১৫ নভেম্বর ২০১৯

তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনা বাতিলের নেপথ্যে

-

মনে হচ্ছিল ২০১৯ সাল হবে আফগানিস্তানে পরিবর্তনের বছর। ১৮ বছরের যুদ্ধ অবসানে কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের কমপক্ষে ৯ দফা আলোচনার পর যখন দু পক্ষ একটি শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ করে সেই আলোচনা বাতিল ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ জন্য তিনি যে অজুহাত দাঁড় করেছেন, সেটিকে হাস্যকর বলে আখ্যায়িত করেছে তালেবান। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আলোচনার দরজা খোলা বলে ঘোষণা করেছে তারা।
ট্রাম্পের এই হঠাৎ পিছুটানের কারণ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনা ট্রাম্প একসময় বাতিল করতে পারেন বলে আগে থেকেই সাবধান করে আসছিলেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। তারা বলে আসছিলেন, এই শান্তি আলোচনা একটি নাটক। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ করতে এবং সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে চায় না। আসল উদ্দেশ্য সময়ক্ষেপণ, আইএসকে শিকড় মজবুত করার সুযোগ করে দেয়া এবং আফগান তালেবানকে বাধ্য করা, তারা যেন কাবুল সরকারের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে, আফগানিস্তানে যেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি সীমিতপর্যায়ে হলেও বহাল তবিয়তে থাকে ইত্যাদি। তালেবান যে এসব দাবি মানবে না, তা মার্কিন কর্তৃপক্ষও জানত। তেমনি তালেবান নেতারাও প্রথম থেকেই জানতেন যুক্তরাষ্ট্রের এই শান্তি আলোচনার আড়ালে উদ্দেশ্য কী। তবুও তারা এই আলোচনার টেবিলে বসেছিলেন এ জন্য যে, যুক্তরাষ্ট্র যেন বিশ^কে এই বলে বিভ্রান্ত করতে না পারে, তালেবান কিছুতেই শান্তির পক্ষে নয়। এ জন্যই তারা দোহায় শান্তি আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্রের সেই উদ্দেশ্য বানচাল করে দিতে চেয়েছেন। আলোচনার এই নাটকের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বড় একটি উদ্দেশ্য হাসিল করা হলো না। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল আফগান তালেবানের ওপর পাকিস্তানের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের শর্তাবলির সামনে মাথানত করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র হিসাবে ভুল করেছে। আফগান তালেবানের ওপর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিকেই যারা তোয়াক্কা করছে না, তারা পাকিস্তানকে খাতির করবে কেন? ডোনাল্ড ট্রাম্প যেদিন তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনা বাতিল ঘোষণা করলেন, ঠিক সেদিন ইসলামাবাদে চীন-পাকিস্তান-আফগানিস্তান তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক চলছিল। ওই বৈঠকে শান্তি আলোচনার সফলতার পর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনার তৃতীয় দিনে চীন-পাকিস্তান জোটে আফগানিস্তানকে যুক্ত করে নেয়ার পরিকল্পনা পেশ করে চীন। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ঝি ঘোষণা করেছিলেন, আফগান শান্তি আলোচনা সফল হলে আফগান সীমান্তে কোল্ড স্টোরেজ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, চিকিসা কেন্দ্র ও ইমিগ্রেশন কেন্দ্র স্থাপনে পাকিস্তানকে সহায়তা দেবে চীন। আলোচনা সফল হলে এই কার্যক্রম জোরদার ও দ্রুতগতিতে করার পরিকল্পনা পেশ করা হয়। পাকিস্তানের সূত্রগুলো জানায়, তিন দেশই তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনা সফল হলে আক্টোবর থেকেই কূটনীতিকদের প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাস দমন, মাদক চোরাচালান দমন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পরস্পরকে সহযোগিতার আশ^াস দেয়। চীন চেয়েছিল চীন-পাকিস্তান জোটে আফগানিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করতে। চীন-পাকিস্তান জোটের কারণে গোয়াদর বন্দরের মাধ্যমে বিশে^র অন্যান্য অঞ্চলের সাথে চীন ও পাকিস্তানের বাণিজ্য জোরদারের সুযোগ হবে। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ আফগানিস্তান এতে শামিল হলে আফগান ভূখণ্ডের মাধ্যমে মধ্য এশিয়া এবং রাশিয়া হয়ে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সাথে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদারের আরো সুযোগ সৃষ্টি হবে। আশরাফ গনির সরকারের সাথেও তালেবানের শান্তি আলোচনার সমর্থক চীন। কেননা আফগানিস্তানে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টির অর্থ গোটা পূর্ব এশিয়ায় শান্তির সুবাতাস প্রবাহের ব্যবস্থা হওয়া এবং এর মাধ্যমে গোটা অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হওয়া। এমন সুযোগ সৃষ্টি হতে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন ও অর্থনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে চলা জায়নবাদী চক্র কিছুতেই চায় না এ অঞ্চলে শান্তির পরিবেশ গড়ে উঠুক, আর তাতে চীন-পাকিস্তান উপকৃত হোক। মনে রাখতে হবে, আফগান যুদ্ধ ও আনুষাঙ্গিক কায়কারবার থেকে মার্কিন ইহুদি চক্র বছরে প্রায় আট হাজার কোটি ডলার মুনাফা করে। এই অর্থ আসে মার্কিন জনগণের পকেট থেকে ওয়ার ট্যাক্স বা যুদ্ধ করের নামে। আর তার পুরোটা যায় ইহুদি চক্রের পকেটে। তাদের পক্ষে ট্রাম্পকে আফগান যুদ্ধ অবসানের অনুমতি দেয়া কিভাবে সম্ভব হতে পারে? তাই তারা ট্রাম্পকে এ যুদ্ধাবসানের কর্তৃত্ব দেয়নি। সিআইএ ও পেন্টাগন অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি চক্রের দুই প্রধান স্তম্ভ আফগানিস্তানে ভয়াবহ খেলা খেলছে। একদিকে প্রচার করা হচ্ছে আফগানিস্তানে আইএসের তৎপরতা বেড়েছে এবং তারা ইরাক ও সিরিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে আফগানিস্তানকে ঘাঁটি বানাচ্ছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে ব্যাপক ব্যয় হচ্ছে, এ জন্য খবর পাওয়া গেছে, কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ব্ল্যাক ওয়াটারের মালিক এরিক প্রিন্স মার্কিন সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছেন, আফগান যুদ্ধকে তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হোক। এতে মার্কিন সরকারের ব্যয়ের বোঝা লাঘব হবে। নিকট অতীতের ঘটনাবলি থেকে অনুমান করা যায়, ব্ল্যাক ওয়াটারের কর্মীরাই ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের নামে সব তৎপরতা চালিয়েছে। এখন আফগানিস্তানে তাদের যে ছবি ও প্রশিক্ষণের ধরন প্রকাশ পাচ্ছে, তা থেকে আরো স্পষ্ট হচ্ছে, এরা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী। তাদেরকে বিশেষ উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফগানিস্তানে আনা হয়েছে এখানকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগঠনগুলোকে তাদের মাধ্যমে নির্মূল করার জন্য। আফগানিস্তানের আইএস সম্পর্কে যেসব খবর ও ছবি পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায় তারা কমান্ডোদের মতো উর্দি পরে এবং মাথা ও চেহারা ঢেকে রাখে। তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক সাঁজোয়া যান, যেগুলোকে সরকারি সামরিক যানের মতো ক্যামোফ্লেজ করা হয়। এ থেকে অনুমান করা কঠিন নয় যে, ব্ল্যাক ওয়াটারের কর্মীদের মাধ্যমে আইএসের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করছে বিশ^ ইহুদি চক্রের মার্কিন শাখা। ইহুদি চক্র নিজেদের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতেও পিছপা হবে না। আফগানিস্তান অবস্থারত ১৪ হাজার সৈন্যেরই কফিন দেশে ফিরলেও আরো সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া তাদের কাছে মামুলি ব্যাপার। অতীতে কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও সোমালিয়ায় সামরিক বিপর্যয়ের পর যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে মার্কিন জনগণ রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু এখন ইহুদি প্রভাবিত করপোরেটেড মিডিয়ার মাধ্যমে মার্কিন জনগণের মগজ ধোলাই করা হয়েছে। তারা এখন সেই পদক্ষেপ নেবে না। তবুও অশুভ মহলের মনে রাখা উচিত ইরাক-সিরিয়ার সাথে আফগানিস্তানকে আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে এক করে দেখা সঠিক হবে না। শুধু ভৌগোলিকভাবেই ভিন্নতা নয়, এখানকার পরিবেশ ও জনগণের মনোভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। আফগানিস্তানের চারপাশে বসবাসকারী মুসলিমরা অনেক সচেতন। তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে শুধু নাস্তানাবুদ করেনি, টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। মার্কিন-ইসরাইলি চক্রকেও কিছুতেই অশুভ উদ্দেশ্য সফল হতে দেবে না তারা।


আরো সংবাদ