২১ জুলাই ২০১৮

খুলনায় ইসির ‘এক্সিলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’ নির্বাচন

খুলনায় ইসির ‘এক্সিলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’ নির্বাচন - সংগ্রহ

গত ১৫ মে, ২০১৮ খুলনায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সিটি করপোরেশনের ভোট। একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে দেখলাম নির্বাচন কমিশন বলেছে, এ নির্বাচন ছিল ‘এক্সেলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও এই নির্বাচনকে ‘শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু’ বলে আখ্যায়িত করেছে; কিন্তু গণমাধ্যম সূত্রে এই নির্বাচনের যে চিত্রটা আমরা পেলাম তাতে এই ‘এক্সেলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’ এবং ‘শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচনের লেশমাত্র ধরা পড়েনি। বরং সাধারণ বিবেকবান মানুষ খুলনা সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচনকে দেখতে পেয়েছে নির্বাচনী অনিয়মের এক নতুন মডেল হিসেবে। এই নির্বাচনে সরকারি দলের লোকজন যেভাবে ভোটকেন্দ্রগুলোতে তাণ্ডব চালিয়ে দলীয় মেয়রপ্রার্থীর নির্বাচনী বিজয় নিশ্চিত করেছে, তাতে তালুকদার আবদুল খালেক নিজেও লজ্জিত হয়েছেন বলে মনে হয়। ভোটের পরদিন অন্তত ১০-১২টি দৈনিক পত্রিকায় তালুকদার আবদুল খালেকের ‘ভি’ চিহ্ন প্রদর্শনের ছবি ছাপা হতে দেখা গেছে; কিন্তু একটি পত্রিকার ছবিতেও তার মুখে হাসিমুখ দেখা যায়নি। বরং তার চোখেমুখে ছিল এক ধরনের বিষাদের ছায়া। এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও তার মুখের এই বিষাদের ছায়ার সম্ভাব্য একটিই কারণ হতে পারে- তিনি যেভাবে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন, সম্ভবত তিনি নিজেও তাতে লজ্জাবোধ করছেন। তবে নির্বাচন কমিশন লজ্জার মাথা খেয়ে এই নির্বাচনকে আখ্যায়িত করেছে ‘এক্সেলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’ হিসেবে।

জাতীয় দৈনিকগুলোর সরেজমিন প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেল সূত্রে পাওয়া সচিত্র প্রতিবেদন থেকে এটুকু নিশ্চিত- খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে ব্যাপক ভোট ডাকাতি, ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে প্রকাশ্যে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, বেলা ১১টার মধ্যে দেড় শতাধিক ভোটকেন্দ্রের ভোট দেয়া শেষ হয়ে যাওয়া, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, বিএনপি প্রার্থী ও এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া কিংবা কেন্দ্রে যেতে না দেয়া, সরকারি লোকেরা পুরো কেন্দ্র নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া, পুলিশ বাহিনীকে দলের পক্ষে ব্যবহার করা, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে না দেয়া, সরকারবিরোধী প্রার্থীদের সমর্থক নেতাকর্মীদের ভোটের ক’দিন আগে থেকেই গণগ্রেফতার, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি ও হুমকি প্রদর্শনে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর ব্যবহার, জালভোট দেয়ার জন্য বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করা- ইত্যাদি সবই চলেছে খুলনার এই নির্বাচনে। ভোটকেন্দ্রগুলো এভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সরকারি প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করায় এ যেন এক নতুন মডেল দেখতে পেল এই নির্বাচনে। খুলনার এই নতুন মডেলের নির্বাচন আবারো প্রমাণ করল বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, আর এই অভিযোগটি সরকারের বাইরে থাকা বিভিন্ন দল-মহল বরাবর করে আসছে। এমনকি দেশের বিভিন্ন মহলও তাই মনে করে; কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতানেত্রীরা এ কথায় কোনো আমল দিচ্ছে না।

এবার দেখা যাক গণমাধ্যমে কেমন ছিল এবারের ইসির এই ‘এক্সেলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’ নির্বাচন। ভোটের পরদিন দৈনিক প্রথম আলোর নিজস্ব খুলনা প্রতিনিধির পাঠানো ‘পরিবেশ দৃশ্যত শান্ত, তবে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে’- শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়- ‘খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়নি। বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ ছিল শান্ত। তবে, সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন কেন্দ্রে জোর করে বুথে ঢুকে ব্যালটে সিল মারা, জালভোটের ঘটনাও ঘটেছে। তিনটি ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশের বিরুদ্ধে দর্শকের ভূমিকায় থাকার অভিযোগ উঠেছে। প্রথম আলোর পাঁচজন প্রতিবেদক ও তিনজন আলোকচিত্রী ৮০টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে অন্তত ৬০টি কেন্দ্রেই ধানের শীষের পোলিং এজেন্টদের পাওয়া যায়নি। বিএনপির অভিযোগ, আগে থেকেই ধরপাকড় হুমকি-ধমকিতে তাদের নেতাকর্মীরা ছিলেন মাঠছাড়া। বেশির ভাগ কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ঢুকতে পারেননি, কিংবা বের করে দেয়া হয়েছে। বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু সাংবাদিকদের বলেছেন, জোর করে সরকারি দল জয় কেড়ে নিয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক ভোটের দিন রাতে প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘যেসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা বলা হয়েছে, সেসব কাউন্সিলর প্রার্থীদের। সেটার দায় মেয়রপ্রার্থী কেন নেবে।’

কিন্তু তালুকদার আবদুল খালেকের এই দাবি গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া খবরগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, প্রতিটি পত্রিকাতেই ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ঢুকানোর যেসব ছবি ছাপা হয়েছে, সেগুলোর সবগুলোতেই নৌকা মার্কায় সিল মারার কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রতিটি পত্রিকার ছবিতেও তা-ই দৃশ্যমান। আর যেহেতু নৌকা চিহ্নটি কেবল মেয়রপ্রার্থীর বেলায়ই প্রযোজ্য রয়েছে। অতএব অস্বীকার করি কী করে। বরং এ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে, ব্যালট পেপার ছিনিয়ে সিল মারার ঘটনাটি তালুকদার আবদুল খালেকের অনুকূলেই হয়েছে এবং তা তার লোকদেরই কাজ। এর দায় কাউন্সিলরদের ঘাড়ে চাপানো শাক দিয়ে মাছ ঢাকারই অপচেষ্টা। আর তালুকদার আবদুল খালেকের বক্তব্য থেকে এটুকু প্রমাণ হয়, ‘বিচ্ছিন্ন’ই হোক আর ‘নিরবিচ্ছিন’ই হোকÑ এ ধরনের ঘটনা কিন্তু ঘটেছে। ভোটের পরের দিনের জাতীয় পত্রপত্রিকায় তারই প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। জাতীয় গণমাধ্যম না থাকলে জাতির পক্ষে এসব কিছুই জানা হতো না। তখন ইসির ‘এক্সেলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’ এবং সরকারি দলের ভাষার খুলনার নির্বাচন জাতির কাছে ‘শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন’ হিসেবেই চিহ্নিত হতো আমাদের জাতীয় ইতিহাসে।

প্রথম আলোর উল্লিখিত সুদীর্ঘ এই প্রতিবেদনের এক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে- ‘নগরীর নুরানী বহুমুখী মাদরাসা কেন্দ্রে দুপুর ১২টায় সরেজমিন দেখা গেছে, এস এম মনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি তার শিশুপুত্রকে নিয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে বের হচ্ছেন। বাবা ও ছেলে দুইজনের হাতের আঙুলে ভোট দেয়ার অমোচনীয় কালি লাগানো রয়েছে। কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমার ছেলেও ভোট দিয়েছে। সে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র।’ ছেলেটি জানায়, ‘নৌকায় ভোট দিয়েছি।’ এই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, বেলা তখন ১২টা বাজে। ভোটারেরা ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের রূপসা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের জানানো হয় ব্যালট পেপার ফুরিয়ে গেছে। এই প্রতিবেদনে আরেক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে- তালুকদার আবদুল খালেকের বাড়ির পাশের ফাতিমা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট কেন্দ্রে যেতে পারেনি। এই কেন্দ্রের ১ নম্বর বুথে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ৩০ থেকে ৪০ জন লোক জোর করে ঢুকে নৌকা ও ঘুড়ি প্রতীকের ব্যালটে সিল মারতে থাকেন। পরে প্রিজাইডিং অফিসার এই কেন্দ্রের ভোট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। তা ছাড়া ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইকবাল নগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ১০টার দিকে ১০ থেকে ২৫ জন যুবক জোর করে ঢুকে পড়ে। এরা কেন্দ্রের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বুথে ঢুকে ব্যালট পেপার নিয়ে সিল মেরে ভোটবাক্সে ভরতে থাকে। পরে এই কেন্দ্রের ভোট স্থগিত ঘোষণা করা হয়। প্রিজাইডিং অফিসার খলিলুর রহমান বলেন, তারা পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলেন; কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। এরা ৪০টি ব্যালটে সিল মেরে চলে গেছে।

ভোটের পরদিন দৈনিক মানবজমিন, এর শীর্ষ সংবাদ প্রকাশ করে খুলনার নির্বাচনকে অনুষঙ্গ করে। ওই শীর্ষ সংবাদের শিরোনামটি ছিল এরূপ : ‘এটাই ভোট : খুলনায় নির্বাচনের নতুন মডেল’। এই শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়- ‘বাবার সঙ্গে ভোট দিয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়–য়া ছেলে। কেন্দ্রের বাইরে লাইন। ব্যালট পেপার শেষ। আপনার ভোট দেয়া হয়ে গেছে, বাড়ি চলে যান- সবচেয়ে কমন ডায়ালগ। জালভোটের রীতিমতো উৎসব। বাধা দেয়নি কেউ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহায়ক ভূমিকায়।’

প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয় : ‘এমন এক অভূতপূর্ব ভোটের সাক্ষী হলো খুলনা। গায়েবি ভোটের নয়া মডেলও বলা চলে। হানাহানি নেই, রক্তপাত নেই। ভোটের আগে থেকেই নানা গুঁজব ছিল মুখে মুখে। সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন প্রার্থী এবং ভোটারেরা। ভোটের দিন গুজব আর শঙ্কারই বাস্তব চিত্র দেখা গেল ভোটে। তখন অনিয়মের কারণে তিন কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করলেও বাকি নির্বাচন কেন্দ্রে ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে কমপক্ষে দেড় শ’ কেন্দ্রে একতরফা নৌকা প্রতীকে জালভোট দেয়ার অভিযোগ করেছে বিএনপি।’

এরপরও নির্বাচন কমিশন বলেছে খুলনার নির্বাচন হচ্ছে একটি ‘এক্সেলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’ নির্বাচন। এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। একইভাবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও বলেছেন, খুলনার নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জানি না, ইসি ও ক্ষমতাসীন দলটির কাছে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সংজ্ঞাইবা কী।

গত পরশু দেখলাম, একটি জাতীয় দৈনিকে ‘বিবিসি বাংলার সংবাদদাতার চোখে খুলনার নির্বাচন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এতে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতার ভাষ্যই তুলে ধরে বলা হয় : ‘ খুলনার ডাকবাংলো মোড়ে ভোটের পরদিন খবরের কাগজের স্টলে কয়েকজনের সাথে কথা হয়। একজন ব্যবসায়ী বলছিলেন, ‘খালেক ভাই নিঃসন্দেহে ভালো লোক। তার উন্নয়ন ছিল; কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম সুন্দর একটা নির্বাচন। খুলনার জনগণ যদি বিবেকবান হন, তাহলে এবার তাকে নির্বাচিত করবেন; কিন্তু এভাবে নির্বাচিত হয়ে আসাটা আমার কাছে কাম্য ছিল না।’ কর্মজীবী এক তরুণের অভিযোগ, ‘অনেকে ওপেন জালভোট দিয়েছে। অনেকে ভোট দিতে এসে ফিরে গেছে।’ নির্বাচন কমিশন কি তার দায়িত্ব পান করেছে। কয়েকজন বলে উঠলেন, ‘না না’। অবশ্য পাশে দাঁড়ানো একজন বলে উঠলেন, ‘এটি কমিশনারদের দ্বন্দ্ব, মেয়রের না। কমিশনারদের দ্বন্দ্বে দুটো কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জালভোট হয়েছে প্রথম শুনলাম। প্রশাসন খুব ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে।’

বিবিসির প্রতিবেদক জানান : ‘সাধারণ মানুষের বক্তব্যের যথার্থতা নির্ণয় করা মুশকিল। কে কোন দলের, সেটিও বোঝা যায় না। তবে খুলনার নাগরিকদের বক্তব্য যা-ই হোক, বোঝা দরকার নির্বাচনটি কেমন হলো। ভোটের দিন সকাল থেকে খুলনা শহরে বেশ ক’টি কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছি। সকালের দিকে যারা ভোট দিতে এসেছিলেন তারা অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ভোটের পরিবেশও ছিল দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ। কিন্তু সকাল থেকেই বিএনপির প্রার্থী অভিযোগ করেন, ৪০টি কেন্দ্রে তাদের এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। কোথাও ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং কোথাও মারধর করে বের করে দেয়া হয়েছে। এমন অভিযোগও পাওয়া যায়, আওয়ামী লীগের কর্মীরা দেখানোর জন্য ধানের শীষের ব্যাজ পরে বিএনপির এজেন্ট সেজে বসে আছে। যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ নাকচ করা হয়। কিছু কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপির এজেন্টরা সত্যিই অনুপস্থিত। আর অন্য দিকে সব কেন্দ্রে ও কেন্দ্রের বাইরে নৌকা মার্কার ব্যাজ পরা কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি। ভোটকেন্দ্রগুলোতে কার্যত নৌকার কর্মীদের টহল ও নিয়ন্ত্রণ ছিল বলেই মনে হয়। পরিচয় গোপন রেখে কয়েকজন জানান, ‘কিছু কেন্দ্রে দল বেঁধে ঢুকে ২০-২৫ মিনিটের মধ্য ভোট কাটার ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশ্যে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেনি। প্রকাশ্যে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না বাঁধিয়ে সুকৌশলে কাজ হয়েছে।’

বিবিসি প্রতিবেদক আরো জানান : ‘দুপুরের পর কয়েক জায়গা থেকে ভোটে অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ আসে। যে কারণে তিনটি কেন্দ্রের ভোট বন্ধ করে দেয়া হয়। অনেকে ভোট দিতে এসে হতাশ হয়ে কেন্দ্র থেকে ফেরত গেছেন। ভোটের অবস্থা জানার জন্য একটি কেন্দ্রে ভোট গণনার সময় উপস্থিত ছিলাম। এই কেন্দ্রে ৬৮ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে। ব্যালট বাক্স থেকে বের করে গণনার সময় দেখেছি কিছু ব্যালটের পেছনে সিল ও স্বাক্ষর আছে। কিছু ব্যালটের পেছনে সিলমোহর আছে, কিন্তু স্বাক্ষর নেই। আবার কিছু দেখেছি সিল ও স্বাক্ষর কিছুই নেই। নির্বাচনী কর্মকর্তারা ভোট গণনার একপর্যায়ে স্বাক্ষরহীন একটি ব্যালট পেপার অফিসারকে দেখালে তিনি অবৈধ ঘোষণা করেন। পরক্ষণেই একই রকম একগাদা ব্যালট তার হাতে দেয়া হলে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। এ সবই ছিল নৌকা মার্কায় দেয়া ভোট। পরে ভোটকেন্দ্রে অবস্থানরত পুলিশের সাথে পরামর্শ করে প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালটে স্বাক্ষরবিহীন ভোট বৈধ হিসেবে গণনার নির্দেশ দেন। এরপর আর ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর আছে কি নেই, তা খতিয়ে দেখা হয়নি। এ ব্যাপারে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইনত এসব ভোট বাতিল হওয়ার কথা; কিন্তু স্বাক্ষরহীন সব ব্যালটকে বৈধ ধরে নিয়েই গণনা করা হয়েছে ১৮৬ নম্বর কেন্দ্রে। ওই কেন্দ্রে নৌকা মার্কা পেয়েছে ১১৫৬ ভোট। আর ধানের শীষ পেযেছে ১৩৩ ভোট। ওই কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর কোনো এজেন্ট উপস্থিত ছিল না।’

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদক তার প্রতিবেদনের শেষাংশে উল্লেখ করেন : ‘খুলনার এ নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন অনেকে। নির্বাচন কমিশনের জন্যও এটি ছিল একটি পরীক্ষা। আওয়ামী লীগের দাবি বিএনপির এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন, অপপ্রচার। তারা নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত করতে চায়। আর নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও দাবি করা হয়, বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ছাড়া খুলনার ভোট ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ’ হয়েছে এবং কমিশন সন্তোষ জানাচ্ছে খুলনায় এরকম নির্বাচন আয়োজন করতে পেরে। ভোটের পর অনেকেই নির্বাচন কমিশনের প্রতি তাদের আস্থা কমেছে বলেই জানিয়েছেন। সার্বিকভাবে খুলনার এ ভোট নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি পর্যবেক্ষকেরাও। নির্বাচনী কার্যক্রম দেখেছেন শিক্ষাবিদ আনোয়ারুল কাদির। তিনি বলেন, ‘পুরনো খুলনার টুটপাড়া, ইকবাল নগর, শিপইয়ার্ড এই বেল্টে বেশকিছু অনিয়ম আমাদের চোখে পড়েছে। শুধু আমাদের চোখে পড়ে না, কিছু কিছু জায়গায় এটি একবারে ওপেন হয়ে গিয়েছিল। আমাদের এখানকার নির্বাচনী রাজনীতিতে এই কাজটি চলছে। আমরা বরাবরই চাইছিলাম যে এটি থেকে বের হয়ে আসতে; কিন্তু এই আশাটা আর পূরণ হলো না।’

এ দিকে কিছু কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোটার টার্নআউটের পরিমাণ দেখলেও নির্বাচনী অনিয়মের বিষয়টি সহজেই আঁচ করা যায়। সার্বিকভাবে এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৩ শতাংশ। অথচ, নয়াবাটি হাজী শরিয়ত উল্লাহ বিদ্যাপীঠ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯৯.৯৪ শতাংশ। এই কেন্দ্রের রেজাল্ট শিটে দেখা যায়- ১৮১৮ জন ভোটারের একজন ছাড়া বাকি সবাই তাদের ভোট দিয়েছেন। যে কয়টি ভোটকেন্দ্রে অবাস্তব হারে ভোট পড়েছে, সেগুলোর মধ্যে এই কেন্দ্র একটি। যেসব কেন্দ্রে এভাবে অস্বাভাবিক হারে ভোট পড়েছে সেগুলোতে তালুকদার আবদুল খালেক সহজ বিজয় পেয়েছেন। যেমন নয়াবাটি কেন্দ্রে তালুকদার আবদুল খালেক পেয়েছেন ১১১৪ ভোট, আর বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ৩৭৩ ভোট। একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিনিধিকে একজন প্রিজাইডিং অফিসার জানিয়েছেন, এ ধরনের ভোট কাস্টিং অস্বাভাবিক। একমাত্র অনিয়মের বেলায়ই এমনটি ঘটতে পারে। তবে এ ধরনের অস্বাভাবিকতার কথা নির্বাচন কমিশনকে জানাবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি এ ব্যাপারে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

নতুন বাজার প্রাইমারি স্কুলের আরো দু’টি ভোটকেন্দ্রে এ ধরনের অস্বাভাবিক ভোট পড়ার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এই স্কুলের ভেতর দু’টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। তালুকদার আবদুল খালেক এই নতুন বাজার এলাকায়ই বসবাস করেন। এই দুই কেন্দ্রে একটিতে ৯১.৩৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই কেন্দ্রে তালুকদার আবদুল খালেক পেয়েছেন ১২০২ ভোট এবং নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ১৪১ ভোট। এই দুই কেন্দ্রের অন্যটিতে ভোট পড়েছে ৮১.৬৩ শতাংশ। অপর দিকে খালিশপুরের ভাসানী বিদ্যাপীঠে ভোট পড়েছে ৯৭.৬০ শতাংশ। এই কেন্দ্রে তালুকদার পেয়েছেন ৯৯৭ ভোট ও মঞ্জু পেয়েছেন ৩৯০ ভোট। এভাবে আরো অনেক সেন্টারেই অস্বাভাবিক ভোট পড়ার কথা জানা গেছে।

এ দিকে ঢাকা সফরকালে মার্কিন দাতব্য সংস্থা ইউএসএআইডির প্রশাসক মার্ক গ্রিনকে সাথে নিয়ে রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট গত ১৬ মে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হকের সাথে বৈঠক করেন। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে গ্রিন ও বার্নিকাট ঊভয়েই গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। এ সময় সাংবাদিকেরা পর্যবেক্ষক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন জানাতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, খুলনার ভোটে যে বলপ্রয়োগ, ভোটারদের বাধাদান, ভাঙচুর এবং অনিয়মের যেসব ঘটনা ঘটেছে তার স্বচ্ছ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। পরবর্তী নির্বাচনের জন্য এটি করা জরুরি। অপর দিকে জাতিসঙ্ঘের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে জাতিসঙ্ঘ।

এরপরও কী করে ইসি বলে, খুলনার নির্বাচন হচ্ছে একটি ‘এক্সেলেন্ট অ্যান্ড পিসফুল’ নির্বাচন? আর সরকারি দলইবা কী করে বলে খুলনার নির্বাচন ‘শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন? এ নির্বাচন কমিশন দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন যে সুষ্ঠু হবে না, তা যে কেউ এখনই নিশ্চিত বলে দিতে পারে।


আরো সংবাদ

যুবকেরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে বরিশালে হাতপাখার বিজয় অবশ্যম্ভাবী বৈরী পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই দ্বীনকে বিজয়ী করতে হবে : মহানগর জামায়াত প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পেলেন ৩০২ জন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট নিরাপত্তাহীন হলে জাতির নিরাপত্তা কে দেবে : মুসলিম লীগ জাপা অসাংবিধানিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না : বাবলা সরকার দেশকে গভীর অন্ধকারের অনিশ্চয়তায় নিপে করেছে : সাইফুল হক ন্যায্য মজুরি বাস্তবায়নে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করতে হবে : অধ্যাপক পরওয়ার চট্টগ্রামে নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি জামে মসজিদ উদ্বোধন নরসিংদীতে বাস-লেগুনা সংঘর্ষে নিহত ৫ আহত ১০ বিএনপির রাজনীতিতে ভাটা চলছে : কাদের অনাস্থা ভোটে মোদির জয়

সকল