১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯
বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক রুট

ট্রিপ কম দেখিয়ে বিআরটিসির কোটি টাকা লোপাট

বিআরটিসির কোটি টাকা লোপাট বাংলাদেশ-ভারত আন্তর্জাতিক রুট - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ-ভারত রুটে চলাচলকারী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) পাঁচ মাসে এক কোটি ২৯ হাজার টাকা লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

জানা গেছে, ঢাকা-কলকাতা, ঢাকা ভায়া খুলনা-কলকাতা, আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা ও ঢাকা-শিলং আন্তর্জাতিক রুটে বিআরটিসি সরাসরি বাস সার্ভিসে ট্রিপ কম দেখিয়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের বিআরটিসি ও পশ্চিমবঙ্গের ডব্লিউবিসি ও আরগরতলার টিআরটিসি দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী বাস পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা না থাকায় দীর্ঘদিন বিআরটিসি শ্যামলী পরিবহনকে দিয়ে ঢাকা-কলকাতা বাস সার্ভিস পরিচালনা করে আসছিল। এ জন্য প্রতিটি রাউন্ড ট্রিপ বাবদ বিআরটিসিকে শ্যামলী পরিবহন ৩১ হাজার ৫০০ টাকা দিতো। প্রটোকল অনুযায়ী মাসে ২৬টি রাউন্ড ট্রিপ নিয়ম রয়েছে। এ হিসেবে শ্যামলী পরিবহন বিআরটিসিকে মাসে ৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা পরিশোধ করত। পাঁচ মাসে বিআরটিসিকে শ্যামলী পরিবহন ৪০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার কথা। 

এ ছাড়া ২০১৭ সালের ২২ মে থেকে ঢাকা টু খুলনা হয়ে সরাসরি কলকাতা বাস সার্ভিস পরিচালনা শুরু করে গ্রিন লাইন পরিবহন। প্রটোকল অনুযায়ী ঢাকা-খুলনা-কলকাতা সরাসরি বাস সার্ভিস রুটে বিআরটিসির পক্ষে ১৩ রাউন্ড ট্রিপ দেয়ার নিয়ম রয়েছে। গ্রিন লাইন পরিবহন প্রতি রাউন্ড ট্রিপ পরিচালনার জন্য ৩১ হাজার টাকা বিআরটিসিকে পরিশোধ করত। এ হিসাবে বিআরটিসিকে মাসে ৪ লাখ ৩ হাজার টাকা পরিশোধ করত গ্রিন লাইন পরিবহন। পাঁচ মাসে গ্রিন লাইন পরিবহন বিআরটিসিকে ২০ লাখ ১৫ হাজার টাকা পরিশোধ করত। কিন্তু এ বছর জানুয়ারি থেকে ঢাকা-কলকাতা সরাসরি বাস সার্ভিস পরিচালনার জন্য এনআর ট্রাভেলস শ্যামলী পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতি রাউন্ড ট্রিপ বাবদ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকা বিআরটিসিকে দেয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। তবে প্রতি ট্রিপে বিআরটিসিকে রাজস্ব বেশি দেয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেও এনআর ট্রাভেলস শ্যামলী পরিবহন করপোরেশনটির মতিঝিলের বাস ডিপো ম্যানেজারসহ কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশে ঢাকা-কলাকাতা ২৬ ট্রিপের স্থলে মার্চ মাসে ১৩ ট্রিপ, এপ্রিল মাসে ১৩ ট্রিপ, মে মাসে ১২ ট্রিপ ও জুন মাসে ১২ ট্রিপ দেখিয়েছে। এতে মার্চ মাসেই ট্রিপ কম দেখিয়ে ১০ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা করপোরেশনে কম জমা দেয় এনআর ট্রাভেলস শ্যামলী পরিবহন। 

একইভাবে ঢাকা-খুলনা-কলাকাতা রুটে প্রটোকল অনুযায়ী ১৩ ট্রিপের প্রতি ট্রিপে ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা বিআরটিসিকে দেয়ার জন্য এনআর ট্রাভেলস শ্যামলীর পরিবহনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু একইভাবে ১৩টির স্থলে ফেব্রুয়ারি মাসে ৬ ট্রিপ, মার্চ মাসে ৭ ট্রিপ, এপ্রিল মাসে ৫ ট্রিপ, মে মাসে ৬ ট্রিপ ও জুন মাসে ৬ ট্রিপ দেখায় এনআর ট্রাভেলস শ্যামলী পরিবহন। এ হিসাবে ১৩ ট্রিপ হিসেবে প্রতি মাসে বিআরটিসিকে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা জমা দেয়ার কথা। সেখানে এনআর ট্রাভেলস শ্যামলী পরিবহন ফেব্রুয়ারি মাসে ৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, মার্চ মাসে ৪ লাখ ৫১ হাজার ৫০০ টাকা, এপ্রিল মাসে ৩ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা, মে মাসে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ও জুন মাসে ৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা জমা দেয়। এ হিসাবে ফেব্রুয়ারি মাসে এনআর ট্রাভেলস শ্যামলী পরিবহন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টাকার স্থলে বিআরটিসিকে জমা দেয় ৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। 

জানা গেছে, উভয় দেশের প্রটোকল অনুযায়ী আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা রুটের ৮ ট্রিপের স্থলে ফেব্রুয়ারিতে ৫ ট্রিপ, মার্চে ৬ ট্রিপ, এপ্রিলে ৬ ট্রিপ, মে’তে ৫ ট্রিপ ও জুন মাসে ৬ ট্রিপ চালানো হয়েছে দেখানো হয়। এ হিসাবে ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা রুটে বিআরটিসিকে এনআর ট্রাভেলস শ্যামলী পরিবহন ১১ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ টাকা কম দিয়েছে। একইভাবে প্রটোকলের নিয়ম ও চুক্তি অনুযায়ী ঢাকা-শিলং রুটে মাসে ৪টি রাউন্ড ট্রিপ চালানোর কথা। সেখানে মে মাসে কোনো ট্রিপ হয়নি বলে দেখানো হয়। তামাবিল স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন তথ্য মতে মে মাসে এনআর শ্যামলী ৫টি রাউন্ড ট্রিপ দিয়েছে। এ ছাড়া ফেব্রয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, জুন মাসে একটি করে ট্রিপ দেখানো হয়েছে। ইমিগ্রেশনের তথ্য মতে মার্চে ৫ রাউন্ড ট্রিপ ও এপ্রিলে ৪ রাউন্ড ট্রিপ দিয়েছে এনআর ট্রাভেলস শ্যামলী পরিবহন। অতিরিক্ত ট্রিপ বাদে ৪ ট্রিপ হিসেবে পাঁচ মাসে যেখানে ৯ লাখ ১০ হাজার টাকা বিআরটিসিকে দেয়ার কথা সেখানে দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এভাবে করপোরেশনটি অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ট্রিপ কম দেখিয়ে গত ৫ মাসে এই চারটি রুটে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা রাজস্ব কম জমা দিয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে বিআরটিসিকে নতুন নতুন বাস এনে দিলেও একইভাবে বাস ডিপো ম্যানেজারদের সাথে যোগসাজশে ট্রিপ কম দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন করপোরেশনটির অসাধু কর্মকর্তারা। এর ফলে বিআরটিসিতে গত তিন বছর ধরে প্রতি বছর ৩ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। আর লোকসানের বোঝা বাড়তে থাকার কারণে বিআরটিসিতে ডিপো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতনভাতা দিতে পারছে না করপোরেশনটি। প্রতিটি ডিপোতে ৩ থেকে ৪ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে করপোরেশনটিতে। 

অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিল বিআরটিসির ডিপো ম্যানেজার ও বিভিন্ন রুটে পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বাস কোম্পানিগুলো এবং ইজারায় পরিচালনাকারী ব্যবসায়ীরা যোগসাজশে ট্রিপ কম দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করছে।


আরো সংবাদ