বৃষ্টি হলেই রাজধানী ঢাকার এই চিত্র প্রায় সব যায়গায় চেখে পড়ে
বৃষ্টি হলেই রাজধানী ঢাকার এই চিত্র প্রায় সব যায়গায় চেখে পড়ে

অবহেলিত ঢাকা অসহায় রাজধানীবাসী

নাজমুল হোসেন

প্রায় দুকোটি মানুষের পদচারণা সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে ঢাকা। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার জরিপে বাস অযোগ্য শহরের তালিকায় বারবার ওঠে এসেছে রাজধানী ঢাকার নাম। বাড়তি জনসংখ্যার চাপ, ভাঙ্গাচোরা সড়ক, খোঁড়াখুঁড়ি, যানজট, জলাবদ্ধতা, ধুলা, ফ্লাইওভার নির্মাণ থেকে সৃষ্ট রাস্তাঘাটের সমস্যা, মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া-ডেঙ্গু রোগসহ অগণীত সমস্যায় ভিতর দিয়ে নগরবাসী পার করছে প্রতিদিনের কার্যক্রম। সর্বোচ্চ জনসংখ্যার চাপে ঢাকা আজ খুবই ক্লান্ত। কোথাও পালানোর জায়গা নেই অসহায় ঢাকাবাসীর।

জরিপকারী বিভিন্ন সংস্থার মতে ঢাকার বর্তমান লোকসংখ্যা এক কোটি ৮০ লাখের মতো। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে তিন কোটি ৫০ লাখ। সম্প্রতি ঢাকার আশপাশের ১৬টি ইউনিয়ন দুই সিটি করপোরেশনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর রাজধানীর আয়তন দ্বিগুণ হয়ে বর্তমানে প্রায় ৩০৬ বর্গকিলোমিটার হয়েছে। তারপরও এত ছোট এলাকায় বিশ্বের খুব কম দেশেই এত বেশি মানুষ বাস করে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বাস করা মানুষের ৩৬ ভাগই বাস করে ঢাকায়। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই শহরটি গড়ে উঠার ফল হিসেবে ঢাকা পরিণত হয়েছে বসবাসের ক্ষেত্রে নিম্ন মানের শহরে আর বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ভয়াবহ যানজটে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসেব মতে গত ১০ বছরে সড়কে যান চলাচলের গতি ঘন্টায় গড়ে ২১ কিলোমিটার থেকে কমে এখন এসে দাঁড়িয়েছে ৭ কিলোমিটারে, মানুষের গড় হাঁটার গতির চেয়ে একটু বেশি।
রাজধানীর জন্য যানজট কোনো নতুন খবর নয়। সপ্তাহের সাত দিনই রাস্তায় যানজট লেগে থাকে। বেলা আড়াইটা। মিরপুর সড়কে মোটরসাইকেল আরোহী, বাসযাত্রী, টেম্পোযাত্রী যে যার জায়গায় বসা। আড়ংয়ের সামনে থেমে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের উচ্চ শব্দ শোনা যাচ্ছে। ভেতরে বসা রোগীর স্বজনেরা রোগীকে নিয়ে কখন গন্তব্যে পৌঁছাবেন, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুধু মিরপুর সড়ক নয়, পুরো নগরজুড়ে যানজট পরিস্থিতি এ রকমই।

মাহবুব আজিজ থাকেন কমলাপুরে। অফিস কারওয়ান বাজারে। কমলাপুর থেকে প্রতিদিন আয়াত বাসে উঠে রওনা দেন অফিসের উদ্দেশে। কিন্তু কমলাপুর থেকে কাওরান বাজার প্রায় ৫ কিলোমিটারের রাস্তা যেন শেষই হয় না। কারণ মগবাজার সড়কে ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। আরও কত মাস চলবে কে জানে। মিরপুর থেকে রাজধানীর কেন্দ্রস্থল মতিঝিল আসতে কমপক্ষে তিন ঘণ্টা লাগে। উত্তরা থেকে নতুন বাজার, বাড্ডা-রামপুরা হয়ে মতিঝিল আসতে তিন থেকে চার ঘণ্টাও অনেক সময় লেগে যায়। ধানমন্ডি মিরপুর রোড, কাকরাইল থেকে মগবাজার রোড, পুরানা পল্টনের চার দিকের প্রতিটি সড়ক, মহাখালী থেকে মগবাজার, মহাখালী থেকে বনানী, শাহবাগ থেকে ফার্মগেট, বিজয়নগর, ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা, যাত্রাবাড়ী থেকে খিলগাঁওসহ প্রতিটি সড়কেই যানজট লেগে থাকে।

যানজট তীব্র আকার ধারণ করে বৃষ্টি হলে। গত কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টিতে লক্ষ্য করা গেছে, মাত্র কয়েক মিলিমিটার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড, চকবাজার রোড, সিদ্দিকবাজার, নাজিরাবাজার, কাজী আলাউদ্দিন রোডসহ বেশ কয়েকটি সড়ক। বৃষ্টির পানিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয় মৌচাক, মালিবাগ, শান্তিনগর, রাজারবাগসহ বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়কের পাশাপাশি গলিপথে চলাচলকারী মানুষদের। এমন অবস্থাও দেখা গেছে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার কয়েকঘণ্টা পর্যন্ত দিলকুশা, আরামবাগ, ফকিরাপুল ও নয়াপল্টনের প্রধান সড়কে ছিল হাঁটুপানি। একই অবস্থা উত্তর ধানমণ্ডি, কলাবাগান বশিরউদ্দীন রোড এবং জিগাতলারও।
উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন কারওয়ান বাজার, এফডিসির সামনের সড়ক, গ্রিনরোডের কিছু অংশ, মিরপুর, কাওলা, খিলক্ষেতে জলজটের কারণে দুর্ভোগে পোহাতে হয় রাজধানীবাসীকে। বর্ষার শুরু থেকেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয় রাজধানীর খিলক্ষেত, নিকুঞ্জ এবং দক্ষিণখানে। স্থানীয়রা দাবি করেন-২০১৫ সালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর জলাশয় এবং পানি নিষ্কাশনের পথও বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া, বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠান নির্বিচারে জলাশয় ভরাট করায় পানি সরতে পারে না বলে উত্তরের কয়েকটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নবাসী দুর্ভোগ পোহান।
যানজটের আরেক কারণ বছরজুড়ে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। প্রতি বছর শুষ্ক মওসুমে দুই সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, ডেসকো, তিতাসসহ বিভিন্ন সংস্থা রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে। বলা হয়, বর্ষার আগেই কাজ শেষ হবে। নিয়মও আছে জুনের মধ্যেই কাজ শেষ করার। কিন্তু এসব নিয়ম মানার কোনো বালাই নেই। বর্তমানে বর্ষাকালের অর্ধেক আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণ চলছে। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ হয়নি। বৃষ্টি, জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ঢাকার প্রায় প্রতিটি রাস্তায় এখন খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। কোথাও বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন কাজের জন্য, কোথাও মেট্রোরেল প্রকল্পের কারণে। কিন্তু যে রাস্তাগুলো খোঁড়া হচ্ছে সেগুলো ভাঙাচোরাই থেকে যাচ্ছে। মিরপুর ১০ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত পুরো রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে শেষ। গাড়ি চলতে হয় এক লেইনে। রামপুরা ব্রিজ থেকে মেরাদিয়া ব্রিজ পর্যন্ত সড়কটি খানা-খন্দে ভরা, মালিবাগ রেলগেট হয়ে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত সড়কের একাংশ কাটা। এমন উদাহরণ অনেক। এছাড়া হানিফ ফ্লাইওভার, বাংলামোটর থেকে মালিবাগ ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা দেখলে মনেই হবে না এটা রাজধানী ঢাকার রাস্তা।

মৌচাক-মগবাজার ফাইওভার নির্মাণের কারণে পথঘাটে সৃষ্ট জটিলতায় গত পাঁচ বছর ধরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি সে যন্ত্রণা। কয়েকটি পথ খুলে দেয়া হলেও এখনো মালিবাগ এলাকার রাস্তা-ফুটপাথ দিয়ে চলতে গিয়ে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নির্মাণকাজ চলায় সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্কুল শিক্ষার্থীদেরও।
কাজের শুরু থেকেই নানা অব্যবস্থাপার মধ্যদিয়েই চলছে ফ্লাইওভারটির নির্মাণকাজ। বিরতিহীনভাবে চলা এ নির্মাণকাজে নেই কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী। নির্মাণ বিধিমালা মানছেন না নির্মাণকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। ফলে একাধিক দুর্ঘটনার মধ্যে পড়তে হয়েছে পথচারীসহ নির্মাণশ্রমিকদের। জীবনও দিতে হয়েছে একাধিক মানুষকে।

মালিবাগ রেলগেট থেকে আবুল হোটেল, মৌচাক থেকে মালিবাগ মোড়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, শান্তিনগরে নির্মাণকাজ চলায় পুরো এলাকার একইচিত্র দেখা গেছে। রামপুরা থেকে গুলিস্থানগামী গাড়িগুলো চলাচল করে বিকল্প পথ দিয়ে। বলা যায় একপ্রকার অঘোষিত পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে এসব সড়ক। অন্য রাস্তা দিয়ে এই রুটের গাড়িগুলো চলাচল করায় যানবাহনের চাপ পড়ে আশপাশের খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, মতিঝিল, ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা সড়কগুলোতেও। এ ছাড়া পুরো রাস্তায় নানা নির্মাণসামগ্রী ছাড়াও সবসময় জমে থাকে নোংরা পানি। সৃষ্টি হয় কাঁদা-মাটির।
এতকিছুর পরেও মানুষ অনেক আশা নিয়ে ঢাকা রয়েছে। সর্বশেষ প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশে প্রথম উপস্থিতি জানান দেওয়া ভাইরাস জ্বর চিকুনগুনিয়া কেন চলতি বছর ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ল, তার দায় নিতে রাজি নয় কেউ। মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়ার কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক নেই। এ রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ। গত পাঁচ বছরে ঢাকা সিটি করপোরেশন মশা মারতে ১১৬ কোটি টাকা খরচ করলেও ক্ষুদ্র ওই পতঙ্গের উপদ্রব না কমায় ভুক্তভোগীরা নগর কর্তৃপক্ষের দিকে অভিযোগের অঙুল তুলেছেন। এমনকি স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও ঢাকায় চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার জন্য দুই সিটি করপোরেশনকেই দায়ী করেছেন।
রাজধানীতে এসব সমস্যার পাশাপাশি রয়েছে বিদ্যুৎ লোডশেডিং, গ্যাস সমস্যা, পরিবেশদূষণের মতো আরো নানা যন্ত্রণা। সবকিছু মিলিয়ে অবহেলিত ঢাকার আমরা অসহায় রাজধানীবাসীতে পরিনত হয়েছি!

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.