আমি সুন্দর ও শান্তিময় পৃথিবী চাই : জান্না জিহাদ

ভিন দেশ
মো: আবদুস সালিম
জান্না বলেন, ‘পশ্চিম তীর ও তার অপর পাড়ে ইসরাইল অধিকৃত বাহিনীর জুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমি দেখেছি, হানাদার বাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে সৈন্য, কামান, পুলিশ ইত্যাদি। তারা আমাদেরকে মাতৃভূমি থেকে উৎখাতের জন্য এমন কিছু নেই যা করেনি’। কঠিন এই শপথ নিয়েছেন মাত্র ১০-১১ বছর বয়সী ফিলিস্তিনির এক সাংবাদিক। গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, এই জান্না ফিলিস্তিনির সবচেয়ে কম বয়সী মেয়ে সাংবাদিক। তিনি মনে করেন, সাংবাদিক পেশায় কাজ করা মানে শুধু সংবাদ প্রকাশ করানোই নয়, বরং দুর্নীতি, অনিয়ম, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। জান্নার পুরো নাম জান্না জিহাদ আইয়াদ। জান্না নিজেকে বিশ্বের খুদে সাংবাদিকদের একজন মনে করেন। অল্প বয়সী জান্না ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের নবী সালেহ নামক গ্রামের অধিবাসী। তার প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর স্থানীয় আরো ছেলেমেয়েদের শুধু নয়, বড়দেরকেও অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে।
মাত্র সাত বছর বয়সেই জান্না তার গ্রামে কী ঘটেছে তা ভিডিও করেন। অথচ তিনি দেখছেন, ফিলিস্তিন থেকে অনেক সাংবাদিক বহির্বিশ্বে ঘটনার বিষয়গুলো ছাপানোর প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি তা নিয়ে যেন মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। তার গ্রামে শুধু নয়, অন্যান্য স্থানেও সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে বর্বরতার ঘটনা বা বিষয়গুলো গণমাধ্যমে চলে আসার জন্য দিনরাত কাজ করতে থাকেন। এ প্রসঙ্গে জান্না বলেন, এসব বিষয় আমি গণমাধ্যমকে জানিয়ে দিয়েছি। যাতে বিশ্বের মানুষ মানবতাবিরোধী ঘটনাগুলো জানতে পারে।
জান্নার চাচা বিল্লাল তামিনি একজন ফটো সাংবাদিক। যিনি ইসরাইলি সৈন্যদের দ্বারা সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন চালানোর ভয়াবহতা রেকর্ড করেন। এই চাচাই জান্নার এসব নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস। তামিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের এই কঠিন সঙ্কটে নীরব থাকার শিক্ষা দিতে পারি না মোটেই। স্বাধীনতার জন্য তারা অবশ্যই ঝাঁপিয়ে পড়–ক।’ তার চাচাতো ভাই মোস্তফা তামিনি এবং অপর এক চাচা রুশদি তামিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে শহীদ হন। এখন এ সংক্রান্ত সব বিষয় নথিভুক্ত করার গুরুদায়িত্ব বর্তায় জান্না জিহাদের ওপর। গণহত্যার ব্যাপারে সন্ত্রাসীরা গ্যাস ক্যানস্টার ব্যবহার করে। শরীরের নাজুক জায়গায় আঘাত করেও মানুষ হত্যা করা হয়। এসব অনাচার দেখে সহ্য করতে পারেননি জান্না। ফলে তিনি বাড়িয়ে দিতে থাকেন তার এ সংক্রান্ত কাজের পরিধি। তার মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে জেরুসালেম, নেবলাস ও জর্দানে ঘুরে ঘুরে এ সংক্রান্ত অনেক ঘটনা ভিডিও করেন। তার এই ভিডিও ফুটেজ থেকে বিশ্ববাসী দেখেছে, চেকপোস্টে লোকজনকে কিভাবে আটকে রাখা হয়েছে, কিভাবে প্রতিবাদ মিছিল চলছে এবং কিভাবে ফিলিস্তিনের নানা বয়সী মানুষের ওপর বর্বরতা চালানো হচ্ছে। সিনিয়র সাংবাদিকদের অন্যায়ভাবে আটক করে ক্যামেরা, আইডি কার্ড ইত্যাদি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। এসব দেখে জান্না নিজেকে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে ঘোষণা দেন। ফলে হাজার হাজার মানুষ তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি আরো মনে করেন, অল্প বয়সী সাংবাদিক হিসেবে সিনিয়র সাংবাদিকদের ওপর তার কমবেশি অগ্রাধিকার রয়েছে। কাজের ক্ষেত্রে জান্না তাদের সাথেও হাত মেলান। তিনি মনে করেন, তাতে এ সংক্রান্ত কাজ অধিকতর ভালো হবে।
জান্নার ফেসবুক পাতায় অনেক ভিডিও ছবি রয়েছে, যেখানে দেখা গেছে ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে সরাসরি পাল্টা আক্রমণের ছবিও তুলেছেন জান্না ও তার অনুসারীরা। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে ছুটে বেড়াতে দেখা গেছে জান্নাকে। মাথায় হেলমেট দিয়ে রাজপথে বের হতে দেখা গেছে, যাতে শত্রুদের আক্রমণ থেকে কমবেশি নিস্তার পাওয়া যায়। জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদের সামনে তাকে জনসমক্ষে গুরত্বপূর্ণ বক্তব্য দিতেও দেখা গেছে। জান্নার সংবাদ পরিবেশিত হয় আরবি ও ইরেজিতে। জান্না সজোরে বলেন, ‘আমার ক্যামেরা তাদের কামানের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। এ শক্তি আমি পেয়েছি জনগণের কাছ থেকে। আমি ছোটদের কাছেও বার্তা পাঠাতে পারি, যে বার্তা তারা আরো অনেকের কাছে পাঠাতে পারে।
জান্নার মা নেওয়াল তামিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে নিয়ে এক দিকে আমি যেমন গর্ব করি, অপর দিকে তার নিরাপত্তার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করি। সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো ওর বাণী পৌঁছে যাচ্ছে সারা বিশ্বে। আমার মেয়ে অপর ছেলেমেয়েদের ভয়ভীতি নিয়েও চিন্তা করে। বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের হাজিরাসংক্রান্ত সমস্যা নিয়েও ভাবে।’ এমন সব কথা তিনি বলেছেন গণমাধ্যমের কাছে। তার মা বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে বা করতে গেলে তারা সাধারণ মানুষের ওপরও বর্বরতা চালায়। তাদের ছোড়া টিয়ারগ্যাসের কারণে আতঙ্ক দেখা দেয়। মানুষ ছোটাছুটি করে দিগি¦দিক।
জান্নার চাচা বিল্লাল বলেন,‘ জিন্না যা করেছে তা মেনে নেয়া কঠিন। কারণ জিন্নার বয়সটা লেখাপড়া ও খেলাধুলার। কিন্তু আমাদের জীবনে তা গ্রহণ করার সুযোগ কই? তার পরও আমাদের ছেলেমেয়েদের অপমান মেনে নেয়া ও কাপুরুষ হওয়ার শিক্ষা দেবো না। স্বাধীনতার জন্য পাল্টা জবাব কিভাবে দিতে হয় সেই শিক্ষা দেবো। আপনি কেমন বিশ্ব আশা করেনÑ এমন প্রশ্ন জান্নাকে করা হলে তিনি বলেন, ‘আই ওয়ান্ট ইট টু বি পিংক।’ অর্থাৎ আমি সুন্দর ও শান্তিময় এক পৃথিবী চাই। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে জান্না ফরিয়াদ করেন এই বলে যে, হায় আল্লাহ, ফিলিস্তিনিদের শান্তি ও নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করো।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.