২৫ আগস্ট ২০১৯

মুরসির মৃত্যু : আরববিশ্বে গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা

-

মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে খুবই নিষ্ঠুরভাবে দেশটির আদালতে প্রহসনের বিচার চলাকালে হত্যা করা হয়েছে। স্বৈরশাসক আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে দীর্ঘ ছয় বছর একজন সাবেক প্রেসিডেন্টকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটক রেখে চিকিৎসাসহ সব মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন। মিসরের একটি আদালত কক্ষের শব্দনিরোধক খাঁচার ভেতরে তিনি মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন।
দীর্ঘ ছয় বছর তাকে একটি নির্জন কারাকক্ষে রাখা হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি মাত্র তিনবার তার পরিবার-পরিজনের দেখা পেয়েছিলেন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও লিভারের রোগে আক্রান্ত হলেও তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়নি। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার কারণে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ইহুদি-মার্কিন চক্র তাদের একচ্ছত্র আনুগত্য ও গোলামি অস্বীকারকারীদের প্রকারান্তরে এ ধরনের মৃত্যু অনিবার্য বলে ইঙ্গিত দিলেও একবিংশ শতাব্দীতে তথাকথিত মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়ার এ সময়ে গোটা মানবজাতির জন্য এটা লজ্জার এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়। আদালতের এজলাসে মুরসির মৃত্যুর ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নিন্দার ঝড় উঠেছে। মুসলিম বিশ্বের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। জাতিসঙ্ঘ মুরসির মৃত্যুর ঘটনার দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
মুরসির এই মৃত্যু ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক বলেছেন, মুরসির মৃত্যুর সাথে সাথে মিসরের গণতন্ত্রেরও মৃত্যু হয়েছে। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন, গোটা আরবের গণতন্ত্রেরই মৃত্যুর হলো। মুরসির এই মৃত্যুর মাধ্যমে ইসলামবিরোধী শক্তি তথা পশ্চিমা বিশ্ব পক্ষান্তরে এই সতর্ক বার্তাই দিয়েছেÑ মিসরে কেউ গণতন্ত্রের কথা বললে, ইসরাইলি স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে তবে মুরসির মতো পরিণতিই বরণ করতে হবে। আরবের অন্যান্য দেশের জন্যও এটা প্রযোজ্য। ইসরাইলের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়া মানেই মুরসির মতো মৃত্যু অনিবার্য।
ড. মোহাম্মদ মুরসি ১৯৫১ সালের ২০ আগস্ট মিসরের শারকিয়া প্রদেশের আল আদবিয়াহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন কৃষকের সন্তান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি পিএইচডি অর্জনের জন্য আমেরিকার সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সর্বোচ্চ স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৮২ সালে পিএইচডি লাভ করেন। এরপর তিনি আমেরিকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে দেশের টানে তিনি ১৯৮৫ সালে মিসরে ফিরে আসেন এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ২০০০ সালে মুরসি প্রথম এমপি নির্বাচিত হন। ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ থাকায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা হিসেবে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২০১২ সালে মিসরের দুই পর্বে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ড. মুরসি। কিন্তু জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালে দেশী-বিদেশী যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মুুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে।
স্বৈরশাসক সিসি মুরসির মৃত্যুর ব্যাপারে আন্তর্জাতিক দাবি অনুযায়ী কোনো তদন্ত করবে না এবং তার মৃত্যুর সত্যিকার কারণও হয়তো আমরা কিছুতেই জানতে পারব না। মিসরের দীর্ঘ ইতিহাসে দেশটি এখন অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে শাসন করা হচ্ছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন করে অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে মুরসিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার জন্য কি কেবল সিসি দায়ী? সিসিকে এই নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার জন্য যারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, তথাকথিত মানবাধিকারের যারা প্রবক্তা, সেই আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব কী করেছে? মুরসিকে দীর্ঘ ছয় বছর নির্জন কারাগারে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে, তখন কি পশ্চিমা বিশ্ব কোনো প্রতিবাদ করেছে? পশ্চিমা মানবাধিকার কেবল বাগাড়ম্বর ও ভণ্ডামি। তাদের স্বার্থের বিপরীতে কোনো কিছুকেই তারা সহ্য করে না।
মুরসির আকস্মিক মৃত্যুতে ফিলিস্তিনিরা বিশেষভাবে গাজাবাসী শোকাহত। ফিলিস্তিনিরা তাদের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক ও নিবেদিত প্রাণ একজন নেতাকে হারিয়েছেন। গাজার ফিলিস্তিনিরা মনে করেন, মাত্র এক বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকলেও তাদের পক্ষে শক্ত, নৈতিক ও কার্যকর অবস্থান নেয়ার কারণেই মুরসিকে শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়ে তার মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। গাজায় অবৈধ ও অন্যান্য ইসরাইলি অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানোর জন্য ফিলিস্তিনিরা তার কাছে ঋণী। প্রেসিডেন্ট মুরসি মিসরীয় কর্তৃপক্ষকে বিশ্বের সথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য রাফাহ ক্রসিং স্থায়ীভাবে খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মুরসি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ইসলামী অবরোধ শিথিল করা হয় এবং কোনো বাধা ছাড়াই ফিলিস্তিনিরা রাফাহ ক্রসিং দিয়ে যাতায়াতের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পান।
এ ছাড়াও সে সময় গাজা ও মিসরের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। গাজায় বারবার ইসরাইলি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনিরা ২০০৮ সালে হোসনি মোবারক, ২০১২ সালে মুরসি ও ২০১৪ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিসির আসনের তুলনামূলক অবস্থার একটি বর্ণনা দিয়েছেন। ফিলিস্তিনিরা এখনো স্মরণ করেন, ২০০৮ সালে ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপি লিভনি কায়রো সফরের সময় গাজায় যুদ্ধের ঘোষণা দেন এবং সাথে সাথে গাজায় ইসরাইলি হামলায় কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হন। তিন সপ্তাহের ওই যুদ্ধে ও হামলায় মিসর নীরব ভূমিকা পালন করে। ২০১৪ সালে গাজায় যুদ্ধের সময় মিসরের হস্তক্ষেপে যুদ্ধ আরো দীর্ঘ হয় এবং ৫০ দিনেরও বেশি স্থায়ী হয়। সিসি যুদ্ধের মাধ্যমে হামাসকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। আর মুরসি ক্ষমতায় আসার পর গাজায় ইসরাইলি হামলা মাত্র এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনিরা তেলআবিবে হামলা চালায়। বোমা হামলা চলাকালে একটি মিসরীয় প্রতিনিধিদল গাজায় আসে। প্রথমবারের মতো একজন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট ইসরাইলি হামলা প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দেন। এমনকি তিনি ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তি পর্যালোচনা করার ঘোষণা দেন এবং কায়রোর প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রথম সশস্ত্র একটি ফিলিস্তিনি গ্রুপ তাদের বিজয় ঘোষণা করে। এসব কারণে ফিলিস্তিনি হামলা বন্ধ করতে সক্ষম হলেও তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য গোপনে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করে দেয়া হয়েছিল। মুরসির সাথে হামাসের সখ্যতা ছিল। মার্কিন-ইসরাইলিদের কাছে এটা ছিল বিরাট অপরাধ। হামাসের সাথে আঁতাত করে মিসরের নিরাপত্তা বিঘিœত করার কথিত অপরাধেই মুরসির বিচার করা হচ্ছিল।
সত্যিকারের ইতিহাস হচ্ছেÑ ১৯৭২ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন ও ইসরাইলের ক্রীড়নক তথা পুতুল শাসকেরাই মিসরের ক্ষমতায় ছিলেন। কারণ মিসরের ভৌগোলিক অবস্থান ইসরাইলের জন্য কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিসরকে নতজানু রাখতে পারলে গাজাসহ ফিলিস্তিনকে সহজেই দখল করতে পারে ইসরাইল। কিন্তু মুরসি ক্ষমতায় আসায় ইসরাইলের ওই হিসাব পাল্টে যায়। তাই মুরসিকে হটাতে মার্কিন-ইসরাইলি লবি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের সাথে যোগ দেয় সৌদি আরব। সৌদি আরব আরব বসন্তের মাধ্যমে মিসরসহ আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ভীত হয়ে পড়ে। তাদের রাজতান্ত্রিক শাসনের ভিত কেঁপে ওঠে। অজানা আশঙ্কায় ইহুদি-মার্কিন লবির সাথে হাত মেলায়। এখন স্পষ্টভাবে জানা গেছে, মিসরের মিলিটারি ইনটেলিজেন্স মুরসির বিরুদ্ধে বামপন্থী প্রগতিশীল ও নারীবাদী পক্ষকে আন্দোলনে উসকে দেয়। মুরসি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু কুচক্রীমহলের নানামুখী ষড়যন্ত্রে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তাদের হাতেই রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয়েছেন।
মুরসি ছিলেন গণতন্ত্র, সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক। স্বৈরশাসকের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে হাসিমুখে তিনি শাহাদত বরণ করেছেন। মিসরবাসী ও সারা বিশ্বের কাছে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। তার স্মৃতি চিরদিন অম্লান ও শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। মুরসির মৃত্যু মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বড় শিক্ষা।


আরো সংবাদ