২৩ নভেম্বর ২০১৯

কাতালোনিয়ায় আবার স্বাধীনতার ঢেউ

-

দেশ হিসেবে স্পেনের ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ। সেই স্পেনের ১৭টি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশের একটি কাতালোনিয়া, যাদের লিখিত ইতিহাসও সহস্রাধিক বছরের। স্পেনের অংশ হলেও জাতিগত ও মতাদর্শগত দিক থেকে কাতালানরা যে মূল স্পেনের চেয়ে স্বতন্ত্র ও আলাদা, সেটা ঐতিহাসিক সত্য। সেই স্বাতন্ত্র্য থেকেই তারা স্বাধীনতাকামী। স্পেনের সৃষ্টির সময় থেকেই তাদের এ দাবি উঠেছে বারবার। কাতালানদের অভিযোগ ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হলেও স্পেনে দীর্ঘ দিন ধরেই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতি অবহেলা ও অবদমন চালিয়ে আসছিল সংখ্যাগরিষ্ঠরা। কাতালান সত্তাকে নিশ্চিহ্ন করে তাদেরকে ‘স্পেনীয়’ বলে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বহুবার। কিন্তু এতে কাতালানরা দমে যায়নি। বরং নিজের পরিচিতি নিশ্চিত করার জন্য বারবার স্বাধীনতার দাবি তুলেছে কাতালানরা। এ দিকে স্পেনে প্রচলিত যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাও কাতালানদের পছন্দ নয়। আর স্পেনের একটি প্রদেশ হলেও কাতালোনিয়া অর্থ, সম্পদ ইত্যাদির দিক দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ। তাই নিজেদের সম্পদ খরচ করে তারা অন্য প্রদেশের দায়িত্ব নিতেও অনাগ্রহী।
কাতালোনিয়ার জনসংখ্যা ৭৫ লাখ, যা সুইজারল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার সমান। আবার শতাংশের হিসেবে স্পেনের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ এই প্রদেশে। স্পেনের উত্তর-পূর্বের এ প্রদেশটির রাজধানী বার্সেলোনা, যা স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। কাতালানদের আছে নিজস্ব ভাষাও। ফুটবল ও পর্যটনের কারণে বার্সেলোনা বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় শহরগুলোর অন্যতম। স্পেনের মোট জিডিপির এক-পঞ্চমাংশ আসে এই বার্সেলোনা থেকে।
স্বায়ত্তশাসনের অধিকার নিয়েই কাতালোনিয়া প্রদেশটি যুক্ত ছিল স্পেনের সাথে। ১৯৩৬ সালে ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত কাতালোনিয়া স্পেনে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করত। কিন্তু চার বছর মেয়াদি গৃহযুদ্ধে বিপর্যয় ঘটে কাতালোনিয়ার ভাগ্যের। ওই গৃহযুদ্ধের পর ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসন চলে দেশটিতে। আর এ সময়টিতে মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয় কাতালোনিয়ার রাজনৈতিক সত্তার। তবে ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর সেখানকার জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হওয়া তীব্র আন্দোলন ও দাবির মুখে স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় সরকার। ১৯৭৮ সালের সংবিধানের আওতায় এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে স্পেন পার্লামেন্টে আইন করে কাতালোনিয়াকে আরো কিছু সুবিধা দেয়া হয়, পাশাপাশি কাতালোনিয়াকে উল্লেখ করা হয় একটি ‘জাতি’ হিসেবে। সংবিধানে ২০০৬ সালে বিষয়গুলো যুক্ত হলেও কয়েক বছর পরই দেশটির সাংবিধানিক আদালত কাতালোনিয়াকে দেয়া বেশ কিছু ক্ষমতা বাতিল করে দেয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ হয় কাতালোনিয়া প্রদেশের সরকার। এর সাথে আরো যুক্ত হয় বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, সরকারি খরচ কমানো ইত্যাদি পদক্ষেপ। এই পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোটের আয়োজন করে কাতালোনিয়া। ওই গণভোটে ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোটার স্পেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অর্থাৎ স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেন। তবে এ গণভোটটি অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এর এক বছর পর ২০১৫ সালে কাতালোনিয়ার নির্বাচনে জয়লাভ করে স্বাধীনতাকামী পক্ষ। সরকার নিজেদের হওয়ায় তারা ২০১৭ সালে এমন একটি আনুষ্ঠানিক গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়, যা মানতে বাধ্য করা যাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে। তবে এ ক্ষেত্রে দেশটির সাংবিধানিক বাধা রয়েই যায়। কারণ দেশটির সংবিধানে বলা আছে, স্পেনকে ভাগ করা যাবে না কোনোভাবেই। ফলে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাকামীরা বাধ্য হয়ে দেশের সংবিধানকে লঙ্ঘন করেই এ ঘোষণা দেয়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও মাদ্রিদের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। শেষ পর্যন্ত কাতালান পার্লামেন্টেও স্বাধীনতার ঘোষণার পক্ষে ভোট পড়ে। পক্ষে ৭০টি আর বিপক্ষে ১০টি।
এর পরপরই মাদ্রিদে সিনেট কাতালোনিয়ায় সরাসরি শাসন জারির পরিকল্পনা অনুমোদন করে এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী কাতালান সরকারের প্রেসিডেন্ট পুজদেমন ও পুলিশ বাহিনীর প্রধানকে বরখাস্ত করেন।
এর আগে কাতালান প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, অন্য কোনো আদালত বা রাজনৈতিক শক্তি তার সরকারকে ক্ষমতা থেকে বরখাস্ত করতে পারবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয় বলেন, ‘কাতালোনিয়ায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সেখানে প্রত্যক্ষ শাসন জারি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
এ শতাব্দীতে কাতালোনিয়ার আন্দোলন পরিক্রমা
২০০৬ সালে এক চুক্তিতে কাতালোনিয়া প্রদেশকে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে বেশ কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়। কিন্তু ২০১০ সালে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত সেই চুক্তির অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল করে দেয়। এতে সেখানে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় তাতে খুব সহজেই স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক দল প্রাদেশিক নির্বাচনে বিজয় লাভ করে। ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর কাতালোনিয়া স্বাধীনতার দাবিতে গণভোটের ঘোষণা দিলে তা নিষিদ্ধ করে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারকে উপেক্ষা করেই তারা সে গণভোটের আয়োজন করে ফেলে। ২০১৫ কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাপন্থীরা আবারো সরকার গঠন করে। ২০১৭ সালে এ গণভোট ইস্যুটি আরো শক্তিশালী হয়ে সামনে আসে। কাতালান প্রেসিডেন্ট কার্লোস পুজদেমন এ বছরের অক্টোবরে এক নতুন স্বাধীনতা গণভোটের ডাক দেন। কাতালান কর্মকর্তারা জানান, সেই ভোটে যদি বেশির ভাগ মানুষ স্বাধীনতা চায়, তাহলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কাতালানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হবে। সেপ্টেম্বরে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত ওই গণভোটকে অবৈধ ঘোষণা করেন। ওই মাসেই প্রায় এক ডজন কাতালান নেতাকে গ্রেফতার করে। এ পর্যায়ে কাতালোনিয়া অঙ্গীকার করে যে কোনো মূল্যে তারা ভোটের ব্যবস্থা করবেই। আর স্পেন ঘোষণা দেয়, যে কোনো মূল্যে তারা সেই ভোট ঠেকাবে। অক্টোবরের ১ তারিখে পুলিশি বাধা সত্ত্বেও ভোট অনুষ্ঠিত হয়। কাতালান কর্মকর্তারা জানান, শতকরা ৯০ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাই তারা স্বাধীনতার পথেই হাঁটবেন। কিন্তু স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয় স্প্যানিশ সংবিধানের ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ চালু করেন, যার ফলে কাতালোনিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতা স্থগিত হয়ে যায়। এত কিছুর পরও অক্টোবরের ২৭ তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় কাতালোনিয়া। কিন্তু স্পেন কাতালোনিয়ার প্রাদেশিক সরকারকে বাতিল ঘোষণা করে এবং একই সাথে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে স্প্যানিশ সিনেট সদস্যরা কাতালোনিয়াকে স্বাধীন হওয়া থেকে বিরত রাখে। পরদিন ইউরোপিয়ান সংসদের সভাপতি অ্যান্টনিও তাজানি ঘোষণা করেন কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার গণভোট অবৈধ। এ দিন স্পেন সরাসরি কাতালোনিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এর পর থেকে এ দুই বছর কাতালোনিয়ার আন্দোলন কিছু দিনের জন্য স্থিমিত থাকে।
সম্প্রতি ২০১৭ সালের কাতালোনিয়া স্বাধীনতার আন্দোলনের ৯ নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন স্পেনের উচ্চ আদালত। রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত গত ১২ অক্টোবর তাদেরকে ৯-১৩ বছরের সাজা দিয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক কাতালান প্রেসিডেন্ট কার্লোস পুজদেমনের বিরুদ্ধে আবারো গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এ নয় নেতার পাশাপাশি আরো তিনজনকে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে কাতালান পার্লামেন্টের সদস্য ও মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী নেতাও রয়েছেন। এ ঘটনায় নতুন করে ফুঁসে উঠেছে স্পেন। স্বাধীনতার দাবি নিয়ে আবার তারা নেমেছে রাজপথে। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে সেখানে পুলিশ মোতায়েন করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার।
ঘটনাপ্রবাহে বোঝা যাচ্ছে, স্পেন ও কাতালোনিয়ার মধ্যে শতবর্ষব্যাপী যে সমস্যা, তা কেবল শক্তি প্রয়োগে মীমাংসাযোগ্য নয়। বরং এর স্থায়ী কোনো সমাধান না হলে কিছুদিন পরপরই স্পেনকে এ সমস্যায় পড়তে হবে তা নিশ্চিত। হ


আরো সংবাদ