নারীরা কর্মজীবী হোক

রায়হান রাশেদ
আজ থেকে দশ বছর আগের কথা। স্ত্রী হয়ে মুনীর মিয়ার ঘরে আসে খাদিজা। মেহনতি মানুষের সংসার। কাজকর্ম করে কোনো রকম সংসার চলে তাদের। উপলক্ষ ছাড়া বাড়তি কোনো খাবারের আয়োজন থাকে না। রোজ এনে রোজ খায়। কাজে না যেতে পারলে কোনো বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। আয় করার কথা তাদের মাথায় উদয়ই হয় না। আয় করবে কী করে, প্রয়োজন মেটাতেই খাবি খেতে হয়। সংসারজীবনের নিয়মে দুই বছর পর ঘর আলো করে অতিথি হয় কন্যাসন্তান।
অভাব অনটনে যাপিত হয় দাম্পত্যজীবনের ছয় বছর। খাদিজা চিন্তা করতে থাকে জগৎসংসার নিয়ে। ঘুরতে থাকে চিন্তার ভিন্ন পৃথিবীতে। ভাবে, কিভাবে উন্নতি করা যায় এ জীবনের। পাশের বাড়ির এক মহিলাকে বহু কষ্টে বলেকয়ে রাজি করিয়ে হাতে নেয় সেলাই মেশিন। ভদ্রমহিলা ঘরের কাপড় ছাড়া অন্য কারো কাপড় সেলাই করেন না। কারণ তার নেই কোনো পেটের দায়। খাদিজা দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে শিখতে থাকে সেলাই শিল্প। পরিবারের কাজ কোনো রকম গুছিয়ে পাঁচ বছরে পদার্পিত মেয়েকে প্রাইমারিতে পাঠিয়ে ছুটে যায় ভদ্র মহিলার বাড়ি। ভদ্রমহিলা খাদিজার অভাব দুরবস্থা বুঝে তার ওপর করুণা করেন। কোনো রকম মাইনে ছাড়াই তিন মাসের মধ্যে শেখা হয়ে যায় সেলাইয়ের কাজ। 
কাজ শেখার পাট শেষে খাদিজার জন্য চাই একটা মেশিন। কিন্তু নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় তারা আবার মেশিন কিনবে কী দিয়ে? টাকার কাজ তো আর কথায় চলে না। অনেক বলে-কয়ে চার-পাঁচজন থেকে পাঁচশত টাকা করে ধার নিয়ে কেনে সেলাই মেশিন। প্রচার-প্রসার করতে থাকে সাধ্যমতে। সেলাই করতে থাকে মন দিয়ে। নিখুঁতভাবে। দিনরাত মেহনত করে পার করতে থাকে সময়। অল্প সময়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে খাদিজা। ছয় মাসের ভেতর মানুষের পাওনা পরিশোধ করে একটু মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। এখন সে একটি স্বতন্ত্র মেশিনের মালিক। 
নিজের পরিশ্রম এবং মনের জোর আর কষ্টোপার্জিত মেশিনের সমন্বয়ে এগোতে থাকে খাদিজার পৃথিবী গড়ার ইতিহাস। পরিবর্তনের অভূতপূর্ব ছাপ পড়তে থাকে খাদিজার জীবনে। যেন হারিয়ে যাওয়া অন্ধকার সমুদ্দুরে ফিরে পাওয়া বন্দরের ক্ষীণ আলোর রেখা। মাস কয়েক পর সচ্ছলতা নেমে আসে খাদিজার জীবনের অলিগলিতে। এলাকার সব মানুষ কাপড় সেলাইয়ে ছুটে আসেন তার কাছে। তার ব্যবহার ও ভালো কাপড় সেলাইয়ের প্রশংসা সবার মুখে। মানুষের ছুটে আসা ও ভালোবাসা পেয়ে খাদিজা আজ বড় আনন্দিত এবং আন্দোলিত। 
তার সংসারে জমা হতে থাকে আয়ের উৎস। বেঁচে যাওয়া টাকা জমতে থাকে অল্প অল্প করে। অভাব তার বাড়ি চাতাল উঠোন ছেড়ে চলে গেছে অনেক দূরে। খাদিজার দিনকাল চলতে থাকে সুখের মাঝে। 
কথা হয় খাদিজার সাথে। তার কাজ নিয়ে। তার অভাব অনটন দূরে ঠেলে জয় হওয়ার গল্প নিয়ে। সে বলে তার জীবনের কথা। স্মৃতির কথা। ‘আমার সংসার অভাবের ছিল। ঠিকমতো খাবার থাকত না ঘরে। ভালো রান্নার কল্পনাও করতে পারতাম না। পরে মনোয়ারা আপার কাছ থেকে সেলাইয়ের কাজ শিখি। তিনি খুব ভালো মানুষ। সেলাই মেশিন আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। আমার অভাব দূর করেছে। আমাকে সচ্ছলতা দান করেছে। সব আল্লাহর রহমত।’ অন্য নারীদের উদ্দেশে সে বলে, ‘আমি চাই নারীরা কর্মজীবী হোক। সাধ্যমতো কাজ করুক। বাড়িতে বসে সেলাই মেশিনে কাজ করুক। ঘরের ভেতরে থেকে যে কোনো কাজ করা যেতে পারে। আমরা নারী। আমরা জয় করব নতুন কিছু।’

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.