১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কাশ্মির সঙ্কট : ভবিষ্যৎ আরো অন্ধকারে

-


যে কয়টি ইস্যুতে দীর্ঘ দিন ধরে মুসলিমবিশ্ব সঙ্কটের মধ্যে আছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারত অধিকৃত কাশ্মির। ফিলিস্তিন, চীনের জিনজিয়াংয়ের মতো কাশ্মিরের সমস্যাটিও অনেক দশকের পুরনো। টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার এ মাসের প্রথম সপ্তাহে কাশ্মিরের ব্যাপারে যে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে এ সমস্যাটি আরো অনেক গভীর হয়ে গেছে।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে দেশটির সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করেছে, যা একসময় মুসলিম অধ্যুষিত ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল। দিয়েছিল স্বশাসনের অধিকার। এ অনুচ্ছেদের সুবাদেই ভারতশাসিত কাশ্মির নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতাও পেয়েছিল। এমনকি সেখানে সরকারি চাকরি, জমি কেনা, ব্যবসা করার অধিকার কেবল কাশ্মিরিদেরই ছিল। কিন্তু অনুচ্ছেদটি বাতিলের ফলে আলাদা সংবিধান ও পতাকা হারানোর পাশাপাশি কাশ্মিরিরা সরকারি চাকরি, জমি কেনা ও ব্যবসা করার ক্ষেত্রে একক অধিকারও হারিয়েছে।
ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় এ বিশেষ সুবিধার বিষয়টি শর্ত হিসেবে ধরেই তখনকার কাশ্মিরের শাসকরা ভারতে যোগ দিতে সায় দেয়। অনুচ্ছেদটি বাতিল হওয়ায় জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখ এখন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
কাশ্মিরিরা সরকারের এ পদক্ষেপকে তাদের জনমিতির ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে। তাদের আশঙ্কা, যদি কাশ্মিরে অকাশ্মিরিদের আসার এবং ব্যবসা করার অনুমতি দেয়া হয়, তবে শিগগিরই এটি মুসলিম সংখ্যালঘু অঞ্চলে পরিণত হবে।
কাশ্মিরের বিষয়ে ঘোষণাটি আগস্টের ৫ তারিখে এলেও এটি ছিল বিজেপির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। নির্বাচনের প্রচারণায় তারা এ বিষয়টি বারবার তুলে এনেছিল। তাই নির্বাচনে ব্যাপক বিজয় লাভের পর এ বিষয়ে খুব বেশি দেরি করেনি ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহজুড়ে তারা কাশ্মিরকে ঘিরে যে রকম তোড়জোড় শুরু করেছিল, তাতেই আঁচ করা গিয়েছিল কাশ্মিরে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। সামরিক-আধা সামরিক বাহিনী দিয়ে পুরো কাশ্মিরকে এভাবে ঘিরে ফেলা হয় যে, গড়ে প্রতি ১০-১২ জন কাশ্মিরির জন্য নিরাপত্তাবাহিনীর একেকজন সদস্য নিয়োজিত থাকে। এভাবে পুরো জম্মু-কাশ্মিরকে অবরুদ্ধ করেই বিজেপি সরকার সেই ঘোষণাটি দেয়। এর আগে থেকেই যেমনিভাবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল, তেমনিভাবে গণহারে গ্রেফতার করা হচ্ছিল স্বাধীনতাকামী লোকজনকে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এর পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে প্রায় এক মাস আগেই সেখানকার কারাগার প্রস্তুত করে রাখে। ওই কারাগারে পিটিজেড (প্যান-টিল্ট-জুম) সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়, যেগুলো রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে দূর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এভাবে পুরো পরিস্থিতি আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করায় কাশ্মিরিদের পক্ষ থেকে যে বিস্ফোরণের আশঙ্কা ছিল, তা পুরোপুরি নিজেদের আয়ত্তে রাখতে সক্ষম হয় বিজেপি সরকার। তবে তাই বলে গণবিস্ফোরণের সম্ভাবনা যে একেবারেই শেষ হয়ে গেছে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ এ কাশ্মিরিদের দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে প্রবল চাপে রেখেও কখনো নিজেদের আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়নি ভারতের কোনো সরকারই। এখন তাদের অধিকার আরো খর্ব করে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, এমনটি ভাবা মোদি সরকারের জন্য বোকামিই হবে।
এদিকে কাশ্মির নিয়ে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫ ধারা বাতিল করায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পুরো ভারত। এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির ৯টি রাজ্যে ভাঙনের সুর দেখা দিয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে রাজ্যগুলোর নাগরিকেরা। ভারতের সংবিধানের ৩৬৮ ধারার ভিত্তিতে ৩৭১ নম্বর ধারায় ৯টি রাজ্যকে বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা ও অধিকার দেয়া হয়েছে। ওই রাজ্যগুলোর তালিকায় মহারাষ্ট্র, গুজরাট, আসাম, মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল ও অন্ধ্রপ্রদেশও রয়েছে। মিজোরামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা লালথানহাওলা বলেছেন, এ ঘটনা মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশের মতো রাজ্যের পক্ষে আতঙ্কের।
আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে পাকিস্তান। তারা ভারতের সাথে বাণিজ্য, যোগাযোগ, কূটনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন। ৯ আগস্ট চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, কাশ্মির প্রশ্নে পাকিস্তানের ‘বৈধ অধিকার ও স্বার্থের’ প্রতি চীন তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে। কারণ চীন মনে করে, কাশ্মির বিষয়ে একপক্ষীয় পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। ভারত ও পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক বিদ্বেষ কাটিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান জানায় তারা।
তবে এ ইস্যুতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করার কথা ছিল যে সংস্থার, সেই জাতিসঙ্ঘ কেবল বিবৃতি প্রদান ও উদ্বেগ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের দায়িত্ব সেরেছে। সংস্থাটি বলেছে, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নসহ যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, সেসবে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জম্মু ও কাশ্মিরের ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ পরিস্থিতি আরো বাড়িয়ে তুলবে।
এ দিকে দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কাশ্মিরের সার্বিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ভারতীয় আধা সামরিকবাহিনী ২৪ ঘণ্টা টহল দিচ্ছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন পরিষেবা আগের মতোই স্থগিত রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হচ্ছে, সেখানকার ফোনে ইনকামিং সুবিধা খুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অবরুদ্ধ কাশ্মিরে এ দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। সেখানকার কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হলেও তাতে জনগণের চলাচলে কোনো ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি। স্কুল-কলেজ খোলার ঘোষণা দেয়ার পর তাতে সাড়া পাওয়া যায়নি কাশ্মিরি শিশুদের পক্ষ থেকেও।
তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই গণ্য করতে চান। গত ৮ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং ৩৫এ ধারা জম্মু-কাশ্মিরে সন্ত্রাসবাদ, পরিবারবাদ ছাড়া আর কিছু হয়নি। এতে কোনো মানুষের লাভ হয়নি। জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখের উন্নয়ন হয়নি। নতুন যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখের মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। তারা এখন দেশের অন্যান্য মানুষের মতোই সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারতসহ বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই মোদির এ কথায় আস্থা রাখতে পারেননি। বরং তারা এর উল্টোটাই বিশ্বাস করেন। কারণ কাউকে সুবিধা দেয়ার জন্য নিশ্চয়ই এত অবরোধ, ঘেরাওয়ের দরকার পড়ে না।

 


আরো সংবাদ