ডানা ভাঙা প্রজাপতি

ফারহাদিবা আফরিন শুভা

ক্যানভাসে রঙের পরে রঙ চড়ছে। বর্ণিল হয়ে উঠছে ক্যানভাসের বুক। ফুটে উঠল একটা ছোট্ট মেয়ের মায়াবী মুখ। ক্রমেই অবয়বে পূর্ণতা আসছে। হ্যাঁ, অবশেষে শেষ হলো ছবিটা। ডানাকাটা একটা ছোট্ট পরী নাচছে ফুলের বাগানে দুই হাত ছড়িয়ে। পাশেই তার ভাই প্রজাপতির পেছনে ছুট লাগিয়েছে। একটু দূরে বাবা-মা বসে আছেন।
একটা ছবি, প্রতিটি দেহের বাঁক ফুটে উঠেছে চেনা ভঙ্গিতে। সামাদ সাহেব নিজের তিলটাও দেখতে পান ছবির বাবার গালের বাঁ পাশে। আফরোজার ভ্রƒ কুঁচকে আছে ছবিতে। হাতে যখন কুরুশ কাঁটা থাকে আফরোজা বানুকে দেখলে মনে হয় তার মতো বিরক্ত আর কেউ নেই সংসারে। আসলে তা না। তিনি সময়টা উপভোগ করেন। মন চলে যায় সুদূর শৈশবে। কিন্তু ভ্রƒ কুঁচকেই থাকে।
সামাদ সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন, ঊষা ছবি শেষ করে রঙ গুছিয়ে রাখছে। শেষ হলে বাবার কাছে এসে দেখাল, ‘বাবা আমাদের ছবি। এ রকম কোথাও পিকনিকে যাবো।’
সামাদ সাহেব মেয়ের কপালের অবাধ্য চুল আলতো হাতে সরিয়ে দিলেন। কেন যেন ইদানীং ঊষা চুমু খেলে প্রচণ্ড রেগে যায়। সামাদ সাহেব বুঝতে পারেন না কেন? এমনকি ঊষার ভাই অনিকেও কেউ আদর করে চুমু খেতে এলে তেড়ে ওঠে। বাবার মনে কু গায়। তাহলে কি কোনো কিছু...। জোর করে চিন্তাটা সরিয়ে দেন মাথা থেকে। তার মেয়ে দেখতে অসম্ভব মায়াবী। কিন্তু এই বাচ্চা মেয়ে কাস ফোরে পড়ছে তার প্রতি... না না তিনি ভাবতে পারেন না। মেয়ের স্কুল ছাড়া বাইরে কোথাও যায় না। আফরোজা বানুও পুরোদস্তুর গৃহিণী। বাইরের কেউ আসার সুযোগ নেই বাসায়। দূর, এত ভাবনা কিসের?
মোবাইলে জলতরঙ্গের শব্দ তুলে কল আসে। উঠে ভেতরে যাবেন, তখনই কেটে যায়। আবার কল আসতেই সোফা ছেড়ে উঠে আসেন, ঊষা ফোন নিয়ে এসে বাবার হাতে দেয়। বাবা কথা বলেন। ঊষা বুঝতে পারে খুশির কোনো খবর। বাবার মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ছে। কেমন গোলাপি একটা আভা! ঊষা ভালো করে গেঁথে নেয় মনে এই হাসি, এই গোলাপি আভা। বাবার জন্মদিনে বাবাকে এ রকম হাসিমুখের একটা ছবি এঁকে উপহার দেবে। বাবা খুব খুশি হবেন।
সামাদ সাহেব ফোন রেখেই ডাকলেন, কই গো? কই গেলে? শুনে যাও। আফরোজা খুন্তি হাতে বেরিয়ে এলেন, কী হয়েছে বলে ফেলো। চুলোয় তেল। সামাদ সাহেব বলে উঠলেন, শায়লার বাবু হয়েছে। আফরোজা আলহামদুলিল্লাহ বলে হেসে মুখ মুছলেন আঁচলে। তারপর বললেন, দেখতে যাওয়া দরকার। চলো না আজ যাই। কাল শনিবার। বিকেলে ফিরে আসব।
ঊষা লাফিয়ে উঠে বলেÑ বাবা প্লিজ চলো, বেরিয়ে আসি। শায়লা ফুফুর বাড়ি গ্রামে। একেবারে ছবির মতো। তোমাকে আর পিকনিকে নিয়ে যেতে হবে না।
সামাদ সাহেব ইতস্তত করে বললেন, ঠিক আছে। খেয়ে-দেয়ে বেরিয়ে পড়ব। আফরোজা রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ঊষা বাবা-মা, ভাইসহ বাসস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। ভর দুপুর, বাস নেই। লোকজনের ভিড়ও কম না। অবশেষে নির্দিষ্ট রুটের বাস আসতে এক প্রকার যুদ্ধ করেই সামাদ সাহেব উঠে পড়লেন। কোনোভাবে পাশাপাশি দুটো সিট ম্যানেজ করা সম্ভব হলো। অনি আবার সিটে বসবে, কোলে বসবে নাÑ কারণ সে ফোরে পড়ছে। বড় হয়ে গেছে। এখন যদি কোলে বসে বেড়াতে যায়, তাহলে আর প্রেস্টিজ থাকে না। অগত্যা দু’জনের সিটে তিনজন বসলেন, ঊষা বসল জানালার পাশে মায়ের কোলে। বাসে ভিড়, তারপরও সবাই একসাথে আছেন দেখে সামাদ সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
ঊষা খুব আনন্দ নিয়ে জানালা দিয়ে দেখছে বাইরের পৃথিবী। এটা কী? ওটা কী? ও বাবা, ওখানে কী হচ্ছে শত প্রশ্নের ফুলঝুরি ঊষার মুখে। আর অনি? এত কিছু দেখার সময় নেই তার, ঘাড় গুঁজে গেমসে ডুবে আছে। সামাদ সাহেব দেখেন দু’জনকে আর মনে মনে ভাবেন ওদের জন্মের কথা। কিনিকে ভর্তি হলেও কেউ জানত নাÑ মেয়ে না ছেলে হতে যাচ্ছে। আফরোজা আর তিনি চেয়েছিলেন এতটুকু অজানা থাকুক। আল্লাহ যা দেবেন তাতেই তারা খুশি। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাঁদছিলেন আফরোজা আর সামাদ সাহেব বাইরে পায়চারি করছেন অস্থিরতায়। হঠাৎ ভূমিষ্ঠ শিশুর কান্না শুনে দুই হাত তুলে কৃতজ্ঞতা জানান স্রষ্টার কাছে। তখন তিনি অধীর হয়েছিলেন একটা খবরের জন্য। আফরোজা কেমন আছে?
নার্স হাসিমুখে বেরিয়ে এসে জানাল, ‘আপনার ছেলে হয়েছে। এর আট মিনিট পর আবারো শিশুর কান্না। সামাদ সাহেব নড়তে ভুলে যান।’ নার্স উৎফুল্ল হয়ে জানায়, ‘আমাদের জন্য মিষ্টি নিয়ে আসুন, আপনার পরীর মতো একটা মেয়েও হয়েছে।’ সামাদ সাহেবের চোখের কোণে পানি চলে এসেছিল এসব ভাবতে ভাবতে। আচমকা ঊষার ঝাঁকুনিতে বাস্তবে ফিরে এলেন, ‘কি মা? কোনটা কী?’
ঊষা সবজিক্ষেতের মাঝখানে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়–য়ার দিকে আঙুল তুলল। ওই দিকে? কী করে ওটা?
ওটা কাকতাড়–য়া। ও নিজে কিছু করতে পারে না। মামণি ওকে দেখে পাখিরা ভাবে মানুষ, তাই ভয়ে দূরে দূরে থাকে। সবজির তি করে না। উত্তর দিয়ে সামাদ সাহেব অনির দিকে তাকালেন। নাহ, যমজ হলেও বিস্তর পার্থক্য দুই ভাইবোনে। ঊষা আট মিনিট পরে যেন পৃথিবীতে আলো সমৃদ্ধ হয়ে এসেছে। অদ্ভুত সুন্দর ছবি আঁকে। পড়াশোনায়ও ভালো। অনি অমনোযোগী। সারাক্ষণ ক্রিকেট, মোবাইল গেমস এসব নিয়েই মেতে থাকে। ঊষার চুলে সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন। মেয়ে ফিরে তাকাতেই বাবার মুখে আদরের হাসি দেখে সেও হাসি ফিরিয়ে দেয়। সামাদ সাহেবের মনে হয় এই হাসিতে যেন গোলাপ ফোটে।
নামতে হবে, নির্দিষ্ট গন্তব্যে বাস দাঁড়িয়েছে। অনেকেই নামবে। ঠেলাঠেলি, ভিড়। অনিকে হাতে করে আফরোজা এগিয়ে যান দরজার দিকে। মামণি আমার সাথে আসো বলে ব্যাগ নিয়ে সামাদ সাহেব ওঠেন সিট থেকে। এক পা ফেলার আগেই ঊষার মনে হয় পেছন থেকে দুই হাতে যেন কেউ খামচে ধরেছে তাকে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পারে না। গায়ে গা-লাগা ভিড়। সামাদ সাহেব এগিয়ে যান। ঊষাও এগোয়। পেছনের নরপশুটাও এগোয়। এ মুহূর্তে ঊষাকে কেউ যেন থেঁতলে দেয়। ছোট্ট শরীরে ভিড়ের সুযোগে দুটো হাত ঘুরে বেড়াতে থাকে। ঊষার ম্যাথ টিচার দু’বার জোর করে মুখে চুমু খেয়েছিল স্কুলে একা পেয়ে। ঊষা ভাবত এর চেয়ে খারাপ জিনিস পৃথিবীতে কিছু নেই। মা-বাবাকে বলেনি। বলতে পারেনি, কিন্তু এখন এই চার পা হাঁটতে হাঁটতে তার সারা শরীর তবিত হতে থাকে। দুই হাতে ঠেলে সরাতে চায় ওই পাষণ্ড হাত দুটোকে। শক্তিতে কুলোয় না। তার দম বন্ধ হয়ে আসে। এক সময় ভিড়ের চাপে দরজায় এসে যায়। বাস থেকে নামে ঊষা, তারপর পেছন ফিরে তাকায়। বুঝতে পারে না কে ছিল সেই জঘন্য লোকটা। সবাইকে তার এক রকম মনে হয়। ততণে আফরোজা ঊষার হাত ধরেছেন, কিরে? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? ঊষা ফুঁপিয়ে উঠে, ‘তুমি কেন ভাইয়াকে হাত ধরে নামালে? কেন আমার সাথে নামলে না?’
ঊষার চুপ হয়ে যাওয়া আর ফোঁপানো দেখে বাবা জানতে চান, ‘কী হয়েছে আমার মামণির?’ আফরোজা হাসেনÑ ‘আরে আমি কেন অনিকে নিয়ে নামলাম সেজন্য গাল ফুলিয়েছে। কী যে বানিয়েছ মেয়েটাকে।’
ঊষার কষ্ট বেড়ে যায়। মা কেন বুঝতে পারছে না, ওই বাসে তার ডানা ভেঙে দিয়েছে দুই মিনিটে নোংরা হাত দুটো। চুপ করে থাকে সে।
অনি বোনের দিকে তাকায়। বুঝতে পারে কিছু হয়েছে। বলে, ‘কিরে আমাকে বল। কেউ মারলেও বল, আমার ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে এমন মার দেবো। ঊষা তাকায় ভাইয়ের দিকে, ভাইয়া বড়দের তুই কী করে মারবি? অনি চুপসে যায়। বলে, তাহলে বাবাকে বলব। বাবা মারবে। নিচুস্বরে ভাইবোন কথা বলতে বলতে রিকশা চলে আসে ফুফুর বাসায়।
সবাই দৌড়ে আসে। প্রাথমিক কুশলাদি বিনিময়ের পর ওরা বাবুকে দেখতে যায় ফুফুর রুমে। শায়লা ফুফু ঊষার কোলে দিতে দিতে বলেন, তোমার বোন এনেছি। তোমার সাথে খেলার জন্য। এবার অনি আর পারবে না তোমার সাথে।
ঊষা ছোট্ট একটা মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, ওর মতো একদিন বড় হবে বোনটা। ঊষা হঠাৎ কেঁদে ওঠে জোরেÑ ‘ফুফুনি বড় হলে তুমি কখনো বোনকে বাসে একলা নামতে দিয়ো না। কতগুলো খারাপ মানুষ বাসে ভিড়ের ভেতর বুকে কষ্ট দেয়।’ ঊষার ছোট্ট শরীরটা ফুলে উঠছে কাঁদতে কাঁদতে। ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। আফরোজা অপরাধী ভাবেন নিজেকে। অনি বোনের পাশে বসে চোখ মোছাতে চেষ্টা করে। সামাদ সাহেব দাঁতে দাঁত কাটেন। বারবার বৃথা আক্রোশে ফেটে পড়েন। নরপশুটা কেন তার রঙিন প্রজাপতির ডানা ভাঙল?
কেন? কেন?
প্রিয়জন-৫৪৩৩, চট্টগ্রাম

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.