০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

মালয়েশিয়ার তরুণ প্রজন্মে চাকরি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয়

-


মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কাছে সানওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে বাজিং প্লাজায় বসে অনলাইন জব প্লাটফর্মের প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেক প্রতিনিধি একযোগে যুবকদের সিভি সম্পর্কে বন্ধুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুবকদের কাছে যে নথি রয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। তাদের পড়াশোনা করে আরো দক্ষ হওয়া দরকার। দরকার কারিগরি দক্ষতা, ইংরেজিতে পারদর্শিতা। এ জন্য যুবকদের বুঝাচ্ছিলেন নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিরা।
মালয়েশিয়ান যুবকদের এ জাতীয় পরামর্শের প্রয়োজন। কারণ দেশটিতে সামগ্রিক বেকারত্বের হার প্রায় ৩ শতাংশ। তবে ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এটি ১০ শতাংশেরও বেশি। দেশটির তরুণরা প্রায়ই কোনো কাজের সন্ধানে স্থান পরিবর্তন করছেন।
অপেক্ষাকৃত নিদ্রাহীন এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই রাষ্ট্রের এক তরুণ রাজনীতিবিদ হাওয়ার্ড লি আক্ষেপ করছিলেন, ‘আমাদের এক নম্বর রফতানি পামঅয়েল বা ভাত নয়। এটি প্রতিভা। সম্ভবত মালয়েশিয়ার পল্লীর অর্ধেক যুবক বড় শহরগুলোতে যাচ্ছে, তাদের মেধা ও দক্ষতা বাড়াতে। কিন্তু তাদের জন্য সরকারি চাকরির গ্যারান্টি নেই। এমনকি যারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হচ্ছে, তাদের প্রায়ই কাজের অভাবে বেকার থাকতে হয়।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তৃতীয় স্তরের দক্ষতাসম্পন্ন এক লাখ ৭৩ হাজার যুবক চাকরিতে প্রবেশ করেছে। তবে একই সময়ে ৯৯ হাজারেরও কম উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন চাকরি তৈরি হয়েছিল। কুয়ালালামপুরের টেলিমার্কেট সংস্থার বিক্রয় প্রতিনিধি, যিনি পেরাক থেকে সেখানে এসেছিলেন, অভিযোগ করেন, সপ্তাহান্তে রাইড হেলিং প্লাটফর্মের জন্য তাকে চালক হিসেবে কাজ করতে হয়েছে। যেটি তার করার কথা ছিল না।
তরুণ মালয়েশিয়ানদের জন্য একটি সুসংবাদ হলোÑ তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ছে। গত জুলাইয়ে সরকার ভোটার হওয়ার বয়স ২১ থেকে ১৮ এর মধ্যে নামিয়ে এনেছে। মালয়েশিয়ার জনসংখ্যার তারুণ্য এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে একই সাথে হয় না। পাঁচ বছর পর সেখানে নির্বাচন হয়। অনেকেরই প্রথমবারের মতো ভোট দিতে ২৫ বছর পার হয়ে যায়। দেশটিতে পরবর্তী নির্বাচন হবে ২০২৩ সালে। এ সময় প্রায় ৮০ লাখ লোক প্রথমবারের জন্য ভোট দিতে পারবে। গত নির্বাচনে দেশটিতে মাত্র এক কোটি ৫০ লাখ ভোটার ছিল। সুতরাং আগামী নির্বাচনে ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হবে নতুন। রাজনৈতিক সাফল্যের জন্য তাদের রাজনৈতিক বিষয়গুলো বোঝা অপরিহার্য হবে।
এক কিশোর জানায়, তরুণরা রাজনীতিতে কৌতুক খুঁজে পান। রাজনীতিকে গুরুত্বসহকারে নেয়া হয় না। এর পরিবর্তন হওয়া দরকার। গত বছর মার্দেকা সেন্টারে নির্বাচনের পর একটি সংগঠনের জরিপে ওই কিশোর এ মতামত তুলে ধরে। জরিপে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ মনে করে, দেশ সঠিক পথে চলছে। তবে ৯৯ শতাংশ পাকাতান হারাপানের (পিএইচ) যে জোট ক্ষমতায় রয়েছে, তাদের বিজয় নিয়ে সন্তুষ্ট।
যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী সাদিক আবদুুল রহমান বলেছেন, সরকার তরুণদের দক্ষতা বাড়াতে এবং চাকরি ও রাজনৈতিক উদ্বেগ মেটাতে চেষ্টা করছে। তিনি ইন্টার্নদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০০ রিঙ্গিত থেকে ৯০০ রিঙ্গিত বাড়িয়ে তোলার এবং তরুণদের পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সহজ করার জন্য জোরও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যদি তরুণদের মৌলিক চাহিদা জোগান দিতে ব্যর্থ হই, তবে সেখানে একটি শূন্যস্থান তৈরি হবে। এই শূন্যস্থান অযোগ্য লোকদের দিয়েই পূর্ণ হবে।’
এটা বেশ সম্ভব। মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে বহু আগে থেকেই জাতিগত বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির তিনটি প্রধান নৃগোষ্ঠীÑ মালয়েশিয়ান, চীনা এবং ভারতীয়রা এমন দলগুলোর পক্ষে ভোট দেয়; যা তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে বলে তারা দাবি করে। একজন শিক্ষার্থী ব্যাখ্যা করেন, এই বিভাজন প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে আরো সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অবশ্যই বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন জোটের মতো নৃতাত্ত্বিক বিভাজন সৃষ্টি করেনি এমনটা মনে করায় যুবকদের আকর্ষণ করেছে।
দেশটিতে তরুণ ভোটারদের নেতৃত্বে সোচ্চার প্রচারণা রয়েছে। নারীর বৃহত্তর অধিকার এবং বৃহত্তর যৌন স্বাধীনতার পক্ষেও প্রচারণা রয়েছে। এসব বিষয় ধর্মীয় এবং জাতিগত রাজনীতির বিরুদ্ধে। তবে জীবিকা নির্বাহের বিষয়ে উদ্বেগের তুলনায় এ ধরনের উদ্বেগগুলো ফ্যাকাশে বলে মনে হচ্ছে। তারপরও অর্থনৈতিক উদ্বেগ রাজনীতিতে চলে আসে, তাহলে একটি নাটকীয় পরিবর্তন হতে পারে।

 


আরো সংবাদ