১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯
অরক্ষিত কমলাপুর রেলস্টেশন

ট্রেনে আসমাকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়

কমলাপুর রেলস্টেশন
কমলাপুর রেলস্টেশন - ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে (কমলাপুর) একটি ট্রেনের পরিত্যক্ত বগির টয়লেটের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া মাদরাসাছাত্রী আসমা আক্তারের (১৭) লাশের ময়নাতদন্ত গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, তরুণীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। তবে এটা গণধর্ষণ কি না তা নিশ্চিত হতে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানানো যাবে। 
এ দিকে ঘটনার প্রায় দুই দিন পরও এ ঘটনার সাথে জড়িত কোনো দুর্বৃত্তকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। শুধু পুলিশ নয়, এ ঘটনার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও এড়াতে পারে না বলে মনে করছেন রেল সংশ্লিষ্টরা। 

এ প্রসঙ্গে জানতে গতকাল সন্ধ্যার আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ শামছুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, কমলাপুর স্টেশনে কোনো খুনের ঘটনা ঘটেছে কি না সেটি আমি এখনো খবর নিতে পারিনি। আমি এ মুহূর্তে জরুরি কাজে যশোর এসেছি। তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে সেটি পুলিশ দেখবে। 

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে আসমার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্নের পর ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা: প্রদীপ বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ময়নাতদন্তের সময় মেয়েটির গলায় আমরা দাগ দেখতে পেয়েছি। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার আগে যে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে সে আলামত পেয়েছি। তবে একাধিক ব্যক্তির ধর্ষণের শিকার হয়েছে কি না সেটি জানতে টিস্যু, (হাই ভ্যাজাইনাল সফ) রক্ত ও ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে। গত সোমবার সকাল ৯টার দিকে স্থানীয়দের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের ওয়াশফিড এলাকার পবিত্যক্ত বলাকা ট্রেনের একটি বগির টয়লেট থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় পুলিশ আসমা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে। 

সোমবার রাতে কমলাপুর জিআরপি থানার ওসি রুশো বনিক নয়া দিগন্তকে বলেছিলেন, সকাল ৯টার দিকে স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মোতাবেক কমলাপুর রেল স্টেশনের ওয়াশফিড এলাকায় বলাকা ট্রেনের একটি ডেমেজ বগির টয়লেটের ভেতর থেকে ১৭-১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর লাশ উদ্ধার হয়েছে। লাশটি উদ্ধারের সময় গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল। ধারণা করছি, মেয়েটিকে দুর্বৃত্তরা শ্বাসরোধে হত্যা করতে পারে। তবে এর আগে সে ধর্ষিত হয়েছে কি না সেটি ময়নাতদন্তের আগে বলা যাচ্ছে না। মেয়েটির শরীরের কোথাও আঘাতের চিহ্ন পাইনি। এক প্রশ্নের উত্তরে ওসি বলেন, আমরা লাশের পাশ থেকে তার ব্যবহৃত একটি ব্যাগ পেয়েছি। সেই ব্যাগে কিছু কাগজপত্র ছিল। বার্থ সার্টিফিকেট ছিল। সেই অনুযায়ী তার পরিচয় আমরা নিশ্চিত হয়ে স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করি। আসমার গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলার শীলপাড়ায়। তার পিতার নাম আব্দুল রাজ্জাক মিয়া। 

তবে আসমার চাচা মো: রাজু পুলিশকে বলেছেন, রোববার সকাল থেকে তার ভাতিজি আসমা নিখোঁজ ছিল। সোমবার পুলিশের মাধ্যমে খবর পেয়ে লাশ শনাক্ত করেন। তিনি আরো জানান, আসমা গ্রামের একটি মাদরাসা থেকে গত বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। ওই গ্রামের একটি ছেলের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আসমা নিখোঁজের পর থেকে ওই ছেলেকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে ওই ছেলে জড়িত থাকতে পারে। নিহত আসমার বাবা একজন কৃষক। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে সে ছিল তৃতীয়। 

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কমলাপুর জিআরপি থানার ওসি রুশো বনিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। ডিউটি অফিসারের টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে সেটি ফ্যাক্সের লাইনে চলে যায়। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমলাপুর রেলস্টেশনের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। এক কথায় অরক্ষিত। যার কারণে প্রতিদিন স্টেশনে ছোট-বড় অপরাধ সংগঠিত হলেও সেদিকে কারো দৃষ্টি দেয়ার সময় নেই বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এসব ছিচকে চোর থেকে শুরু করে খুনিরা পর্যন্ত অনেকটা প্রকাশ্যেই স্টেশনে ঘোরাফেরা করলেও পুলিশ, আনসার ও আরএনবির সদস্যদের সেদিকে তেমন নজর নেই। তারা বেশির ভাগ ব্যস্ত থাকেন বিনা টিকিটের যাত্রীদের কিভাবে স্টেশনে ঢোকানো যায় এবং তাদের কাছ থেকে টাকা কামাই করা যায়। তবে কমলাপুর রেলস্টেশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, স্টেশনের মূল ফটক ছাড়াও আশপাশ থেকেও যেকোনো লোক স্টেশনের ভেতরে অবাধে প্রবেশ করতে পারে। যার কারণে তারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। লোকজনের অবাধে স্টেশনে প্রবেশের কথা বারবার রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর পরও তারা এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছেন না।


আরো সংবাদ