ঈদ-পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে গোয়াইনঘাট

মনজুর আহমদ, গোয়াইনঘাট (সিলেট)

ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদের আনন্দকে বাঁড়িয়ে তুলতে ভ্রমণ পিয়াসী মানুষ খোঁজে পর্যটনের জন্য সুন্দর, মনোরম ও নিরাপদ স্থান। ঈদের ছুটিতে প্রতি বছর পর্যটকদের ঢল নামে গোয়াইনঘাটের প্রত্যেকটি পর্যটন কেন্দ্রে। এক সময় এখানকার পর্যটন কেবল জাফলং কেন্দ্রীক ছিল। কিন্তু অল্প কয়েক বছরে গোয়াইনঘাটে আরো ৫/৬ টি পর্যটন কেন্দ্র আবিষ্কৃত হওয়ায় দেশের পর্যটকদের দৃষ্টি এখন গোয়াইনঘাটের দিকে। মেঘালয় জৈন্তিয়ার পাদদেশে গোয়াইনঘাট এমন একটি উপজেলা যার আনাচে কানাছে ছড়িয়ে রয়েছে দর্শনিয় স্থান।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটকবৃন্ধ সিলেট শহরে পৌছে প্রথমে দরগাহে হযরত শাহজালাল রঃ ও শাহপরান রঃ-এর মাজার শরিফ জিয়ারত করে পথ ধরেন প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ের উদ্দেশে। শাহপরান গেইট পার হয়ে কিছুদূর যাবার পর জালালাবাদ সেনানিবাস ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিঃ। শাহপরান গেইট থেকে হরিপুর পর্যন্ত গাড়িতে বসে বসে মহাসড়কের দু-ধারে সবুজ অরণ্য আর ছোট ছোট পাহাড় দেখে হৃদয়ে ভালো লাগার অনুভূতির সৃষ্টি করে। তখন মনে হয় ধীরে ধীরে যেন হারিয়ে যাচ্ছেন অচেনা কোনো রূপকথার রাজ্যে। হরিপুর অতিক্রম করার পর, সাপের মতো আকা বাকা পিচ ঢালা পথে ধরে ক্ষেপা নদী ও মেধল হাওরসহ অন্যান্য হাওর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চলার পথে মন হারিয়ে যায় দূরে বিলের পানিতে মিশে যাওয়া নীলাভ ওড়না জড়ানো আকাশের পানে। সারিঘাট পৌঁছানোর পর দেখা মিলবে বাংলার নীলনদ খ্যাত পাহাড়ী নদী সারী’র সাথে। যে নদীর পানির স্রোতে কখনো উজানে আবার কখনো বা ভাটির টানে চলে। নদীর একপাশে পানির রঙ আসমানী অন্য পাশে ধবল। নদীর মাঝে মাঝে ছোট্ট দীপের মতো ভেসে থাকা হাজার বছরের পুরনো শিলা। নদীর বাংলাদেশ সীমান্তে পর্যটকদের জন্য রয়েছে বিলাস বহুল নাজিম গড় রিসোর্ট। এসব দেখতে দেখতে একসময় গাড়ি পৌছে যাবে জাফলং পর্যটন এলাকায়। সেখানে জৈন্তাহিল রিসোর্টসহ পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার জন্য রয়েছে বেশ কিছু হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট। এখানে কোন পান্থশালায় বিশ্রাম নিয়ে যেতে পারেন জাফলং জিরো পয়েন্টে। জিরো পয়েন্টে প্রতিদিন ঢল নামে দেশ-বিদেশী পর্যটকদের। জিরো পয়েন্টে ঝুলন্ত ব্রিজের নিচে নানা রঙের পাথরে চিকচিক করা স্বচ্চ ও স্নিগ্ধ পানিতে রাজ হংসের ন্যায় গা ভাসাতে থাকেন পর্যটকরা। সেখানে একই স্থানে বাংলাদেশ ও ভারতের পর্যটকদের মিলেমিশে আনন্দ করতে দেখা যায়।

এর পর যেতে পারেন জিরো পয়েন্টের প্রায় ৫০ গজ পশ্চিমে খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়ের গায়ে রিমঝিম ছন্দে বহমান মায়াবী ঝর্ণায়। বিশাল এ ঝর্ণায় জলকেলিতে যুবক, যুবতী ও নানা বয়সীদের দেখা যায়। তার পর দেখতে পারেন আদিবাসী খাসিয়াদের বসতি সংগ্রাম পুঞ্জি, নকশিয়ার পুঞ্জি ও লামা পুঞ্জি। পুঞ্জিতে মাঁচার উপর খাসিয়াদের ঘর ও পানসুপারি বাগান দেখে পৌছে যাবেন বিশ্বের সর্ববৃহত সমতল চা উৎপাদক জাফলং চা-বাগানে। তারপর জাফলংয়ে পান্থশালায় ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নেয়া এবং কেনাকাটা করতে পারেন। গোধুলী লগ্নে জাফলং ভিউ রেষ্টুরেন্টসহ আশপাশ এলাকায় উপভোগ করা যায় বৈকালী পাহাড়ী সমীরণ। পরদিন পান্থশালা থেকে বের হয়ে পাহাড়ের বুকে ছোট বড় অসংখ্য ঝর্ণা দেখে দেখে যেতে পারেন সাত পাহাড়ের গহিনে পাথরের উপর জলের নৃত্য উপভোগ করতে বিছনাকান্দির উদ্দেশ্যে। বিছনাকান্দি যাবার পথে দেখে যেতে পারেন দেশের ১১ শ' ৬০ একর জমি নিয়ে বিস্তৃত দেশের সর্ববৃহত জলার বন ‘মায়াবন’। সারিঘাট থেকে বিছনাকান্দির পথে ৮ কিলোমিটার অতিক্রম করার পর দেখা মিলবে লেকের মতো মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন বেখরা খাল। বেখরা খাল ধরে পানসি নৌকায় চড়ে ৫ মিনিট সামনে এগোলেই পৌছে যাবেন মায়াবনে। ছোট ডিঙ্গি নৌকায় বৈঠা বেয়ে বনের ভেতরে যেতেই কানে আসবে পাখপাখালির কল-কাকলি, জলের কলকল শব্দ। এখানে আছে মাছরাঙ্গা, বিভিন্ন প্রজাতির বক, ঘুঘ, ফিঙ্গে, বালিহাস, টুনটুনি, পানকৌড়িসহ নানা প্রজাতির পাখি। বন্য প্রাণির মধ্যে আছে উদবিড়াল, কাঠবিড়ালি, শিয়াল, ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রজাতির গুইসাপ, নানা ধরণের সাপের অভয়াশ্রমও এই বনে রয়েছে। মায়াবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে অবশ্যই নিঃশব্দে যেতে হবে। কোন রকম শোর-গোল, চিৎকার, চেচামেচি করলে এর প্রকৃত সোন্দর্য কোন ভাবেই উপভোগ হবেনা। নিরবে ঘুরলে বনে ঘুঘু, ডাহুক কুহুতান ও নানারকম বন্যপ্রাণির সাক্ষাৎ মেলে। পানসিতে চড়ে মায়াবনে ঘুরে ঘুরে পানির নিচে হিজল তমালের মায়াময় নৃত্য দেখে হৃদয়ে মায়াবী আবেশের সৃষ্টি হয়। গভীর এ অরণ্যে ভ্রমণ করতে করতে এক সময় দেথা পাবেন নানা রঙের শাপলা ও জলফুলে ভরা বিশাল পানির ভণ্ডার কুরুন্ডি বিল।

মায়াবন ভ্রমণের পর ফের গাড়িতে চেপে রওয়ানা দিতে পারেন বিছনাকান্দির উদ্দেশ। একই রাস্তা দিয়ে গোয়াইনঘাট হয়ে বিছনা কান্দির উদ্যেশে যাত্রা। সেখাখে পীরেরবাজার, লামাবাজার ও হাদারপারবাজার ৩টির যেকোন স্থানে নামতে পারেন। সেখান থেকে ইঞ্জিন চালিত ছোটবাড় নৌকা দিয়ে মিনিটি ২০/২৫ এর মধ্যে পৌছে যাবেন সাত পাহাড়ের মিলন মেলা বিছনাকান্দিতে। এবার ফেরার পথে বাংলার ২য় সুন্দরবন না দেখলেত নয়। ফিরে আসেন গোয়াইনঘাট, একটু সামনে এসে হাতিরপাড়া-মানিকগঞ্জ সড়কদিয়ে প্রবেশ করুন রাতারগুলের তীরবর্তী ফতেপুর। একটু সামনে গিয়ে রাতারগুলঘাট থেকে নৌকাযুগে পৌছে যান স্বপ্নের সুন্দরবন রাতারগুল। এসব পর্যটনকেন্দ্রে দিনে দিনে পর্যটক সমাগম বৃদ্ধি হচ্ছে। এতে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন দর্শনীয় স্থান সংরক্ষণ ও ঈদকে সামনে রেখে পর্যটকদের নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যাবস্থা গ্রহণ করেছে।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সালাহউদ্দিন জানান ইতিমধ্যে জনপ্রতিনিধি, আইনশৃংখলা বাহিনী, সাংবাদিক ও সুধীজন নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছি। ওসি গোয়াইনাট মোঃ দেলওয়ার হোসেন জানান পর্যটকদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছি। যাতে করে পর্যটকটার নিরাপধেদ ফিরতে পারে সেদিকে আমরা খেয়াল রাখব।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.