০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

তেল স্থাপনায় হামলা ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি

-

সম্প্রতি সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনার ওপর হামলা চালানো হয়। এ হামলার প্রভাব গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। দুটি তেল স্থাপনার হামলা চালানোর পর সৌদি আরবের তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। আর বিশ্ব বাজারে তেলে মূল্য বেড়ে যায়।
নাটকীয় এ হামলার দ্বায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের হুতি গ্রুপ। কিন্তু সৌদি আরবসহ পশ্চিমা বিশ্বের দাবি এ হামলায় ইরান সরাসরি জড়িত। তেল ক্ষেত্রে কে হামলা চালিয়েছে এ নিয়ে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরানের সাথে সৌদি আরবের দ্বন্দ্ব এখন এ অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এমনিতেই অস্থিতিশীল। সেখানে এই সর্বশেষ ঘটনা যেন পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি আরো অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে। সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার ব্যাপারে নানা দাবি এবং পাল্টা দাবির মধ্যে অনেক তথ্য এখনো অজানা।
হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন টার্গেটে আগেও ড্রোন এবং মিসাইল হামলা চালিয়েছে। কিন্তু ড্রোন হামলা থেকে তারা খুব সীমিত সাফল্যই পেয়েছে। তবে এবারের যে হামলা সেটা এমন মাত্রার যে তার সাথে আগেরগুলোর কোনো তুলনাই চলে না। বহুদূর থেকে যেরকম ব্যাপক মাত্রায় যে ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করা হয়েছে, তার নজির নেই।
সৌদি আরবের যে দুটি তেলস্থাপনায় হামলা হয়েছে তা গোটা বিশ্বের তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো যে কতটা নাজুক অবস্থায় আছে, এ হামলা সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ইয়েমেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি আরব, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের মদদ আছে। সৌদি আরবের এসব বিমান সরবরাহ করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। কিন্তু প্রতিপক্ষ যে পাল্টা হামলার ক্ষমতা রাখে, সৌদি তেল স্থাপনার ওপর এই আঘাত তারই প্রমাণ।
সৌদি আরব পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল রফতানিকারক। প্রতিদিন তারা ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল রফতানি করে। সৌদি আরবের দুটি তেল ক্ষেত্রে হামলার পর বিশ্বে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ৫ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে গোটা বিশ্বে এর প্রভাব পড়বে। আর তাই এই হামলার বিষয়ে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে তা সবার কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, সৌদি আরবের তেল স্থাপনার বিরুদ্ধে হুতি বিদ্রোহীদের যত হামলা, তার সবকটিতে ইরানের হাতের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ ব্যাপারে তারা কী করবে বা কী করার ক্ষমতা রাখে? ট্রাম্প প্রশাসন যদিও সৌদি আরবের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন জোগাচ্ছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কথা বলছে, বাস্তবে তেহরানের কাছে তারা কিন্তু নানা ধরনের বার্তা দিচ্ছে।
একদিকে মনে হচ্ছে ট্রাম্প যেন ইরানের প্রেসিডেন্টের সাথে একটা মুখোমুখি বৈঠকে বসতে চান। তেহরান ভালো জানে, ট্রাম্প মুখে যত কথাই বলুন, আসলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে চান না, বরং যুদ্ধ থেকে বের করে আনতে চান। এর ফলে ইরানই বরং এখন পাল্টা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে।
পশ্চিমা বক বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র কী করতে চাইছে এখনো বলা যাচ্ছে না। ট্রাম্প নির্বাচনে আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈন্য প্রত্যাহরের। আবার যুদ্ধবাজ নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে সরানোর ফলে অনেকটা বোঝা যায় ট্রাম্প নতুন করে কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছেন না। অন্যদিকে আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত। এর মধ্যেই ট্রাম্প নিজেকে নতুন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে আবিষ্কার করতে চাইবে না।
তবুও আবাকাক ও খুরাইস তেলক্ষেত্রে ওপর হামলায় যদি ইরান সত্যিই দায়ী থাকে তবে এটা চরম উসকানিমূলক ঘটনা। ইরান হয়তো দেখাতে চাইছে এমন ঘটনায় সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের এই মুহূর্তে কিছুই করার নেই। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এমন সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে শুধু সৌদি আরব ও ইরানের স্বার্থ জড়িত নয়। এখানে রয়েছে নানা পক্ষের নানা স্বার্থের দ্বন্দ্ব। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের স্বার্থ জড়িত ইরানের সাথে। আর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও পশ্চিমাদেশগুলোর সাথে সৌদি আরবের স্বার্থ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান বা সৌদি আরব দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হবে বিষয়টা এমন নয়। এখানে কোনো ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে এর ভয়াবহ প্রভাবে জ্বলে উঠবে সারা বিশ্ব।

 


আরো সংবাদ