২০ নভেম্বর ২০১৯

বিশ্ববাসীকে হতাশ করল জি-৭

-

বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো নিয়ে গঠিত সংস্থাÑ দ্য গ্রুপ অব সেভেন (জি-৭)। জি-৭ এর দেশগুলো হলোÑ কানাডা, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এ সাতটি দেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর সাতটি সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী দেশ। যারা পৃথিবীর নিট সম্পদের প্রায় ৬০ শতাংশের মালিক। ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু হওয়া জি-৭ এর শীর্ষ সম্মেলনে বছরে একবার বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের ও বিশ্বের প্রধান সমস্যাদি আলোচনা করে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জি-৭ এর শীর্ষ সম্মেলনে ১৯৭৭ থেকে অংশগ্রহণ করে আসছে। ১৯৯৮ সালে রাশিয়া এই সম্মেলনে পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগ দেয়। কিন্তু ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখল করার পর রাশিয়া জি-৭ এর গোষ্ঠী থেকে বহিষ্কৃত হয়।
এবারের ৪৫তম সম্মেলনে বিশ্ব নেতারা ২৪-২৬ আগস্ট ফ্রান্সের দ্বীপ শহর বিয়ারিটজে বসেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিরোধ, ব্রেক্সিট, জলবায়ু সঙ্কট, আমাজনের আগুন, এমন সব নানা উত্তপ্ত বিষয় ও বিক্ষোভের মধ্যেই বৈঠক বসেছিলেন বিশ্ব নেতারা। এত মতভিন্নতা নিয়ে কখনোই শীর্ষ সম্মেলনে বসেনি জি-৭ দেশগুলো। আর ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবারই প্রথম বিশ্বনেতাদের পক্ষে যৌথ কোনো বিবৃতি দেয়া ছাড়াই এবারের সম্মেলন শেষ করতে হয়েছে।
এদিকে সম্মেলনের শুরু থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে উত্তেজনা চলে আসছিল। বিমানে ওঠার আগেই ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধের হুমকি দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প। এ ছাড়া ইইউর সাথে ব্রেক্সিট নিয়েও সমাধানে আসতে পারেনি যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।
এ ছাড়া ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের আকস্মিক উপস্থিতিতে নতুন মোড় নেয় সম্মেলন। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, তেহরানের সাথে পশ্চিমাদের পরমাণু চুক্তি ভেঙে যাওয়া এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউরোপের করণীয় নিয়ে সম্মেলনের ফাঁকে বিশ্বনেতাদের সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে সম্মেলনে উপস্থিত হন জাভেদ জারিফ। জি-৭ সম্মেলনে জারিফের এ ‘আকস্মিক’ উপস্থিতি ইরানের পরমাণু চুক্তি রক্ষা বিষয়ক আলোচনায় নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে।
ফ্রান্স জানায়, ইরান প্রশ্নে প্রধান করণীয়গুলো নিয়ে একমত হয়েছেন বিশ্ব নেতারা। যদিও যুক্তরাষ্ট্র জানায়, এ ব্যাপারে তাদের করণীয় তারাই নির্ধারণ করবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে, এটি নিশ্চিত করার ব্যাপারে কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে।
জি-৭ গ্রুপে আবার রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে প্রস্তাব তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ইউরোপ ও কানাডা এ ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখায়। আপত্তি হিসেবে তারা ‘অবৈধভাবে’ রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের বিষয়টি সামনে আনে। ২০১৫ সালে এ কারণেই জি-৭ থেকে বহিষ্কৃত হয় রাশিয়া।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ চরম রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য সঙ্কটকেই পৃথিবীজুড়ে চলতে থাকা অর্থনৈতিক ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাণিজ্যযুদ্ধ ও জলবায়ু নিয়ে আলোচনায় ট্রাম্পের সাথে মতবিরোধ দেখা দেয় বাকিদের। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক ইরান, চীন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের ওপর বাণিজ্যকর, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই চলেছেন। এ ব্যাপারে তারা কোনো লাগাম টানার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
জলবায়ু প্রশ্নেও বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির ব্যাপারটিকে তিনি তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না বলে নানা সময়ে বলেছেন। ফলে এ ব্যাপারে তার দিক থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপের সম্ভাবনাও দেখা যায়নি। এ ছাড়া ফেসবুক, গুগলের মতো ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে করারোপ করার ব্যাপারে ফ্রান্সের প্রস্তাব থাকলেও ট্রাম্পের দেশ সে ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে আমাজনে দাবানল ইস্যুসহ দু-একটি ব্যাপারে কর্মপন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একমত হতে দেখা যায় বিশ্ব নেতাদের। জি-৭ গ্রুপ পৃথিবীর ‘ফুসফুস’খ্যাত আমাজনে চলমান দাবানল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জোয়ার বোলসোনারোকে সহায়তার আশ্বাস দেন বিশ্ব নেতারা। সেখানে আবার বৃক্ষরোপণেও তারা সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে জানান।
এ সম্মেলনের সময়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাম্প্রতিক কাশ্মিরের গোলযোগ বিষয়ে আলোচনাক্রমে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত করার কথা বলেন। অন্য দিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সাথে আরেকটি আলোচনায় ট্রাম্প ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তরাজ্যের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া বৈষম্য, বিশেষ করে লিঙ্গ বৈষম্য, জি-৭ ও আফ্রিকার যৌথ অংশীদারিত্ব, জীববৈচিত্র্য ও ডিজিটাল মাধ্যমের মুক্ত, অবাধ ও নিরাপদ রূপান্তরের বিষয়েও একমত হন তারা।
তবে, জি-৭ দেশগুলোর স্বার্থানুকূলে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সম্মেলন স্থলের আশপাশে কয়েকটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তাদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য ফরাসি সরকার এ সম্মেলন স্থানে ১৩ হাজার পুলিশ মোতায়েন করে বলে জানা গেছে। তারপরও প্রতিবাদকারীরা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তব্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন।

 


আরো সংবাদ