২৩ নভেম্বর ২০১৯

ম্যাক্রোঁ কি ইইউ সম্প্রসারণের স্বপ্নকে হত্যা করছেন

-

ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পপুলিজমকে পরাস্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হতে পারেন, কিন্তু আজকাল বলকানের অনেক লোক তাকে ‘ইউরোপীয় ট্রাম্প’ বলে ডাকেন। এই অসম্ভব তুলনার কারণ হলোÑ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিধি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান। ইইউতে উত্তর ম্যাসিডোনিয়া ও আলবেনিয়া সংযুক্তির বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণের সংস্কার চেয়েছেন তিনি। আবার ব্রেক্সিট ইস্যুতে ব্রিটেনকে ১৫ দিনের বেশি সময় দিতে কোনোভাবেও রাজি ছিলেন না ম্যাক্রোঁ।
কিন্তু গত সোমবার ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ব্রেক্সিট পেছাতে রাজি হয়েছে ইইউ। তবে এর ভেতরে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট চুক্তি পাস হয়ে গেলে এই সময়সীমার যেকোনো সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে ব্রিটেন। ২৮ অক্টোবর ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক টুইটে বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের আধা ঘণ্টাব্যাপী শীর্ষ বৈঠক ব্রিটেনের একটি তথাকথিত ‘ফ্লেক্সটেনশন’ অর্থাৎ ব্রেক্সিট নিয়ে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সেটি দূর করার জন্য প্রক্রিয়াটির বিলম্বে সম্মত হয়েছে। তবে এর ভেতরে তাদের অচলাবস্থা কেটে গেলে তারা বেরিয়ে যেতে পারে ইইউ থেকে।
ব্রেক্সিট ইস্যুতে হার্ডলাইনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। ব্রেক্সিট বর্ধিতকরণের বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত আটকে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। তিনি জোর দিয়ে জরুরি ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে বলেছেন, ৩১ অক্টোবরের ব্রেক্সিট সময়সীমার যেকোনো বিলম্ব ১৫ দিনের বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি ডোনাল্ড টাস্ক ইইউ নেতাদের বলেছেন, ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসের ‘নমনীয়তা’ সমর্থন করুন। ফরাসি আলোচকরা ‘খুব কঠোর’ ও ‘দুর্ঘটনাজনক’ নো-ডিল ব্রেক্সিটকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে অভিযোগ করা হয়েছে বলে ইইউভুক্ত ২৭ দেশের নেতারা ৫০ অনুচ্ছেদের আর্টিকেল কত দীর্ঘ হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ব্রাসেলস রাষ্ট্রদূতরা একটি ব্রেক্সিট সম্প্রসারণ মঞ্জুর করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন, কেবল ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এটি যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত করতে চেয়েছিলেন।
ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ব্লকের আলোচনা ‘আগামী দিনগুলোতে’ অব্যাহত থাকবে। তবে কেবল ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রতিনিধিরা সেখানে ব্লকটিকে একমত হতে এবং তারপরে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন, দ্য এক্সপ্রেসের ব্রাসেলস সংবাদদাতা জো বার্নেস জানিয়েছেন এমনটা। অন্যান্য সদস্য দেশ হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, ফ্রান্সের এ পদক্ষেপ যুক্তরাজ্যের ঘরোয়া রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সমান হবে এবং এটি ‘দুর্ঘটনাজনিত নো-ডিল ব্রেক্সিট’ হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সকে বলেছিলেন যে, তারা তাদের কট্টর অবস্থানের সাথে ‘খুব কঠোর’ হচ্ছেন। ব্রিটেনে ব্রেক্সিট অচলাবস্থার সাথে ম্যাক্রোঁর অধৈর্য নাইজেল ফ্যারাজের অপ্রত্যাশিত প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এ দিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন পার্লামেন্ট দ্বারা বাধ্য হয়ে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ব্রেক্সিট বিলম্বের জন্য অনুরোধ করেছিলেন এবং চ্যান্সেলর সাজিদ জাভিদ স্বীকার করেছিলেন যে, হ্যালোইনের সময়সীমা এখন সরে গেছে। অন্য দিকে বিরোধী লেবার পার্টি প্রধান জেরেমি করবিন বলেছিলেন যে, যদি জানুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়, তবে জনসন এটিকে ‘একেবারে পরিষ্কার’ করে দিলে যুক্তরাজ্য এই ব্লকের বাইরে গিয়ে ক্রাশ হবে না। এমন একটি নির্বাচনকে তিনি সমর্থন করবেন।
এ ছাড়া সম্প্রতি ব্রাসেলস শীর্ষ সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ উত্তর ম্যাসিডোনিয়া ও আলবেনিয়ার সাথে সংলাপের আলোচনার সূচনাকে ভেটো দিয়েছিলেন। তবে ফরাসি নেতা উত্তর মেসিডোনিয়াতে প্রত্যাখ্যান করতে কারো সমর্থন না পেলেও আলবেনিয়ার ক্ষেত্রে কেবল ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের নেতাদের সমর্থন পেয়েছিলেন। আলোচনার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন সদস্যদের বিবেচনা করার আগে ইইউর নিজস্ব ঘর পাওয়ার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত বলে যুক্তি দেন তিনি। ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘ইইউ সম্প্রসারণের বিধিগুলোর সংস্কার প্রয়োজন।’
ইউরোপ মহাদেশের বেশির ভাগ দেশের একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ। ২৮টি দেশের এই জোটের অধীনে অভিন্ন মুদ্রা (ইউরো), ইউরোপীয় পার্লামেন্টসহ অনেক বিষয় রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সব ইউরোপ মহাদেশে ব্যাপকভাবে জাতীয়তাকরণে পুরো ইউরোপে সঙ্কটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ১৯৪৮ সালের হেগ সম্মেলন ছিল ইউরোপীয় ফেডারেল ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা কি না পরবর্তীতে ইউরোপীয় আন্তর্জাতিক আন্দোলন ও ইউরোপীয় কলেজ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৫১ সালে ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায় গঠিত হয় যা ইউরোপীয় ফেডারেশনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৫৭ সালের ২৫ মার্চ পশ্চিম ইউরোপের ছয়টি দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা ‘রোম চুক্তি’ নামে পরিচিত। এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায়ের কর্মপরিধি বর্ধিত হয় এবং বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি, পশ্চিম জার্মানি, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসের সমন্বয়ে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় গঠিত হয়। ১৯৬৭ সালে মার্জার চুক্তি নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুসারে একই দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করা হয় এই তিনটি সম্প্রদায়ের জন্য যাদের একসাথে ‘ইউরোপীয় সম্প্রদায়’ নামে অভিহিত করা হতো।
১৯৭৩ সালে ইসির পরিধি বর্ধিত হয় যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড ও ডেনমার্কের যোগদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৯ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে প্রথম সরাসরি ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালে গ্রিস যোগ দেয় এবং ১৯৮৬ সালে পর্তুগাল ও স্পেন যোগ দেয়। ১৯৮৫ সালে শেনজেন চুক্তির মাধ্যমে সদস্য ও ইউরোপের অন্য কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যে পাসপোর্টবিহীন সীমান্ত ধারণার উপায় সৃষ্টি হয়। ১৯৮৬ সালে ইউরোপীয় পতাকা ব্যবহার শুরু হয় এবং একক ইউরোপীয় আইন স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৯২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডের ম্যাসট্রিচটে ইউরোপীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ম্যাসট্রিচট চুক্তি নামে পরিচিত। ১ নভেম্বর ১৯৯৩ সালে এই চুক্তি কার্যকর হয় যার ফলে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ এবং ইউরোপের একক মুদ্রা হিসেবে ‘ইউরো’ চালু হয়। ১৯৯৫ সালে অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন এতে যোগ দেয়। ২০০২ সালে ১২টি সদস্য রাষ্ট্র মুদ্রা হিসেবে ইউরো গ্রহণ করে।
২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর লিসবন চুক্তি কার্যকর হয়, যা ইইউতে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। বিশেষ করে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাঠামো নতুন করে সৃষ্টি করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিনটি সম্প্রদায়ের জন্য অভিন্ন আইন তৈরি হয় এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি পদ তৈরি করে।
শক্তিশালী এই জোটে নতুন সদস্য দেশ অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ম্যাক্রোঁর শক্ত অবস্থান আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সেটিই এখন দেখার বিষয়। হ


আরো সংবাদ