সর্বগ্রাসী এ অবক্ষয় রুধিবে কে?

এম. আবদুল্লাহ

দেশে সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় মনে হচ্ছে সর্বগ্রাসী রূপ নিচ্ছে। নিচ্ছে না বলে নিয়েছে বলাই বোধহয় যথার্থ হবে। পত্রপত্রিকা, সম্প্রচার মাধ্যম ও ডিজিটাল গণমাধ্যমে চোখ রাখলে রীতিমতো শিউরে উঠতে হচ্ছে। এমন সব ঘটনা বাস্তবে ঘটছে, যা কল্পনাকেও হার মানাচ্ছে। অবনতিশীল পরিস্থিতি অনুধাবনেও মনে হচ্ছে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। গত কয়েক দিনে গণমাধ্যমে উঠে আসা কয়েকটি চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ঘটনায় দৃষ্টিপাত করলে লজ্জায়, ঘৃণায় মাথা নুয়ে পড়ছে।
১১ জুলাই রমনা থানায় একটি ধর্ষণের মামলা রুজু হলো। ধর্ষণজনিত অপরাধে মামলা হওয়া এখন আর কোনো আলোচ্য বিষয় নয়। হরহামেশাই দেশজুড়ে ঘটছে এই অনাচার। কিন্তু আলোচ্য মামলার বাদি আর আসামির মধ্যকার সম্পর্কের কথা জেনে স্তম্ভিত হতে হয়েছে। ধর্ষণের শিকার বিশ বছর বয়েসী মেয়েটি আসামি করেছে তার সৎ বাবা আরমানকে। অভিযোগ বিগত আট বছর ধরে ওই নরপশু তার স্ত্রীর আগের সংসারের মেয়ের ওপর যৌন নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। অসহায় ওই মেয়ে বাধা দিয়ে এমনকি বাসা ত্যাগ করেও রেহাই পায়নি। শুধু তাই নয়, যৌন নিপীড়নের ভিডিও এবং স্থিরচিত্র ধারণ করে অনলাইনে ছেড়ে মেয়েটিকে তার বন্ধুদের কাছে হেয় করার চূড়ান্ত নোংরা পথও বেচে নিয়েছে বিকারগ্রস্ত আরমান।
মামলা রুজুর দুই দিনের মাথায় পুলিশ ধর্ষক আরমানকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয় এবং জিজ্ঞাসাবাদে সে অকপটে স্বীকার করে। দাবি করে, সৎ কন্যাকে সে বিয়ে করেছে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী মেয়েটি আরমানের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় সৎ মেয়েকে বিয়ে করার বিষয়ে পবিত্র কুরআনের সূরা নেসায় নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করে পুলিশ জানতে চাইলে আরমান ওই নিষেধাজ্ঞা মানে না বলে জানায়। পুলিশ বলছে, এমন জঘন্য অনাচারের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েও তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা লক্ষ করা যায়নি। ধর্ষক আরমানের স্ত্রীও ঘটনা সম্পর্কে অবহিত বলে জানায় সে।
মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে আরেকটি অবিশ্বাস্য ঘটনার খবর গণমাধ্যমে স্থান পায়। খবরে বলা হয়, টাঙ্গাইলের সখীপুরে চাচীকে ধর্ষণ মামলায় খায়রুল ইসলাম (২৫) নামে এক ভাতিজাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সখীপুর থানায় ভাতিজা খায়রুলের নামে জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন ওই চাচী। তিনি জানান, স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি যান। স্বামী প্রবাসে থাকেন। ঘটনার দিন ভাসুরের ছেলে খায়রুল ইসলাম চাচীর বাপের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে চাচীর ঘরে ঢুকে, মুখ কাপড় দিয়ে চেপে ধরে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে।
আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার খবর আসে একই সময়ে। শিরোনাম- ‘গৃহশিক্ষকের লালসার শিকার অভিজাত পরিবারের এক গৃহবধূ’। মূল ঘটনাটি বেশ কয়েক মাস আগের। জানাজানি হয় গত সপ্তাহে। ঘটনার বিবরণ এ রকম- রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক অভিজাত পরিবারে গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিল শাহ মো: মুজাহিদ। রাজধানীর একটি নামি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র সে। একপর্যায়ে গৃহকর্তা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে মুজাহিদ বাসায় গিয়ে কৌশলে কোল্ডড্রিংকসের সাথে নেশাদ্রব্য খাইয়ে ধর্ষণ করে গৃহবধূকে। সেই ধর্ষণের ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। জোরপূর্বক কিছু ব্ল্যাংক চেকেও সই নিয়ে যায়। পরে আরো কোটি টাকা দাবি করে। প্রথমে লোকলজ্জার ভয়ে ঘটনা চেপে গেলেও একপর্যায়ে অসহায় হয়ে ভিকটিম পরিবার মামলা দায়ের করে ভাটারা থানায়। জড়িত মুজাহিদসহ দুই আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ধর্ষণের ভিডিওসহ চাঁদা দাবির নানা আলামত জব্দ করেছে। বর্তমানে মুজাহিদ জেলহাজতে এবং মুশাহিদ নামে সহযোগী জামিনে রয়েছে। আদালতের নির্দেশে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদে মুজাহিদ ঘটনার স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
গত সপ্তাহে আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে পটিয়া পৌরসদরে। সেখানে বাকপ্রতিবন্ধী এক যুবতী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষিতাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। লম্পট আবুল কাশেম (৫৬) পলাতক রয়েছে। তিনি একই এলাকার আবদুর রশিদের ছেলে। বাকপ্রতিবন্ধী তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় চলছে।
সর্বশেষ যে ঘটনায় এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় বইছে সেটি ঘটেছে বরিশালের বানারীপাড়ায়। চাঁদার টাকা না পেয়ে স্বামীকে বেঁধে রেখে নববধূকে ধর্ষণের অভিযোগে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সুমন হোসেন মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া বনানীর রেইনট্রি হোটেল ও একটি বাসায় জন্মদিনের নামে যে ধর্ষণের উৎসব হয়েছে তা এখনো তরতাজা। রোজই গণমাধ্যমে বিচিত্র ধরনের সামাজিক অপরাধের ঘটনা চোখে পড়ছে। সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছে না এমন ঘটনাও ঘটছে অহরহ।
একটির পিঠে আরেকটি ঘটনা যেভাবে ঘটে চলেছে তা কী বার্তা দিচ্ছে? আমাদের সমাজ কতখানি পচেছে তা আন্দাজ করার জন্য কি আর কোনো সূচকের প্রয়োজন পড়ে? উপর্যুপরি ঘটনাগুলো সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ভীতকে কতটাইবা নাড়া বা ঝাঁকুনি দিতে পেরেছে? আর কতটা অধপতিত হলে আমরা বুঝব যে, সমাজের পচন নিরাময়-অযোগ্যস্তরে পৌঁছে গেছে? এ অবক্ষয় রুধিবেই বা কে?
এ অবক্ষয় ও অধঃপতন কেন ঘটছে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর যে আমরা জানি না, তা কিন্তু নয়। সমাজে যারা ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করেন কিংবা শ্রেণী-পেশার সচেতন জনগোষ্ঠী রয়েছেন তারা বিলক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন কেন ক্রমাগতভাবে সমাজটা দূষিত হয়ে যাচ্ছে। মানুষত্বের সঙ্কট প্রকট থেকে প্রকট হচ্ছে। ভয়াবহ সব ঘটনাও আগের মতো এখন আর আমাদের মনে দাগ কাটছে না, আলোড়িত করছে না। অবক্ষয়ের অন্যতম একটা দিক হচ্ছে- আমাদের তরুণদের একটা বড় অংশ বুঝে গেছে এই দেশে ‘জোর যার মুল্লুক তার’। ক্ষমতাদর্পিরা যা খুশি তাই করছেন। সমাজটা প্রতিকারহীন এক অরাজক পরিস্থিতির দিকে ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছে।
নৈতিক অধঃপতনের আরেকটি কারণ আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস এখন আর আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা শুনে বা খবরের কাগজে পড়ে শিউরে উঠতে হচ্ছে। সন্তানের হাতে মা-বাবা খুন, মা-বাবার হাতে সন্তান খুন, তিন-চার সন্তান রেখে মায়ের পরকীয়া, প্রেমিকের হাত ধরে পলায়ন, ধনাঢ্য ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সন্তান কর্তৃক ব্যস্ততার কথা বলে বাবার লাশ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে হস্তান্তর, বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ছুড়ে ফেলে আসার মতো ঘটনা আত্মকেন্দ্রিক জীবন ও স্বার্থপরতার বিষয়টিকেই তো উলঙ্গভাবে প্রকাশ করছে।
অবক্ষয়ের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি-নির্ভর মাধ্যমের ব্যবহার যেমন মানুষের কাছে পৃথিবীটাকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, ঠিক তেমনি মানুষের মধ্যে অবাধ যৌনাচারকেও উসকে দিচ্ছে। আজকে পর্নোগ্রাফি যেভাবে বানের পানির মতো গ্রাস করছে, তাতে শিশু-কিশোররা ব্যাপকহারে যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। স্কুলগামী টিনেজারদের মোবাইলে পর্নোগ্রাফি ছবি অভিভাবকদের অসহায় ও শঙ্কিত করে তুলেছে।
সরকারি হিসাবে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাত কোটি। গত মার্চ মাসে টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত মার্চ মাস শেষে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ছয় কোটি ৬৭ লাখ। অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর হাতে এখন ইন্টারনেট। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার কতটা দ্রুতগতিতে হচ্ছে তা জানা যাবে অন্য পরিসংখ্যান থেকে। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, প্রতি ১২ সেকেন্ডে একটি করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে বাংলাদেশে, যা দেশের জন্মহারের চেয়েও বেশি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তিকে অবলম্বন করে অনৈতিক ও অবৈধ প্রেমে অন্ধ হয়ে মানুষ কখনো কখনো নিষ্ঠুর, নির্মম হয়ে উঠছে। কখনো আবার পেটের ক্ষুধাও মানুষকে আত্মধ্বংসী করে তুলছে।
তা ছাড়া আমাদের পারিবারিক গঠন কাঠামোতেও মারাত্মক গলদ দেখা যাচ্ছে। সন্তান লালন-পালনে মা-বাবার ভূমিকায় সমস্যা রয়েছে। সন্তানের প্রতি মা-বাবা এবং মা-বাবার প্রতি সন্তানদের কর্তব্য পালনে ঘাটতি থাকার কারণেই মা সন্তানকে হত্যা করছে, আর মা-বাবাকে খুন করছে ঐশীর মতো নেশাসক্ত সন্তানেরা।
আমাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি রেইনট্রির সাফায়াত, সাদমান, টাঙ্গাইলের খায়রুল, ভার্সিটির মুজাহিদ বা পটিয়ার কাশেমদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়াব? বিকারগ্রস্ত আরমানদের ঘৃণ্য ব্যাভিচার-পাপাচার করতে দিয়ে কোটি কোটি বাবাকে লজ্জায় ডুবাব, নাকি এখনই শক্ত হাতে এর লাগাম টানব? নীতিনৈতিকতার স্খলনের উপায়- উপাদানগুলোর রাশ টানার সময় কি এখনো হয়নি?

লেখক : সাংবাদিক

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.