ভালোবাসা

আল ফাতাহ মামুন

রিকশার প্যাডেলে পা ঘুরাতে ঘুরাতে যখন টিএসসি পার হয় বাদশাহ মিয়া, তখন তার মনেও কুলসুমকে নিয়ে এক পাশে বসার স্বাদ জাগে। ঢাকা শহরের সব মানুষকে জানিয়ে দিতে ইচ্ছে করেÑ ভালোবেসে সেও হাত ধরতে জানে। জানে প্রকাশ্যে চুমু খেতে। চুমু খাওয়ার দৃশ্য মনে ভেসে উঠতেই লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে বাদশাহর ছোপ ছোপ দাড়ি ভরা কালো গাল দুটো। আগের চেয়ে আরো জোরে প্যাডেল ঘুরাতে ঘুরাতে চলে আসে নিউমার্কেটের দুই নম্বর গেটে। প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দিয়ে গেণ্ডারিয়া বস্তির উদ্দেশে আবার প্যাডেল ঘুরাতে থাকে বাদশা মিয়া।
বাদশাহ মিয়া এখন দাঁড়িয়ে আছে গেণ্ডারিয়া বস্তির পেছনের ঝোপের আড়ালে। এখানে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। কুলসুমের সাথে দেখা করার নিরাপদ স্থান এটিই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেছন থেকে কুলসুম বাদশাহর চোখ চেপে ধরল। বাদশাহ জোড়াজুড়ি না করে কুলসুমের হাতে আলতো করে স্পর্শ বুলিয়ে দিলো। কুলসুমের মনে হলো এ স্পর্শ কত চেনা। জনম জনম এভাবেই যদি বাদশাহ তাকে ছুঁয়ে থাকত! নীরবতা ভেঙে কুলসুম বললÑ ‘তা বাদশা মিয়া! আমারে সিনেমা দেখতে লইয়া যাইবা কবে?’
‘তুমি কবে যাইতে চাও’?
‘শনিবারে। না না রোববারে। তোমার রিকশায় চইরা সিনেমা দেখতে যামু।’
‘আমি ভাবছি, তোমারে নিয়া টিএসসি চত্বরে ঘুইরা আসমু। তুমি-আমি পাশাপাশি বইসা, হাতে হাত রাইখা, চোখ বন্ধ কইরা, ঠোঁটে ঠোঁট...’
‘অইছে! আর সামনে বাইরেন না। এত মানুষের সামনে আফনে রঙ করবেনÑ হেই সাহস না আফনের আছে, না আছে আমার। পেরেম করতাছি, তাই বইলা তো লজ্জা-শরমের মাথা খাই নাই।’
ও কুলসুম! আমার অনেক দিনের ইচ্ছা তোমারে নিয়া টিএসসিতে বসমু। কত মানুষ যে তার মনের মানুষেরে লইয়া অইহানে বইয়া থাকে। তুমি না কইরো না সোনা পাখি।
হাছাই তুমি আমারে নিয়া টিএসসি যাইবা? আমার হাত ধরবা? আমারে...
‘হ। হাছাই।’
ও আল্লাহ! আমার যে কী আনন্দ লাগতেছে। কবে আইব রোববার...!
২.
বাদশাহ মিয়া প্যাডেলে পা ঘুরাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, রিকশা চালানোর জীবন সার্থক। তার মনের মানুষ কুলসুম আজ তার যাত্রী। আজ সে কুলসুমকে নিয়ে টিএসসির এক কোণে বসবে। হাত ধরে সবাইকে দেখাবে তার জীবনেও প্রেম-ভালোবাসা আছে। অন্য দশজনের চেয়ে ভালোবাসায় কোনোভাবেই সে পিছিয়ে নেই। রিকশা থামল জনতা ব্যাংকের মোড়ে। রিকশা থেকে নেমে দু’জনেই এগিয়ে যাচ্ছে টিএসসির দিকে। কুলসুম বলল, ‘বাদশাহ! ফুসকা খামু।’
কুলসুম এক মনে ফুসকা খেয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে চার নম্বর বাটি শেষ হলো। ঝালে হিহি করতে করতে কুলসুম বলল, ‘অহন থাক। যাওনের সময় আবার একবাটি খাইয়া যামুনে। লও কুনোহানে গিয়া বহি।’ জনতা ব্যাংকের দিকে মুখ করে বসল দু’জনে। তাদের পাশে এসে বসল ছাত্রনেতা রাসেল চৌধুরী। সাথে গার্লফ্রেন্ডও আছে। মুহূর্তেই কয়েকজন এসে ঘিরে ফেলল বাদশাহ ও কুলসুমকে। কলার ধরে বাদশাহকে জিজ্ঞেস করলÑ ‘মামা! কয় টেকা দিয়া ‘মাল’ ভাড়া করছ?’
ভেতরে প্রচণ্ড ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও বাইরে অসহায় ভাব নিয়ে বললÑ ‘না মামা। এইডা আমার বউ। গত মাসে কোর্ট ম্যারেজ করছি। কাবিননামা লগেই আছে।’
‘বান্দিরপো চুপ কর। তোর পাশে কেডা বইছে, দেহছ নাই? রাসেল ভাই। আমাগো নেতা। লগে ভাবীও আছে। আর তুই হের পাশে বইসা পিরিতি মারাইতাছস? তোর সাহস তো কম না! মাইর খাওনের আগে ভাগ কইলাম।’
‘ভালোবাসার অধিকার কি শুধু রাসেল ভাইদেরই আছে? আমাগো নাইÑ প্রশ্নটা গলা পর্যন্ত এসেও মুখে আসল না। ঢোক গিলে বললÑ ‘ভুল অইয়া গেছে। মাফ কইরা দেন।’
৩.
গেণ্ডারিয়া বস্তির পেছনের ঝোপে হাত ধরাধরি করে বসে আছে কুলসুম-বাদশাহ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। বাদশাহ হঠাৎ বলে উঠল, ‘কুলসুম, এত দিন জানতাম গরিবের অনেক অধিকারই থাকে না। ভালোবাসার অধিকারও যে নাইÑ এইডা আইজ বুঝলাম।’ কুলসুম কোনো উত্তর না করে বাদশাহকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ঠোঁটে চুমু এঁকে বলল, ‘আরে পাগল! কে বললÑ গরিবের ভালোবাসার অধিকার নাই। এই যে তোমারে আমি জড়াইয়ে ধইরা আছি, তোমার ঠোঁটে আমার ঠোঁট রাখছিÑ কই? কেউ তো আমাগোরে নিষেধ করতাছে না।’ বাদশাহ কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। আরো শক্ত করে কুলসুমকে জড়িয়ে ধরল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.