রাতুলের স্বপ্ন

আব্দুস সালাম

রাতুল রাজধানীর একটি ভালো স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। বাসা থেকে স্কুল অনেকটা দূরে। খুব সকালে বাবার সাথে স্কুলের উদ্দেশে বের হয়। বাবা অফিসে যাওয়ার পথে রাতুলকে স্কুলগেটে নামিয়ে দেন। আর স্কুল ছুটির পর মা স্কুলগেট থেকে তাকে বাসায় নিয়ে আসেন। স্কুলে যাওয়া-আসার সময় তাদের প্রায়ই দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে নিতেও তার বেশ খানিকটা সময় চলে যায়। এ কারণে স্কুল শুরু হওয়ার ঘণ্টা দুয়েক আগেই রাতুলকে বাসা থেকে বের হতে হয়। তাই সকাল বেলায় সে ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারে না। রাতের তৈরি পড়া নিয়েই স্কুলে যেতে হয়।
রাতুল ছেলেবেলা থেকেই একটু ভাবুক স্বভাবের। কিছু দেখলে সেগুলো নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে থাকে। আর সেগুলো নিয়ে তার মনের মধ্যে উঁকি দেয় নানান ধরনের প্রশ্ন। উত্তর জানার জন্য মা-বাবাকে সারাণ প্রশ্ন করতে থাকে। এর ফলে মাঝে মাঝে তারাও বেশ বিরক্ত হয়। কোনো কোনো সময় তাকে ধমকও দেন। তারপরও সে প্রশ্ন করা থেকে ান্ত হয় না। এই যেমনÑ বিমান আকাশে ওড়ার সময় মাটিতে পড়ে যায় না কেন, মাছ পানির ভেতর কিভাবে শ্বাস নেয়, রোবট কিভাবে কথা বলে, বিজ্ঞানীরা কোন জিনিস কিভাবে আবিষ্কার করল, এটা আবিষ্কার হয়েছে কি না বা ওটা আবিষ্কার হয়েছে কি না ইত্যাদি ইত্যাদি। আর পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সে কম্পিউটারে সায়েন্স ফিকশান, বিশ্বের আশ্চর্য ঘটনা ও বিভিন্ন দৃশ্যাবলি দেখে থাকে।
এই তো কয়েক দিন আগে স্কুলে যাওয়ার সময় সড়কপথে রিকশাতে রাতুল ও তার বাবাকে অনেকণ বসে থাকতে হয়। তখন স্কুলের সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। কী আর করাÑ কোনো উপায় না দেখে তারা রিকশা থেকে নেমে হাঁটা শুরু করে। রাতুল তার বাবাকে প্রশ্ন করে : বাবা উড়ন্ত চেয়ার কিনতে পাওয়া যায় না? যাতে বসে আমরা খুব সহজেই স্কুলে যেতে পারব। না, এখনো উড়ন্ত চেয়ার আবিষ্কার হয়নি। তুমি বড় হলে এটি আবিষ্কার করতে পার কি না চেষ্টা করে দেখ। বাবা উত্তর দেন। বাবার উৎসাহ রাতুলকে বেশ অনুপ্রাণিত করে। সে মনে মনে ইচ্ছা পোষণ করে যে, বড় হলে সে বৈজ্ঞানিক হবে। স্কুল থেকে বাসাতে এসে রাতুল বিকেল বেলায় ছাদের ওপর ওঠে। আকাশে কয়েকটি বিমান ও হেলিকপ্টার উড়তে দেখে। উড়ন্ত চেয়ার নিয়ে সে মনে মনে অনেক কল্পনা করতে থাকে। তারপর সন্ধ্যার আগে বাসায় ঢুকে পড়তে বসে। যথারীতি পড়াশোনা করে রাতে ঘুমাতে যায়।
ঘুমের মধ্যে রাতুল অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে। সে দেখে, দিনে দিনে রাতুল দেশের একজন নামকরা ুদে বিজ্ঞানী হয়ে যায়। দেশ-বিদেশে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার জন্য সে সুন্দর একটি উড়ন্ত চেয়ার আবিষ্কার করেছে। চেয়ারটি সূর্যের আলোতে চার্জ হয়। চেয়ারের হাতলে তিনটি বাটন আছে। প্রথম বাটন চাপলে চেয়ারটি শূন্যে উঠে যায়, দ্বিতীয় বটনটি চাপলে সামনের দিকে চলতে থাকে আর তৃতীয় বাটনটি চাপলে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে থাকে। চেয়ারটি আবিষ্কার করতে পেরে রাতুল খুব খুশি। দেশ-বিদেশের লোকেরা তাকে একনামে চেনে। উড়ন্ত চেয়ারে চড়ে সে ছুটির দিনে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে বের হয়। সে চেয়ারে চড়ে পাহাড়ের ওপরে উঠে যায়। গাছের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। নানান ধরনের পাখির সাথে তার দেখা হয়। পাখিরা ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ায় আর রাতুল উড়ে বেড়ায় তার আবিষ্কৃত চেয়ারে করে। এই চেয়ারে বসেই সে সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। কখনো আবার মরুভূমির ওপর দিয়ে উড়ে যায়। এভাবে মনের আনন্দে সে আকাশে উড়তে থাকে। যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারে। রাতুল একদিন গভীর বনের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। উড়তে উড়তে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। তখন তার বাসার কথা মনে পড়ে। তখন সে দ্রুত বাসার দিকে ফিরতে থাকে। এমন সময় হঠাৎ তার চেয়ারের চার্জ শেষ হয়ে যায়। কী আর করাÑ বনের মধ্যেই তাকে অগত্যা নামতে হয়।
বনটি অন্ধকার। বনের মধ্যে ভয়ঙ্কর সব পশুপাখির বাস। তাদের দেখে রাতুল ভয় পেয়ে যায়। একটি অদ্ভুত ধরনের পশু রাতুলকে দেখে তাড়া করে। সে ভয়ে অস্থির হয়ে পড়ে। জান বাঁচানোর জন্য পালাতে থাকে। কিন্তু পশুর সাথে সে পেরে ওঠে না। একপর্যায়ে সে চিৎকার করে কান্না শুরু করে। তার কান্না শুনে রাতুলের মা-বাবার ঘুম ভেঙে যায়। সাথে সাথে রাতুলও উঠে পড়ে। তার গা ঘামে ভিজে যায়। রাতুলের মা তাকে বলেন : ‘তোমার কী হয়েছে, বাবা?’ ‘আমি এখানে কেন? আমাকে তো ভয়ঙ্কর একটি পশু তাড়া করেছে। আমার উড়ন্ত চেয়ার কোথায়?’ রাতুল মায়ের কাছে জানতে চায়। তার বাবা বললেন : ‘শোন। তুমি এতণ স্বপ্ন দেখছিলে। তোমার কোনো ভয় নেই। এই তো আমরা তোমার কাছেই আছি। তা বলো কী স্বপ্ন দেখছিলে?’ রাতুল একটু স্বাভাবিক হওয়ার পর তার দেখা স্বপ্নের কথা মা-বাবাকে জানায়। মা-বাবা স্বপ্নের কথা জেনে খুশি হন। তারা রাতুলের মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। তারা বলেন : তোমার স্বপ্ন একদিন সত্যি হবে। সত্যি সত্যিই তুমি বড় বৈজ্ঞানিক হবে। এখন ঘুমাও। রাত অনেক বাকি। বৈজ্ঞানিক হওয়ার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে রাতুল আবার ঘুমাতে যায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.