২৯ জানুয়ারি ২০২০

খুন হওয়ার ভয়ে খুনি!

-

রহিমা বেগম (৬৫)। বাস করতেন মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের এ ব্লকের ২ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে। তার তত্ত্বাবধানে ওই বাসায় দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে অসামাজিক কার্যকলাপ। উঠতি বয়সী মেয়েদের বাসায় রেখে তাদের দিয়ে এ কাজ করাতেন তিনি। আর বাহির থেকে খদ্দের জোগাড় করতেন বাবুল। ওই বাসায় খদ্দের হয়ে প্রায়ই আসতো এক কিশোর। ঘটনার দিন ওই কিশোরের সাথে আসে আরও এক যুবক। সারা রাত অসামাজিক কাজ করার পর ভোরে টাকা কম দিতে চাইলে দুই খদ্দেরকে মেরে ফেলার ভয় দেখান রহিমা। আর এতে ভয় পেয়ে যায় ওরা।

নিজেরা খুনের শিকার হতে পারে- এমন ভয়ে সুমি ও রহিমাকে গলা টিপে হত্যা করে শটকে পড়ে ওরা। খবর পেয়ে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওই বাসা থেকে দুই নারীর লাশ উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ। পরের দিন গত বুধবার নিহত বৃদ্ধা রহিমা বেগমের মেয়ে রাশিদা বেগম বাদি হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে মিরপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। থানা পুলিশের পাশাপাশি হত্যর রহস্য উন্মোচনে ছায়া তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দারাও। গত বুধবার রাতে সদরঘাট থেকে ইউসুফ খান (২০) ও রমজানকে (১৪) গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর রাতভর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যার চাঞ্চল্যকর রহস্য।

জানা গেছে, গত ২ ডিসেম্বর রাত ১১টায় মিরপুরে ওই বাসায় যায় ইউসুফ ও রমজান। তারা দু’জন পেশায় রাজমিস্ত্রি। হত্যার পরে ঢাকা থেকে পালানোর জন্য তারা গ্রামের উদ্দেশ্যে লঞ্চে উঠতে যাচ্ছিল।

গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, ওই কিশোর যেহেতু প্রায়ই রহিমার বাসায় গিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতো, সেহেতু তার সাথে বাড়ির দারোয়ানের পরিচিতি রয়েছে। তারা দুজন রাতে রহিমার বাসায় যাওয়ার পর বাসায় থাকায় তরুণী সুমির সাথে সারা রাত অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকতে চায়। তখন রহিমা ছয় হাজার টাকা চায়। কিন্তু তাদের কাছে টাকা ছিল সাড়ে তিন হাজার। তারা সাড়ে তিন হাজার টাকার প্রস্তাব দিলে রহিমা রাজি হয়নি। তখন ইউসুফ জানান, তাদের কাছে তিন হাজার টাকা আছে। কাজ শেষে বাকি টাকা রমজান এসে দিয়ে যাবেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়।

রহিমা এ সময় হুমকি দেন, বাকি টাকা না দিলে তারা বিষয়টি বাবুলকে (যৌন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারী) বলে দেবেন। তখন বাবুল এসে তাদের মেরে ফেলবে- এই বলে রহিমা দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন। সুমির ঘরে ইউসুফ ঢোকার পর রমজান দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাইরে বারান্দায় অবস্থান নেন।

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানায়, ভোর রাতের দিকে বারান্দায় থাকা রমজান সুমির ঘরে ঢোকেন। সুমি এতে চিৎকার শুরু করেন। তখন সুমির গলা চেপে ধরেন রমজান ও ইউসুফ। একপর্যায়ে মারা যান। এ অবস্থা দেখে তারা বুঝতে পারে, টাকা দিতে পারছি না। সকাল হলেই বাবুল চলে আসবে। টাকার জন্য মারধর করবে। বাইরেও যেতে পারছে না। কারণ বাইরের দরজায় তালা লাগানো, সেই তালার চাবিও রহিমার কাছে। সে জন্য ওই দুইজন রহিমার দরজায় নক করেন। রহিমা বের না হলে তাকে মোবাইল থেকে তিনবার কল করেন। রহিমা বের হয়ে টাকা চাইলে ওই দুইজন তার গলাও চেপে ধরেন। এতে রহিমা মেঝেতে লুটে পরে নিস্তেজ হয়ে যায়। পরে তারা চাবি দিয়ে ড্রয়ার খোলে নগদ ১৪ হাজার টাকা ও স্বর্ণ ভেবে ইমিটেশনের গয়না নিয়ে পালিয়ে যায়। এক দিন গা ডাকা দেয়ার পর বুধবার লঞ্চে চড়ে ভোলা যাওয়ার উদ্দেশ্যে সরদঘাট যায় তারা। সেখান থেকে ডিবি পশ্চিমের টিম তাদের গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার কথা স্বীকার করেছে বলে জানান বাতেন।
তিনি জানান, বাবুল নামে যে ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তবে বাবুল নামের কেউ নাও থাকতে পারে। রহিমা ভয় দেখানোর জন্য বাবুলের নাম দুই ঘাতককে বলতে পারেন বলে ধারণা করছে ডিবি। এ মামলায় দু’জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে গতকালই আদালতে প্রেরণ করেছে ডিবি পশ্চিম।


আরো সংবাদ