২৫ আগস্ট ২০১৯

শান্তি কি আদৌ ফিরবে লিবিয়ায়

-

এক সময় দেশটিতে নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অনেক কিছুর ভারই ছিল সরকারের ওপর। এমনকি দেশের তেল বিক্রির টাকার একটি অংশও প্রত্যেক নাগরিকের অ্যাকাউন্টে চলে যেত বলে জনশ্রুতি ছিল। সে দেশটিতে এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য তো দূরের কথা, প্রাণ বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে।
আরব বসন্ত শুরু হওয়ার আগে জীবনযাপনের মানের দিকে থেকে তেলসমৃদ্ধ লিবিয়া ছিল আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে। কিন্তু ২০১১ সালে পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। সে সময় থেকে শুরু হওয়া সঙ্ঘাতে এখনো পুড়ছে দেশটি। সেই সঙ্ঘাতের জেরে এখনো বিপর্যস্ত দেশটির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিকসহ সার্বিক পরিস্থিতি। গৃহযুদ্ধের আট বছর পরও লিবিয়ানরা বের হতে পারেনি অস্ত্রের ঝনঝনানির ঘূর্ণিপাক থেকে।
কারণ একই সময়ে দেশটি দখলে রাখার দাবি করে আসছে দু-দু’টি সরকার। ২০১৬ সালে জাতিসঙ্ঘ ত্রিপোলিতে গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ড (জিএনএ) নামের একটি সরকার দাঁড় করায়। কিন্তু খলিফা হাফতারের দল লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (এলএনএ) তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোসহ পূর্ব ও দক্ষিণের বেশির ভাগ জায়গায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। গত এপ্রিলে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব দেশটিতে পৌঁছার পর হঠাৎ করেই হামলা করে বসে এলএনএ বাহিনী। বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, আলোচনার মাধ্যমে সঙ্ঘাত নিরসনে তার তেমন কোনো আগ্রহই নেই। ৭৫ বছর বয়সী এ সাবেক জেনারেল মনে করেন, লিবিয়া এখনো গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়, বরং দেশটিতে এখন তার মতো একজন লৌহমানব শাসক দরকার।
গাদ্দাফির পতনের পর হাফতার যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসন শেষ করে লিবিয়া ফিরে আসেন এবং ২০ হাজার যোদ্ধার একটি বাহিনী তৈরি করেন। এসব যোদ্ধা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা রাজধানী থেকে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা দূর করবে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে জিনএনএ’র কর্তৃত্ব থাকলেও পূর্ব ও দক্ষিণের বেশির ভাগ অঞ্চল চলে গিয়েছিল হাফতার বাহিনী এলএনএ’র দখলে।
মূলত মিত্রদের প্রভাবেই হাফতার বাহিনী এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। হাফতারের সমর্থক শক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ, যারা অস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছে। দেশগুলো লিবিয়াতে হাফতারকেই তাদের মূল মিত্র হিসেবে ধরে নিয়েছে। তুরস্ক, কাতারের মতো দেশগুলো যাতে লিবিয়ার তেল, বন্দর প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আধিপত্য বিস্তার করার সুযোগ না পায় সে জন্যই তারা হাফতারকে এভাবে সাহায্য-সহায়তা করে যাচ্ছে।
জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরাও নিজ নিজ স্বার্থে লিবিয়ায় একেক পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। লিবিয়ার সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্স ও ইতালি নিজেদের তেলস্বার্থ রক্ষার্থে বিরোধীদের সমর্থন দিচ্ছে। কারণ ফ্রান্সের কোম্পানি টোটালের অধিকাংশ গ্যাস ক্ষেত্রের অবস্থান লিবিয়ার পূর্বাংশে। আর ইতালির তেল কোম্পানি ইনির স্বার্থ রয়েছে দেশটির পশ্চিমাংশে থাকা গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে। ফলে তাদের সমর্থন হাফতারের দিকেই ঝুঁকছে। আর রাশিয়া এ অঞ্চলে বরাবরই একনায়কদের পক্ষে, ফলে স্বভাবতই পুতিনের সমর্থন হাফতারের সাথে।
এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার ব্যাপারে শুরু থেকে একটু পেছনে থেকে দেখতে পছন্দ করত। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এ অবস্থানটি পরিবর্তন করছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক এক সাফল্যের পর হাফতারকে ফোনে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
এ দিকে তুরস্ক ও কাতার ত্রিপোলির সরকারকে শক্তিশালী করতে অস্ত্রশস্ত্রসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, তারা লিবিয়ায় গণতন্ত্র ও জনগণের সরকার দেখতে চায়। এদিকে লিবিয়াকে ঘিরে অন্য দেশগুলোর এ হস্তক্ষেপের ফলে দেশটিতে আবারো গৃহযুদ্ধের শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
তবে আশার কথা হচ্ছে, এত কিছুর পর দেশটির মুদ্রা স্থিতিশীল রয়েছে। দেশটির তেল উৎপাদন ২০১১ সালের আগের অবস্থানে পৌঁছে যায়। বর্তমানে সেখানে দৈনিক ১১ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হচ্ছে। ফলে এ খাতে লিবিয়া এ বছরে ২৭০০ কোটি ডলার আয় করেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, লিবিয়ার বিবদমান পক্ষগুলো যতই লড়াই করুক না কেন, তেলক্ষেত্রগুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে তারা কড়া নজর রাখে। কারণ এ তেল বিক্রির আয় থেকেই বাহিনীগুলো নিজেদের সব খরচ মিটিয়ে থাকে।
হাফতার আশা করেছিলেন, ২০১৭ সালে তিনি লিবিয়ার দ্বিতীয় প্রধান শহর বেনগাজি যেভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন, মিত্র শক্তিগুলোর সাহায্যে তিনি সেভাবেই পুরো লিবিয়া করায়ত্ত করবেন। কিন্তু বেনগাজিতে তিনি ধ্বংসের যে মহড়া দেখিয়েছিলেন, তাতে স্থানীয় লোকজন এখন হাফতার বাহিনীর নামে আঁতকে উঠছে। যখন তারা ঘারইয়ানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তখন তারা ত্রিপোলিতে ব্যাপক হামলা চালায়। এরই মধ্যে তারা একটি বিমানবন্দর ধ্বংস করে ফেলেছে, আরেকটি ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছে। গত ৩ জুলাই তারা একটি অভিবাসী আটক কেন্দ্রে হামলা চালালে তাতে ৪৪ আফ্রিকান অভিবাসী নিহত হয়। এ অবস্থায় ত্রিপোলি থেকে এক লাখের বেশি মানুষ পালিয়ে গেছে।
জাতিসঙ্ঘ মনোনীত সরকারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে লিবিয়ানদের অনেকে হাফতার বাহিনীর মতো কাউকে আশা করছিল। কিন্তু এ বাহিনীর নৃশংতায় এখন তারা ভীত হয়ে পড়েছে। তারা আশঙ্কা করছে হাফতার বাহিনী যদি কোনোভাবে পুরো লিবিয়ার ক্ষমতা নিয়ে নেয়, তাহলে হয়তোবা দ্বিতীয় আরেক গাদ্দাফির হাতে পড়তে হবে। ফলে তারা এখন বলছে, আমরা এদের কাউকে চাই না, তারা সবাই চলে যাক এ দেশ থেকে।
সব মিলিয়ে দেশটির নাগরিকেরা বুঝে উঠতে পারছেন না, কোন পথে আসবে লিবিয়ার শান্তি, কোন পথে আসবে দেশের স্থিতিশীলতা। নাকি গৃহযুদ্ধের জের টানতে হবে আরো দীর্ঘ সময়।

 

 


আরো সংবাদ