২৩ নভেম্বর ২০১৯

গণতন্ত্রের পথে তিউনিসিয়ার সফল অভিযাত্রা

-

আরব বসন্তের সুফলপ্রাপ্ত নিউনিসিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী হয়েছেন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক কায়েস সাইদ। বুথফেরত জরিপের ফলাফল থেকে এ খবর পাওয়া গেছে। জরিপের ফলে দেখা যায় কায়েস সাইদ ৭২ থেকে ৭৭ শতাংশ ভোট পেতে যাচ্ছেন। আর তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী মিডিয়াব্যক্তিত্ব নাবিল কারুই পাবেন ২৩ থেকে ২৭ শতাংশ ভোট। জরিপের ফলাফল প্রকাশের পরই কায়েস সাইদের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে উল্লাস প্রকাশ করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নাবিল কারুই পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে কায়েস সাইদকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।
দেশটিতে চলতি মাসের ৬ তারিখে পার্লামেন্ট নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। পার্লামেন্ট নির্বাচনে তিউনিসিয়ার ইসলামপন্থী দল আননাহদা শীর্ষে উঠে এসেছে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন তারা পায়নি। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রশিদ ঘানুশির দল নির্বাচনে ২১৭টি আসনের মধ্যে ৫২টিতে জয়ী হয়েছে। সরকার গঠনের জন্য ১০৯টি আসন প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অপরাজিত প্রার্থী নাবিল কারুইর নতুন দল কালব তিউনিস ৩৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। মানবাধিকার কর্মী মোহাম্মদ আব্বুর সোস্যাল-ডেমোক্রেটিক আত্তায়ার পার্টি ২২টি আসন এবং আইনজীবী মাখলুফের করামা পার্টি ২১টি আসন পেয়েছে। এছাড়া ইসলামবিরোধী ফির ডেস্টোরিয়ান পার্টি ১৭টি আসনে জয়লাভ করেছে। তাদের দল থেকে একজন নারী সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন।
তিউনিসিয়া একসময় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উত্তর আফ্রিকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত দেশটির অবস্থান নৌযোগাযোগ রুটের কাছাকাছি। রুমান আরব, অটোমান টার্ক এবং ফরাসিরা এই দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে পেরে দেশটিতে ওই অঞ্চলের হাব হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তিউনিসিয়ায় ১৯৫৬ সালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। এরপর তিন দশকব্যাপী দেশটি শাসন করেন হাবিব বারগুইবা। তিনি দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শের ভিত্তিতে পরিচালনা করেন। তিউনিসিয়া তার পাশের দেশগুলো থেকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। কৃষিক্ষেত্রে দেশের একটি বিরাট জনগোষ্ঠী কাজ করে। পর্যটন হচ্ছে দেশটির একটি প্রধান সেক্টর। পরবর্তীতে দীর্ঘ দিন দেশটি শাসন করেন স্বৈরশাসক জয়নুল আবেদীন বেন আলী। আরব বসন্ত শুরু হলে ২০১১ সালে গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক বেন আলীর পতন ঘটে। মিসরসহ আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশে আরব বসন্ত সফল না হলেও তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্রের অভিযাত্রা সফল হয়। আরব বসন্তের পরিপ্রেক্ষিতে মিসরে গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন ঘটে এবং দীর্ঘ দিন পর দেশটিতে পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে মিসরের জনগণ মুসলিম ব্রাদারহুডকে ব্যাপক সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় বসায়। কিন্তু একটি কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী গণতন্ত্রের এই বিজয়কে সহ্য করতে পারেনি। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকার মিসরে আরব বসন্তের বিজয় ও মুসলিম ব্রাদারহুডের বিজয়ে নিজেদের রাজতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠার আশঙ্কা করে। তাই তাদের ষড়যন্ত্রের বলী হতে হয় মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে। মিসরের সেনাবাহিনীপ্রধান আল সিসি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। এখনো মিসরে স্বৈরশাসক সিসি ক্ষমতা দখল করে রেখেছেন। সম্প্রতি সেখানে সিসিবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। আরব বসন্তের পর তিউনিসিয়ায় ২০১৪ সালে প্রথম স্বাধীনভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে মোহাম্মদ বেইজ সাইদ ইসিবি বিপ্লব পরবর্তী প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিছু দিন আগে তিনি মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর পর দেশটিতে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। দেশটিতে বিপ্লবের পর পার্লামেন্ট নির্বাচনও দ্বিতীয়বার অনুষ্ঠিত হলো।
তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলেও জনগণ দেশটির শাসকগোষ্ঠীর ওপর তেমন একটা খুশি নয়। তাই নির্বাচনে জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আর বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি না হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছোটখাটো বিবাদ তো রয়েছেই।
তিউনিসিয়ায় সাবেক একনায়ক জয়নুল আবেদীন বেন আলীর সময় থেকেই অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। তখন দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ; এখন অবস্থা আরো খারাপের দিকে গেছে। প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ। তখন মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৪ শতাংশ, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭ শতাংশে। বেকারত্ব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ১২ শতাংশ থেকে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশে।
তিউনিসিয়ার জনসংখ্যা এখন ১ কোটি ১৫ লাখ। এবারের নির্বাচনের আগে কয়েক লাখ নতুন ভোটার হয়েছে। মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭ লাখে। নতুনদের মধ্যে গণতন্ত্র নিয়ে অনেক আশা। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে টিভি বিতর্কও অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন প্রেসিডেন্ট একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সবাইকে চমক লাগিয়ে অরাজনৈতিক ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে জনগণ তাকে বিপুলভাবে ভোট দিয়েছে। পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিভিন্ন দল আসন পেয়েছে। কোনো দলই এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। ইসলামপন্থী নেতা রশিদ ঘানুশি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এবারই প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তিনি অনেক অভিজ্ঞ। দীর্ঘ দিন পশ্চিমা দেশগুলোতেই ছিলেন।
ইন্দোনেশিয়ার জনগণ রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, ইসলামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ সবাইকে নিয়ে একটি সফল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও একটি সমৃদ্ধ দেশ দেখতে চায়। আরব বসন্তের পর অন্যান্য দেশ হোঁচট খেলেও তিউনিসিয়া হেঁটে হেঁটে পা পা করে অগ্রসর হচ্ছে। পর্যবেক্ষক মহল আশা করেÑ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও বহু মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে তিউনিসিয়া ভবিষ্যতে আরো এগিয়ে যাবে।


আরো সংবাদ