২৩ নভেম্বর ২০১৯

প্রাসাদ আমলাদের হাতে বন্দী জাপান সম্রাট?

-

জাপানের নতুন সম্রাট প্রিন্স নারুহিতো ১৯৮০ সালের দিকে যখন লন্ডনের অক্সফোর্ড ইউনির্ভাসিটির ছাত্র ছিলেন, তখন তিনি ‘টেমস নদী ও আমি’ নামক একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি তার দুই বছরের ছাত্রজীবনের স্মৃতিকথা তুলে ধরেন। ওই সময়কার একটি ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘জিন্স পরিহিত ছিলেন না বলে তখন একটি ডিস্ক ক্লাব থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়েছিল’। যদিও জাপানের প্রিন্সদের প্রতি এ ধরনের আচরণ প্রদর্শন সচরাচর কোথাও করা হয় না। ছাত্রজীবনের সেই স্মৃতিটি তাকে বেশ উদ্বেলিত করেছিল। অক্সফোর্ডের মার্টন কলেজে অধ্যয়নের ওই দুই বছর তিনি ‘১৮ শতাব্দীতে টেমস নদীর ওপর নৌ চলাচল’ নিয়ে একটি অনুসন্ধানীমূলক গবেষণা করেছিলেন। প্রিন্স নারুহিতো বলেন, সম্ভবত ওই দুই বছরই ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দময় দিন।
গত ২২ অক্টোবর মঙ্গলবার জাপানের নতুন সম্রাট হিসেবে তার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা তাদের প্রতিনিধিরা সশরীরে গিয়ে তা উপভোগ করেন। রাজপ্রাসাদের একটি কক্ষে বসে অতিথিরা টেলিভিশনের পর্দায় স্বচক্ষে অনুষ্ঠানটি দেখেন। যদিও নতুন সম্রাট নারুহিতোকে ইতঃপূর্বেই (গত ১ মে) জাপানের ১২৬তম সম্রাট হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে হয়েছিল। এর কারণ ৩০ এপ্রিল তার বাবা সাবেক সম্রাট আকিহিতো (৮৫) বার্ধক্যজনিত কারণ দেখিয়ে স্বেচ্ছায় সিংহাসন পরিত্যাগ করেন। ২২ অক্টোবরের এই অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানটি রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন অংশ থেকে ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান আমন্ত্রিত রাজকীয় অতিথিরা। অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণের সময় অতিথিরা আনন্দে ‘বেঞ্জাই’, ‘বেঞ্জাই’ (সম্রাট দীর্ঘজীবী হোক) বলে সেøাগান দেন। ভিডিওচিত্রে আরো দেখানো হয়, কিভাবে গত ৩০ এপ্রিলে পূর্ববর্তী সম্রাট আকিহিতো (নারুহিতোর বাবা) সূর্য দেবতার সামনে তার রাজ্য ত্যাগের ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। উল্লেখ্য, তিনি ওই সূর্য দেবতার কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়েই জাপানের সম্রাট হয়েছিলেন। সূর্য দেবতার সামনে তিনি তার আরেক ছেলে শিন্তোকে প্রাচীন এই রাজকীয় প্রাসাদের যাজক বা গৃহাধ্যক্ষ হিসেবেও ঘোষণা দেন।
এত আনুষ্ঠানিকতা ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখে এটা মনে হতে পারে, কতই না বৈচিত্র্যে ভরা, অদ্ভুত রহস্যে ঘেরা জাপানের সম্রাটদের জীবন! আসলে কিন্তু ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উল্টো। ব্রিটেনে সম্রাট নারুহিতোর আনন্দময় জীবনযাপনের স্বীকারোক্তিই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি বলেন, ছাত্রাবস্থায় ব্রিটেনের ওই সময়টাই ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ।
কিন্তু রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠানে সম্রাট নারুহিতোর সেই ব্রিটিশ জীবনাচরণের কোনো কিছুই প্রদর্শিত হয়নি। কারণ রাজ্যাভিষেকে কী প্রদর্শন করা যাবে, আর কী প্রদর্শন করা যাবে না তা নির্ধারণ করে দেয় ‘ইম্পেরিয়েল হাউজহোল্ড এজেন্সি’ নামে ওই রাজপ্রাসাদের আমলাতান্ত্রিক একটি সংস্থা। ব্রিটেনে থাকাবস্থায় তিনি যে বইটি লিখেছিলেন, সেটিও প্রকাশ করার অনুমতি নেই সম্রাটের। কারণ ওই এজেন্সি মনে করে এতে সম্রাটের পারিবারিক বিষয়গুলো জনসমক্ষে প্রকাশ পাবে এবং হয়তো তা অনেকের কাছে উপহাসমূলক হিসেবে ধরবে। ইম্পেরিয়েল হাউজহোল্ড এজেন্সি (রাজপ্রাসাদের আমলাতান্ত্রিক সংস্থা) সারাক্ষণ রাজপরিবারের গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষায় সংস্থাটি এতই কঠোর যে, এ বিষয়ে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৯৯০ সালে প্রিন্স নারুহিতোর ভাই ফুমিহিতো যখন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তখন অনুমতি ছাড়া কনের পোশাকের একটি ছবি তোলার অপরাধে এক ফটোগ্রাফারকে বাকি অনুষ্ঠানে আর কোনো ছবি তুলতে বা প্রাসাদে ঢুকতে দেয়া হয়নি। শিহোকো গোটো নামে উইলসন সেন্টারের এক বিশেষজ্ঞ বলেন, জাপানের রাজপরিবারের সদস্যদের এতটাই কঠোর বাঁধাধরার মধ্য দিয়ে চলতে হয় যে, সেই তুলনায় উইন্ডসর রাজপ্রাসাদের নিয়মকানুন খুবই সরল ও ইতিবাচক।
‘ইম্পেরিয়েল হাউজহোল্ড এজেন্সি’র বেঁধে দেয়া নিয়মরীতির ওপর ওই দেশের পত্রপত্রিকাগুলোও বেশ শ্রদ্ধাশীল। যার কারণে রাজকীয় এজেন্সির অনুমতির বাইরে তারাও কোনো কিছু প্রকাশ করেন না। এমনকি রাজপরিবারের কোনো সদস্যের লেখা বইও কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকাশ করার সাহস রাখে না। এটি ভয়ের কারণে নয়, বরং জাপানিরা নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই এমনটি করা হয়।
১৯৯৩ সালে সম্রাট নারুহিতোর বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর নতুন কনে মাসাকো রাজপ্রাসাদে থেকে এতটাই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি ২০০৪ সালে ঘোষণাই করে দেন, ‘এখানে থেকে আমি বিষণœতার গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি।’ জাপানের বেশির ভাগ সাংবাদিক এ বিষয়টি যদিও জানতেন, কিন্তু তারা এ নিয়ে কোনো নিউজ করেননি। সেই সময় নিজ স্ত্রীর সমর্থনে কথা বলায় বেশ সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল সম্রাট নারুহিতোকে। সম্রাট তখন কোনো কূটনীতিককে শুধু বলেছিলেন, ‘আসলে সম্রাজ্ঞী মাসাকো রাজপ্রাসাদে এসে অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এখানকার রাজকীয় ও পারিবারিক পরিবেশে তিনি তার ব্যক্তিত্বকে ঠিকমতো মানিয়ে নিতে পারছেন না।’ এ কথা বলায় সম্রাটকে নিয়ে জাপানের পত্রপত্রিকায় অনেক নিন্দনীয় এবং তাকে স্ত্রৈণ বলে অ্যাখ্যায়িত করে খবর ছাপা হয়েছিল। সে সময় সম্রাট আরো বলেছিলেন, যদি সম্ভব হতো নিজের পরিবর্তে বাড়ির অন্য কাউকে সম্রাট বানিয়ে তিনি রাজকার্য ছেড়ে চলে যেতেন।
আসলে ইউরোপীয় সম্রাটদের মতো জাপান সম্রাটদের পারিবারিক ভালোবাসা বা মুখরোচক কোনো ঘটনা নিয়ে সে দেশে কোনো ট্যাবলয়েড প্রকাশিত হয় না। এ বিষয়ে জাপানের ইম্পেরিয়েল এজেন্সির বেঁধে দেয়া বিধিনিষেধ ভাঙার মতো মানসিকতা সে দেশের জনগণের নেই।
রাজপরিবারের সদস্যদের সম্পদের মালিক হওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারা সীমিত সম্পদের মালিক হতে পারবেন। তাদের জীবনযাপনে থাকতে হবে পরিমিতি বোধ। তারা ইউরোপীয় রাজপুত্র বা রাজকন্যাদের মতো ফুর্তিবাজ জীবনযাপন করতে পারবেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাজপরিবারের সম্পদের একটা সীমারেখা টেনে দেয়া হয়েছে। সম্রাটের এই রাজপ্রাসাদ এবং এর সম্পত্তির প্রকৃত মালিক সম্রাট বা সম্রাজ্ঞীর নয়, এর মালিক রাজ্য স্বয়ং। রাজ্যই এর রক্ষণাবেক্ষণের মালিক এবং প্রাসাদের সদস্যদের খরচাদিও বহন করে রাজ্য।
জাপানের এক বিশেষজ্ঞের ধারণা, সাবেক সম্রাট আকিহিতো (যাকে বর্তমানে সম্মানজনক ‘অ্যামিরিটাস সম্রাট’ উপাধি দেয়া হয়েছে) তার ব্যক্তিগত কেনাকাটা ও কাজকর্মের জন্য বছরে মাত্র পাঁচ মিলিয়ন ইয়োন বা ৪৬ হাজার ডলার খরচ করতে পারবেন। রাষ্ট্র কর্তৃক এটাই তার জন্য নির্ধারিত। এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করার অনুমতি সম্রাটের নেই। আকিহিতোর বাবা হিরোহিতো (নারুহিতোর পিতামহ) ১৯৮৯ সালে তার মৃত্যুর পর মাত্র দুই বিলিয়ন ইয়োনেরও কম সম্পত্তি রেখে যেতে পেরেছেন।
রাজপরিবারের সব কাজকর্ম, আচার অনুষ্ঠান ও জীবনযাপন নির্ধারিত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রাষ্ট্রের ও প্রাসাদ আমলাদের (ইম্পেরিয়েল হাউজহোল্ড এজেন্সি) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জাপান সম্রাটদের দেয়া জনসমক্ষের বিবৃতিগুলোও বারবার আমলাতান্ত্রিক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা যাচাই-বাছাই হয়ে তারপর প্রকাশ করা হয়। যাতে করে তাদের বিবৃতি সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার (ফিগারহেডস) বাইরে যেতে না পারে।
যদিও সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী বিদেশে শুভেচ্ছা সফর করতে পারেন, কিন্তু নিজ দেশের ভেতরে তাদের সফর শুধু স্কুল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এসব জায়গায় সফরে গিয়ে তাদের নানা সনাতনী পন্থা ও দুর্বোধ্য ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
আগামী মাসে (নভেম্বরে) নতুন সম্রাট নারুহিতোকে সে দেশের দু’টি অঞ্চলে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চাল বিতরণ করতে হবে। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, এই চাল বিতরণ করা হবে কচ্ছপের খোলের ভেতরে করে। জাপানের মশালধারী ধর্মীয় পুরোহিতরা কচ্ছপের খোলগুলো আগুনে পুড়িয়ে পরিশুদ্ধ করে দেবেন। সেই খোলে করে সম্রাট সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গিয়ে (শস্য তোলার মওসুম শুরু হওয়ায়) তাদের দেবতাদের সন্তুষ্টি করার জন্য চাল বিতরণ করবেন। নতুন সম্রাটের দ্বিতীয় আরেকটি কাজ করতে হবে। তা হলো প্রাসাদের রাজকীয় বাগানে তিনি নিজ হাতে ধান চাষ করবেন।
সাবেক সম্রাট আকিহিতোও অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে সনাতন এই রীতিনীতির বিরোধিতা করেছিলেন; কিন্তু জনগণের পূজনীয় এসব পদ্ধতির বাইরে তিনিও যেতে পারেননি। ২০১১ সালে জাপানে সুনামির সময় টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে তিনি সনাতনী এ দিকগুলো নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু তাতে কী হবে, এর পরপরই তিনি সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীনদের দেখতে যান এবং তাদের নিয়ে একই সাথে মাটিতে বসে চা পান করেন। সম্রাট আকিহিতো তখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সেনজো আবের কাছে গিয়েও এসব সনাতনী রীতিনীতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, জাপানের সংবিধানের একটি ধারা সংশোধন করে দেশে প্রশান্তিময় পরিবেশ কেন এনে দেয়া হচ্ছে না। তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০০১ সালের প্রেস কনফারেন্সে কোরিয়ার পূর্বপুরুষদের প্রসঙ্গ টেনে আরো বলেছিলেন, এখনো যারা জাতিগত বিশুদ্ধতা নিয়ে পড়ে থাকতে চান, তারা পোর্টল্যান্ডের স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘কেন রৌফ’-এর বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন। তিনি অবশ্য জাপান সরকারকে দিয়ে তার সিংহাসন থেকে পদত্যাগের বিষয়টি পাকা করে নিতে পেরেছেন।
আসলে জাপানের সংবিধানে সম্রাটকে ‘দেশ এবং জনগণের ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু যে রাজকীয় কোকুন বা খোলসের ভেতর সম্রাটকে আটকে রাখা হয়, সেটা তাকে আরো হতাশাগ্রস্ত ও কোণঠাসা করে তোলে। বাবার মতো বর্তমান সম্রাট নারুহিতোও এসব আটপৌঢ়ে রীতিনীতিকে অপছন্দ করেন। কিন্তু এই খোলস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সাধ্য তারও নেই। হ


আরো সংবাদ