১২ ডিসেম্বর ২০১৯

দেশে দেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ কি বিশ্বের দৃশ্যপট পাল্টে দেবে

-


বিশ্বব্যাপী যেন নতুন করে পরির্বতন ঘটতে যাচ্ছে। বাগদাদ থেকে হংকং, সান্টিয়াগো থেকে বার্সেলোনা সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন শহরের রাজপথ প্রতিবাদ-বিক্ষোভে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে। গত বছর আলজেরিয়া, সুদান, ইরাক ও লেবাননে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বর্তমানে লেবানন ও ইরাকে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। এসব বিক্ষোভকে ইতোমধ্যে আরব বসন্তের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের পর থেকে আরব বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে সহিংস প্রতিবাদ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। বেকারত্ব, স্বৈরাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরিচালিত ওই আন্দোলনের নাম দেয়া হয়েছিল আরব বসন্ত। আরব বসন্তের তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক জয়নুল আবদিন বেন আলীর পতন ঘটে, মিসরের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর দেশটিতে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ব্রাদারহুডের ড. মুহাম্মদ মুরসি। অবশ্য পরবর্তীকালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মিসরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং পার্লামেন্ট ভেঙে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে। এখনো স্বৈরশাসক জেনারেল আল সিসি ব্যাপক দমনাভিযান চালানোর মাধ্যমে দেশটিতে একনায়কতন্ত্র অব্যাহত রেখেছেন। তবে সেখানে তার বিরুদ্ধেও নতুনভাবে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। দেশের গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে লেবানন এবং ইরাকে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনের মুখে লেবাননে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগ করেছেন। বেকারত্ব, ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনেতিক অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি ও স্বৈরতন্ত্রই এসব বিক্ষোভের মূল কারণ।
আবার কোনো কোনো দেশের বিক্ষোভের কারণ একই সূত্রে গাঁথা নয়। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হংকংয়ের প্রতিবাদ বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় হংকংয়ের লোকদের মেইন ল্যান্ড চীনে স্থানান্তরের মাধ্যমে বিচার করা হবেÑ অর্থাৎ স্থানীয় সরকার হংকংয়ের অধিবাসীদের মূল দেশ চীনে স্থানান্তর করার লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলে সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়। অপর দিকে লেবাননে হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজিং সার্ভিসের কলে করারোপের ঘোষণা দিলে সেখানে বিক্ষোভ শুরু হয়। অর্থাৎ লেবাননে হোয়াটসঅ্যাপের কলের ওপর কর নির্ধারণ করায় জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আবার কিছু প্রতিবাদ বিক্ষোভের মধ্যে সামঞ্জস্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। এগুলো হলো অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক হতাশার কারণে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একক ও বিচ্ছিন্ন কারণে বিক্ষোভ শুরু হওয়া দেশগুলোর মধ্যে শুধু লেবানন একা নয়।
সরকার জ্বালানির ওপর দেয়া সাবসিডি তুলে নেয়ার পর চলতি মাসে ইকুয়েডরে বিক্ষোভ শুরু হয়। দেশটির জনগণ বছরের পর বছর ধরে এই সুবিধা ভোগ করে আসছিল। হঠাৎ করে জ্বালানির ওপর দেয়া ভর্তুকি প্রত্যাহার করায় তারা প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে। চিলিতে সাব-ওয়েতে মূল্যবৃদ্ধির পর গত মাসে সেখানে সহিংসতা শুরু হয়। এ দিকে ভারতেও মানুষ পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানায়। প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ বিক্ষোভ পরবর্তীকালে সহিংস ও বিশাল আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ বন্ধ হলেও অনেক দেশে তা এখনো চলমান রয়েছে। চিলিতে প্রেসিডেন্ট ভাড়া বৃদ্ধি বাতিল ঘোষণা করার পরও প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে। জনগণের এসব অসন্তোষের মূল কারণ হলো অসমতা। আয়ের ক্ষেত্রে অসমতা ও বৈষম্যের কারণে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয় এবং এতে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। লেবাননে হোয়াটসঅ্যাপে করারোপের কারণে বিক্ষোভ শুরু হলেও দেশটি হচ্ছে বিশ্বের অত্যন্ত অসম অর্থনীতির একটি দেশ। দেশটিতে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ১ শতাংশ ধনী মোট জাতীয় উৎপাদনের ২৫ শতাংশ দাবি করে।
চিলি হলো তার পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের চেয়ে অধিকতর স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ দেশ। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সদস্য দেশগুলোর মধে চিলিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পোস্ট ট্যাক্স ইনকাম অসমতা বিদ্যমান রয়েছে। অথচ বিশ্বের কয়েকটি ধনী দেশের মধ্যে এই সংস্থার সদস্য দেশগুলোর অবস্থান। ইরাকে গোটা প্রজন্মই অর্থনৈতিক দুর্দশায় নিপতিত হওয়ার কারণে অসন্তোষ ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক দেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভের মূল কারণ হলো আয়ে অসাম্যতা। বিশেষভাবে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণ নীতিনির্ধারণকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। পরিণতিতে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে, চলতি অর্থবছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে কেবল ৩ শতাংশ। অথচ গত জুলাই মাসে বলা হয়েছিল প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হবে। এই পূর্বাভাস সঠিক হলে, গত আর্থিক সঙ্কটের পর থেকে এটা হবে সবচেয়ে ধীর বা শ্লথ প্রবৃদ্ধি। বহু দেশ নিজেদের বাঁচানোর জন্য বড় ধরনের ঋণ করেছিল এবং এখনো তারা ঋণগ্রস্ত। বিশেষভাবে লেবাননের অবস্থা খুবই খারাপ। সেখানে জিডিপি অনুপাতে ১৫৫ শতাংশ ঋণ নেয়া হয়েছে। এতে করে দেশটি বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক ঋণগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়েছে।
বহু প্রতিবাদকারী মনে করেনÑ সরকারি নীতির কারণে নয়, বরং সরকার নিজেই এসব ব্যর্থতার জন্য দায়ী। বার্সেলোনা এবং হংকংয়ে দুর্নীতির বাইরে ও সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে এবং জনগণ ফুঁসে ওঠে। এশিয়ার মেগা সিটি হংকংয়ের জনগণ তাদের স্থানীয় সরকার বেইজিংয়ের সাথে তাদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় আর সক্ষম নয় বলে মনে করায় সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বার্সেলোনায় সর্বশেষ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় তখন যখন কাতালানের স্বাধীনতাকামী নেতাদের কারারুদ্ধ করা হয়।
হংকং আন্দোলনের মুখে নতুন প্রত্যর্পণ বিল প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। একইভাবে আন্দোলনের মুখে লেবাননে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পরও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে এবং ইকুয়েডর বা চিলিতেও আন্দোলন প্রশমিত হয়নি। এ পর্যন্ত প্রতিবাদ বিক্ষোভের কারণে সত্যিকার অর্থে কোথাও পুরোপুরিভাবে সরকারের পতন ঘটেনি। অবশ্য লেবাননসহ কয়েকটি দেশে সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছে। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো শুধু অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং সেখানে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে এবং বহু মানুষের প্রাণপ্রদীপ চিরতরে নিভে গেছে। তাই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্কট সমাধান করা এখন অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আরো সংবাদ