর্ব এখনো শেষ হয়নি। এই ভালো তো এই খারাপ! কথাটা লিখেই মনে হলো, এভাবে ভালো আর খারাপ এক নিঃশ্বাসে বলাটা কি ঠিক হলো? ‌‌‘ভালো’তো আঙুলের কড়ে গুনতে শুরু করতে না করতেই শেষ আর ‘খারাপ’ যেন অনিঃশেষ।

মাঝখানে কিছুদিন একটু খারাপ করতেই বাংলাদেশের টেস্ট খেলার যোগ্যতা বা অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফেলত ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম। গত কিছুদিন আর তোলে না। তবে বাংলাদেশে প্রশ্নটা এখনো বাতাসে ঘুরপাক খায়, যেমন খাচ্ছে ভারতের বিপক্ষে ইন্দোর টেস্টে তিন দিনেই ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়ের পর থেকে। উপমহাদেশে প্রথম বলে ‘ঐতিহাসিক’ মর্যাদা পেয়ে যাওয়া কলকাতার দিবা-রাত্রির টেস্টের আগে তাই রোমাঞ্চের চেয়ে আশঙ্কার চোরাস্রোতই বেশি বয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের শিরদাঁড়া বেয়ে। ইন্দোরে ঝকঝকে রোদেই যেখানে ভারতীয় পেসাররা বল অমন সুইং করিয়েছেন, সেখানে সন্ধ্যার পর গোলাপি বলে তারা না জানি কী করেন!

বাংলাদেশের জন্য টেস্ট ক্রিকেট আবার না পরিণত হয় নিষ্ঠুরতার আরেক নামে।

টেস্ট ক্রিকেট স্বভাবগতভাবেই নিষ্ঠুর। ওভার নির্দিষ্ট ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টিতে অনেক সময় ফাঁকিজুকি দিয়ে পার পাওয়া যায়, আড়াল করে রাখা যায় অনেক ঘাটতি, কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে সে সবের সুযোগ নেই। নামটা একেবারে যথার্থ। টেস্ট ক্রিকেট মানে আক্ষরিক অর্থেই ‘টেস্ট’। শুধু ক্রিকেটীয় দক্ষতারই নয়, শারীরিক ও মানসিক শক্তিরও। শুধুমাত্র মাঠে নামা ১১ জন নিয়ে নয়, একটা দেশের ক্রিকেটীয় সংস্কৃতি টেস্ট উপযোগী না হলে যেটি জয় করা খুব কঠিন।

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের মূল সমস্যাটাও এখানেই। এই দেশের ওয়ানডেবান্ধব ক্রিকেট সংস্কৃতি তরুণ ক্রিকেটারদের মনে টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করার স্বপ্ন বুনে দেয় না। এ দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো টেস্ট ক্রিকেটের উপযোগী ক্রিকেটার তৈরি করার মতো যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নয়।

খুঁজলে এমন আরো অনেক কারণ পাওয়া যাবে৷ তার আগে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস নিয়ে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার কটাক্ষ একটু কমে যাওয়ার কারণটা মনে করিয়ে দিই। সেটি খুবই সরল। বাংলাদেশের কাছে টেস্টে হারা। কোনো দলের কাছে হারলে তো আর সেই দলের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের গর্বে নাক যতই উঁচু থাক না কেন, এটুকু ভদ্রতাবোধ অন্তত ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার আছে।

ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওই দুটি টেস্ট জয় পরপর দুই বছরে— ২০১৬ ও ২০১৭ সালে। দুটিই মিরপুরে এবং দুটিই একই ফর্মুলা অনুসরণ করে। প্রথম দিন থেকেই বল ঘোরে, এমন টার্নিং ট্র্যাকের কল্যাণে, যা ব্যাটসম্যানশিপের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয়। বলতে পারেন, ব্যাটিংটা অনেকটাই পরিণত হয় ‘লটারি’তে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদেরও তো এমন উইকেটে ব্যাটিং করার অভ্যাস নেই। এ কারণে টেস্ট জিতলেও বাংলাদেশের সিরিজ জেতা হয়নি। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া একটি টেস্ট যেমন হেরেছে, তেমনি জিতেছেও একটি। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের কারণে সিরিজ ড্র করাই বিবেচিত হয়েছে বড় বিজয় বলে। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই জয়ের মাঝখানে শ্রীলঙ্কায় নিজেদের শততম টেস্টটিও জয়ের রঙে রাঙিয়েছিল বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় সবসময়ই একটু বাড়তি মর্যাদা দাবি করে। সব মিলিয়ে ওই বছরখানেক সময়ে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ মনে হয় টেস্ট ক্রিকেটটা একটু খেলতে শিখে গেছে।

সেই ধারণার ধাক্কা খেতেও সময় লাগেনি। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ওই তিন জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের। বাকিদের টুকটাক অবদান তো ছিলই, তবে বলতে গেলে জয়ের আশি ভাগ কৃতিত্বই পাওনা ছিল এই দুজনের। তা যেকোনো দলেই তো সিনিয়র খেলোয়াড়দের ওপর এমন নির্ভরতা থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটা হলো, এই দুজনের অভাব অর্ধেক পূরণ করতে পারেন, এমন কেউ নেই।

ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় যদি বাংলাদেশের কপালে জয়টীকা হয়, সেটির পাশেই কলঙ্কের দাগ এই গত সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট হেরে বসা। পরাজয়েরও তো ধরন থাকে। বৃষ্টির কল্যাণে ড্র একরকম নিশ্চিত হয়ে যাওয়া টেস্ট বাংলাদেশ যেভাবে হারতে সক্ষম হয়েছে, সেটি একইসাথে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে অনেক কিছু নিয়ে। দক্ষতা, সামর্থ্য, মানসিকতার সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের টেস্ট খেলার আগ্রহও চলে এসেছে আতশ কাচের নিচে।

চট্টগ্রামে সেই টেস্টে লজ্জাজনক পরাজয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে এই পরাজয়ের সূত্র ধরে চলে আসা বাংলাদেশের ক্রিকেটের নানারকম সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করায় অধিনায়ক সাকিব আল হাসান মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‌‘হারলেই শুধু এসব নিয়ে কথা হয়’।

এ কথা বলে সাকিব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করেননি। বোঝাতে চেয়েছেন, হারার পর সমস্যাগুলো আলোতে এলেও কদিন পরই তা আবার হারিয়ে যায় অন্ধকারে। কথাটা মিথ্যা নয়। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সমস্যার কারণ খুঁজতে গেলে এমন অনেক কিছু আসবে, যা গত ১৯ বছর ধরেই আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু ওই আলোচনা পর্যন্তই, সমাধান আর হয়নি।

এক নম্বরে আসবে ঘরোয়া ক্রিকেট। বাংলাদেশের ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট প্রসঙ্গে এখনো ‘পিকনিক’ ক্রিকেট কথাটা ব্যবহৃত হয়। আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি তো হয়েছেই, তবে এখনো সেটি টেস্ট ক্রিকেটের জন্য ক্রিকেটারদের প্রস্তুত করতে পারে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ। উইকেট নিয়ে আলোচনাও টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সমান বয়সি। বেশির ভাগ এমন উইকেটে খেলা হয়, যেখানে পেস বোলারদের জন্য কিছুই থাকে না। শুরুতে কয়েক ওভার বোলিং করার পর পেসাররা তাই পরিণত হন শুধুই ফিল্ডারে। সেই পেসার যখন টেস্ট ক্রিকেটে সুযোগ পাবেন, দিনে ১৫/১৬ ওভার, কখনো এর চেয়েও বেশি বোলিং কীভাবে করবেন? তার তো এই অভ্যাসই নেই।

ক্রিকেটারদের মধ্যে আত্মনিবেদনের অভাব আছে। তবে এরও অনেকটা দায় ওই ক্রিকেট কাঠামোর। ফার্স্ট ক্লাস পর্যায় থেকেই পেশাদারিত্বে যে দীক্ষা নেয়ার কথা, সেটি হচ্ছে না।

সূত্র : ডয়চে ভেলে


আরো সংবাদ