অলঙ্করণ : হামিদুল ইসলাম
অলঙ্করণ : হামিদুল ইসলাম

শাওনদের অভিযান

মোহাম্মদ আব্দুল্লা হেল বাকী

লাল গাভীটা হাম্বা রবে হঠাৎ দৌড় দিলো। শাওনের চোখ পড়ল গাভীটার ওপর। একে একে সবাই তাকাল গাভীটার দিকে। শাওনদের বাড়ির সামনে দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠ। স্কুল থেকে ফেরার পর এই মাঠেই নানা খেলাধুলায় মেতে ওঠে শাওন, ডিউক, রিফাত আর হিজলরা। মাঠের পশ্চিম পাশের একটা অংশ টিলার মতো উঁচু। জায়গাটা গামাইর, কড়ই, শেওড়া আর বিভিন্ন ঝোপঝাড়ে ছাওয়া। নিচে অনেক বড় বড় উইঢিবি। গ্রামে জায়গাটা ময়নাটিলা নামে পরিচিত। কেন এর নাম ময়নাটিলা কেউ বলতে পারে না। হয়তো একসময় এখানে ময়নাপাখি পাওয়া যেত। কিংবা এই টিলাটার মালিক ছিল ময়না নামে কেউ। এখানে প্রায় সারা বছর গরু-ছাগল চরে বেড়ায়। বুনো পাখিদের বসবাসের সুন্দর জায়গা এটা। সকাল-সন্ধ্যা পাখিদের কলরবে মুখরিত থাকে। মাঝে মাঝেই লম্বা লেজঅলা শিয়াল বের হয়ে গ্রামের দস্যি ছেলেপুলেদের আনন্দের খোরাক জোগায়।
শাওন বলল, গাভীটা দৌড় দিলো কেন? নিশ্চয় কোনো কিছু দেখেছে। সাপ-খোপ হবে হয়তো। হিজল বলল, ‘গরুরা নাকি অনেক অদৃশ্য জিনিসও দেখতে পারে।’ ডিউক আর রিফাত বলল, ‘চল, গিয়ে দেখে আসি।’ গাভীটা অন্য প্রান্তে গিয়ে ঘাস খাওয়ায় মগ্ন। তারা গিয়ে দেখল, গরুর সামনের দুটি পা ডেবে যাওয়ার চিহ্ন। অনেক বড় গর্ত হয়ে গেছে। পা ডেবে এত বড় গর্ত হওয়ার কথা নয়। মনে হয় কোনো সুড়ঙ্গের মুখ বের হয়েছে। শাওন বলল, এখানে নিশ্চয়ই কোনো সুড়ঙ্গ আছে। এখানে অনেক গুপ্তধন থাকতে পারে। সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। তাদের চোখে-মুখে একটি বিস্ময়, একটি কৌতূহল, একটি ভয়। শাওন সবার দিকে তাকিয়ে কণ্ঠ একটু নিচু করে বলল, ‘চল, বাড়ি থেকে কোদাল আর খন্তা নিয়ে আসি।’

অভিজ্ঞ প্রতœতত্ত্ববিদের মতো খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করল। শাওন কোদাল দিয়ে কোপানো শুরু করল। তার পেছনে সবাই উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু খোঁড়ার পর কোদালে কোপ দিতেই খট করে একটা শব্দ হলো। সবার উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে গেল। শাওন আরো মনোযোগী হয়ে খোঁড়া শুরু করল। একটি সিঁড়ির একটি অংশ বেড়িয়ে এলো। রুপার রুপস সিঁড়ি। ঝকঝকে সুন্দর। তাদের বিস্ময়ের মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। হার্টবিট বেড়ে গেল। ডিউক বলল, ‘খোঁড়া বন্ধ করো। মাটি দিয়ে ঢেকে রাখ। কেউ দেখে ফেলবে। আমরা রাতে খনন করব।’ শাওন বলল, ‘কিছু হবে না। গামারের ডাল কেটে খোলা জায়গাটায় ফেলে আড়াল তৈরি করো। ডিউকরা তা-ই করল। ডাল ফেলে আড়াল তৈরি করা হলো। আবিষ্কারের নেশা তাদের পেয়ে বসেছে। গভীর কৌতূহল নিয়ে খোঁড়া শুরু করল। সিঁড়ি ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। যত এগোচ্ছে তত নতুন চমকে চমকাচ্ছে। সিঁড়ির গোড়ায় বাঁ-দিকে অর্থাৎ পশ্চিম দিকে একটা রুপার গেট। গেটের দু’পাশে সোনার পাতে আঁকা দু’জন বালিকার ছবি; কলসি কাঁখে হেঁটে যাচ্ছে। বোঝা যায় কোনো কুশলী হাতের কাজ। গেটের ওপর বড় করে লেখা জলনীলিকা। সেই গেট দিয়ে একটু সামনে যেতেই সবচেয়ে বড় বিস্ময়টা চোখে পড়ল। অনেক বড় একটা খাল। টলটলে জল। মনে হচ্ছেÑ এক স্রোতস্বিনী। খালের এক পাশে ছোট্ট একটা সোনার ডিঙি নৌকা। রুপার বৈঠা। দেখে মনে হচ্ছে, তারা কোনো রূপকথার জগতে প্রবেশ করেছে। এ রকম কল্পকাহিনী তারা অনেক শুনেছে। তাই বলে বাস্তবে এর মুখোমুখি হবে! কোনো বিলাসী লোক এসব করে রেখেছে!

সূর্য কখন পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে কারো খেয়াল নেই! এখনি রাতের কালো চাদরে নিজেকে লুকোবে। চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। হঠাৎ তাদের সম্বিত ফিরে এলো। ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার মতো সবাই জেগে উঠল। এতণ তারা এক ঘোরের মধ্যে ছিল। তারা ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। তাদের চোখে-মুখে এক ধরনের অস্থিরতা ও আতঙ্ক। হিজল বলল, ‘চল, আমরা নৌকা আর বৈঠা নিয়ে ভাগি। আমরা যেহেতু পেয়েছি এ সম্পদ আমাদেরই।’ শাওন একটু ধমকে উঠল। বাজে কথা বলবি না। মাটির নিচে যে সম্পদ পাওয়া যায়, তার মালিক সরকার। আমাদের উচিত বিষয়টা পুলিশকে জানানো। রিফাত বলল, ‘কাল সকালে আমরা থানা এবং পত্রিকা অফিসে খবর দেবো। চল, এবার বাড়ি যাই।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.