রিমঝিম বর্ষা

মঈনুল হক চৌধুরী

ষড়ঋতুর দেশ আমাদের সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ। বাংলা ‘আষাঢ় ও শ্রাবণ’ এই দুই মাস নিয়ে ‘বর্ষাকাল’। এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট্য বৃষ্টি ঝড়া আকাশ, কর্দমাক্ত মাঠ, নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা পানিতে পরিপূর্ণ হওয়া, গাছপালার সতেজ রূপ, গরম আবহাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।
জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে গাছে গাছে ‘কদম ফুল’ ফোটে। জানিয়ে দেয় ‘বর্ষা’ আসছে। বর্ষার সাথে কদমের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কদম ছাড়া বর্ষার রূপ বর্ণনা করা যায় না। এ সময় বাতাসে ভেসে আসে কদমের গন্ধ। কদম ফুটলেই মানুষ বোঝে যে বর্ষা এসেছে। হলুদ সাদা মিশ্রিত কদম ফুলের হাসি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আকৃষ্ট করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কদম ফুল নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে এ দেশের ৮০ ভাগ মানুষ। বর্ষায় আমন ধানসহ অন্যান্য ধান ও বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ করা হয়। বৃষ্টির পানিতে পাটগাছগুলো বড় হয়ে ওঠে। বর্ষার পানি পেলে পাটের আবাদ ভালো হয়। এ ছাড়াও এ ঋতুতেই এসব অর্থকরী ফসল ফলাতে হয়। তাই বর্ষা অতি প্রয়োজনীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঋতু।
বর্ষায় আমনের ক্ষেত কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়, নিয়ে আসে সুখ-শান্তি ও প্রগতি। বর্ষা মওসুমে যখন চার দিক ভিজে ওঠে তখন আমাদের মনও হয় সিক্ত। আমরা হয়ে উঠি মনে-মননে বর্ষামুখর। এ ঋতুর বিচিত্র রূপ শহর ও গ্রামে ভিন্ন ধরনের। সাধারণত গ্রামে বর্ষার শোভা অতুলনীয়। কারণ এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ মাঠ-ঘাট প্রান্তর এক সবুজ শ্যামল গাছপালা ও ঝোপঝাড়। যেন ফিরে পায় তরতাজা নতুন জীবন। বর্ষাকে ঘিরে নানা ধরনের খেলাধুলা দেখা যায় গ্রামে। যেমন কাবাডি খেলার মূল সময় কিন্তু বর্ষাকালেই। বর্ষার সময়টাতে মাটি থাকে ভেজা কর্দমাক্ত। আজ হয়তো কৃত্রিম উপায়ে অ্যাস্টোটার্ব মাঠে কাবাডি খেলা হয়। কিন্তু যুগ যুগ ধরে আমাদের গ্রামগঞ্জে বর্ষা মওসুম শুরু হতেই তরুণ যুবক, বৃদ্ধরাও লুঙ্গি কাছা দিয়ে নেমে গেছে কাবাডি খেলায়। বর্ষাকে ঘিরে আবার বেশ কিছু পেশা সজীব হয়ে উঠে। যেসব নিচু ভূমিতে শুকনো মওসুমে পানি থাকে না সেসব ভূমি বর্ষা এলেই পানিতে ভরে ওঠে। এটাই আমাদের প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য। হাঁটা পথগুলো সব বর্ষার পানিতে ডুবে যায়। ফলে এসব ভূমি দিয়ে এক গ্রামের সাথে আরেক গ্রামের নিকটতম হাটবাজারের যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় পানি বাহন নৌকা।
‘আষাঢ়-শ্রাবণ’ দুই মাস বর্ষাকাল হলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এর পরেও বর্ষার প্রভাব থাকে। থাকে বৃষ্টিপাত। ফলে বর্ষা আর শরৎ যেন একাকার হয়ে যায়। হেমন্তে কার্তিক মাসে পানি সরে যাওয়ার পর তে পাথার যখন আবার জেগে ওঠে তখনই আসলে বর্ষার প্রভাব শেষ হয় প্রকৃতি থেকে। বর্ষায় প্রকৃতির সতেজ-সজীব রূপ-রস যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয় জয় করে এসেছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সব আবর্জনা ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে। বন্যার পানি পলিমাটি বয়ে এনে দেশকে করে সুজলা-সুফলা। তাই তো বর্ষা ঋতু আমাদের কাছে এত ঐশ্বর্যশালী। তাই ষড় ঋতুর মাঝে বর্ষা ঋতু বাঙালির অন্যতম প্রিয় ঋতু।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.