আল আজহার নিয়ে কিছু কথা
আল আজহার নিয়ে কিছু কথা

আল-আজহার নিয়ে কিছু কথা

জিয়া হাবীব আহসান

গত ২৮ জানুয়ারি ঐতিহাসিক তুর পাহাড় তুরে মুসা আ: পরিদর্শন শেষে মিসরের পর্যটন নগরী শারম আল-শেখে আমাদের নির্ধারিত হোটেল Amwaz Resort-এ পৌঁছলাম। তখন রাত প্রায় ৯টা। চার তারকা মানের হোটেলটির সৌন্দর্য ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে সবাই উৎফুল্ল। টিম লিডার প্রফেসর মফিজুর রহমান আল-আজহারি দ্রুত খাওয়ার পর্ব সেরে নেয়ার তাগিদ দিলেন। খাবারকক্ষে গিয়ে দেখি বিশাল আয়োজন। ইতালিয়ান, টার্কি, অ্যারাবিয়ান ফুডসহ বুফে আইটেমে নানা পদের বারবিকিউ, সি-ফুড, নান, ডিম, ব্রেড, বিফ, ভেজিটেবল, পেঁয়াজু (মিসরি নাম ত’আমিয়্যাহ), ডেট বেভারেজ, ফ্রেশ জুস, টার্কিশ কফি, পুডিং, মিষ্টি, হালুয়া, মোভেন পিক, আইসক্রিম; আরো কত কী। হোটেলে রয়েছে বিরাট চিলড্রেন এন্টারটেইনমেন্ট, মিনি কিডস ক্লাব, সুইমিংপুল (চিলড্রেন, লেডিস, জেন্টস), ওয়াটার স্লাইড, স্পোর্টস, মিউজিক, গলফ গেমস, সঙ্গীত, নৃত্য, টেনিস কোট, ফিটনেস সেন্টার, ভলিবল। বিভিন্ন আয়োজনে ভরা বিশাল রিসোর্ট এলাকা। দিনভর তুর পাহাড় যাওয়া-আসায় ক্লান্তশ্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও টিমের ১৮ জন সদস্য-সদস্যা সব কিছু ঘুরেফিরে দেখছিলাম। পরদিন পর্যটন নগরী স্বপ্নপুরী শারম আল-শেখকে বিদায় জানাব। রাতে সব গুছিয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরে অনেকেই সমুদ্রস্নানে গেলেন। সকালে নীল এয়ারের একটি ডমেস্টিক ফ্লাইটে ১ ঘণ্টা আকাশে উড়ে আমরা মিসরের রাজধানী কায়রো বিমানবন্দরে অবতরণ করি। ওখানে গাইড আহমেদ অপেক্ষমাণ ছিলেন। বাসে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠ বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় দেখানোর জন্য। পিচঢালা প্রশস্ত কালো পথ বেয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল। ড. আজহারি বললেন, হোসাইনিয়্যাহ এলাকায় ঐতিহাসিক জামেউল আজহার। এ এলাকার নামকরণ করা হয়েছে হজরত ইমাম হোসাইন রা:-এর নামে। জামেউল আজহারের অপর পাশেই রয়েছে মসজিদ, যা জামেউল হুসাইন নামে পরিচিত। রাস্তার পশ্চিম পাশে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি ও প্রধান ক্যাম্পাস এবং মসজিদুল আজহার। এই মসজিদকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা আসে অধ্যয়ন করার জন্য, তেমনি গবেষকেরা আসেন গবেষণা করার জন্য। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফাতেমি বংশের খলিফা ময়েজ-লি-দ্বীনিল্লাহ। ৩৬১ হিজরি মোতাবেক ৯৭২ ঈসায়ি সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, খলিফা কর্তৃক ৪ এপ্রিল ৯৭০ সালে জামে আল-আজহার প্রতিষ্ঠিত হয়।
কেউ বলেছেন, ওই খলিফার ক্রীতদাস জাওয়ার আল কাতিব যখন কায়রো নগরী আবাদ করেন, তখন তিনি মসজিদুল আজহার প্রতিষ্ঠা করেন। আবার ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত ফাতিমাতুয যাহরা রা: আনহার নামের ‘জাহরা’ শব্দটি অবলম্বনে ‘আল-আজহার’ নামকরণ করা হয়েছে। বিশাল এই মসজিদে ৩০ হাজার মুসল্লি জামায়াতে নামাজ আদায় করতে পারেন। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। গেটে রয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং মেহমানদের বসার সুন্দর আয়োজন। রাস্তার পশ্চিম পাশে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও মসজিদ এবং পূর্ব পাশে জামেউল হুসাইনের পাশেই একটি দৃষ্টিনন্দন মাজার। কোনো কোনো ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন, এখানে ইমাম হোসাইন রা:-এর মস্তক মোবারক দাফন করা হয়েছে। কারবালা প্রান্তরের বেদনাবিধুর ঘটনা প্রত্যেক মুসলমানেরই জানা। তাঁকে শহীদ করার পর তাঁর পবিত্র মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কুফায় প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে পাঠানো হলে মাথাটি উমাইয়া মসজিদের মাঠে দাফন করা হয়। পরে দাফনকৃত মাথা মোবারক উঠিয়ে আস্কালানে নিয়ে দাফন করা হয়েছিল। ৫৪৮ হিজরিতে ক্রুসেড যুদ্ধের সময় পবিত্র মাথার মর্যাদা হানি হতে পারে, এ আশঙ্কায় সেখান থেকে উঠিয়ে তা কায়রো নগরীতে দাফন করা হয়। একে কেন্দ্র করে বিশাল এক মাজার ও সুদৃশ্য মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।

এই মাজারে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করে থাকেন। মাজারের পশ্চিম পাশে একটি কক্ষে সংরক্ষিত রয়েছে নবী করিম সা:-এর পবিত্র দাড়ি মোবারকের কয়েক গুচ্ছ। তাঁর ব্যবহৃত উটের জিন ও মিসওয়াক। কক্ষটি বিশেষ সময় খুলে দেয়া হয়। জামেউল আল-আজহার ও আল-আজহার মসজিদের পেছনেই রয়েছে একটি গলিপথ। এই পথের ধারেই রয়েছে আল্লামা ইমাম বদরুদ্দিন আইনি রহ: কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত মাদরাসা ও মসজিদ। এখানেই তার মাজার। এই মাদরাসা তিনি ৮৪২ হিজরিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ক্যাম্পাসের অদূরেই খান-এ খলিলি নামক প্রত্নতাত্ত্বিক বিশাল মার্কেট। এখান থেকে আমরা প্যাপিরাস পেপারসহ নানা ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ক্রয় করি।

আমাদের নিয়ে আসা হলো কায়রোর নতুন শহর মাদিনাতুন নসরে অবস্থিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসে। বিশাল ক্যাম্পাস, ছাত্রছাত্রীরা ঢুকছেন-বের হচ্ছেন। বেশ কড়াকড়ি, উঁচু প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত এ বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বত্র সিসি ক্যামেরা এবং দেয়ালের ওপর কাঁটাতারের বেড়া। জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল সিসিবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ ঠেকাতে এ ব্যবস্থা। আল-আজহারের প্রাক্তন ছাত্র ড. মফিজুর রহমান আজহারির চেষ্টায় আমরা নতুন ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ ঘুরে দেখার অনুমতি পেলাম। বিরাট ক্যাম্পাস, দেখার জন্য গাড়ি নিয়ে ঘুরলেও পুরো দিন প্রয়োজন হবে। এটি আরবি সাহিত্য, ইসলামিক স্টাডিজ, কুরআনিক সায়েন্সেস, হাদিস, ইসলামি আইন, শিক্ষা, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, অলঙ্কার শাস্ত্রসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক ডিসিপ্লিন দ্বারা সমৃদ্ধ একটি অত্যাধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়; যা বিশ্বের একটি প্রাচীনতম এবং মিসরের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী ইউনিভার্সিটি। ইসলামে আদর্শ প্রচার এবং ইসলামি সংস্কৃতির বিস্তার ঘটানোর উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

টিম লিডার থেকে জানতে পারলাম, আল-আজহারের সর্বোচ্চ পদধারীকে বলা হয় শায়খুল আজহার। তিনি পদাধিকার বলে মিসরের গ্রান্ড ইমাম বা ইমামুল আকবর। শায়খুল আজহা একটি সাংবিধানিক পদ এবং এই পদে নিয়োগ পার্লামেন্টের মাধ্যমে দেশের প্রেসিডেন্ট দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ থেকে এখানে প্রতি বছর মাত্র ১৫ জন ছাত্র কোটাভিত্তিতে আসার সুযোগ পায়, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। অথচ বাংলাদেশ পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। এ ব্যাপারে আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগপৎ ভূমিকা আবশ্যক। পথে দেখলাম, একটি মসজিদে সেনা প্রহরা এবং তালা দেয়া। গাইড বললেন, নাম মসজিদে ‘রাবিয়াহ আল-আদউয়্যাহ।’ এখানে ২০১৩ সালে রমজান মাসে সেনা শাসক সিসিবিরোধী প্রচণ্ড গণবিক্ষোভ ও অবস্থান প্রায় ৪৫ দিন চলেছিল। সেনাপ্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি দেশের নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাগারে পাঠালে ছাত্রছাত্রীসহ লাখ লাখ মানুষ অবস্থান নেয় এ মসজিদ চত্বরে। অবশেষে সর্বাত্মক কমান্ডো অভিযান ও বিপুল জানমালের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে জনতাকে অপসারণ করা হয়। সেদিন প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হন। এর পর থেকে মসজিদটিতে তালা ঝুলছে এবং নামাজ পড়াও বন্ধ। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস ডানে ফেলে এগোতেই গাইড আমাদের দেখালেন ওই স্থান, যেখানে ১৯৮১ সালে তাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত নিহত হয়েছিলেন। সেখানেই রয়েছে তার পিরামিড আকৃতির বিশাল সমাধি।

আমরা কায়রোর অভিজাত সানসিটি শপিংমলে গেলাম। বিশাল আধুনিক মার্কেট। অনেকেই কেনাকাটা করলেন। এবার আমরা কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। স্থানীয় সময় রাত আড়াইটায় সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি বিরাট বিমানে মক্কা-মদিনা সফর আর ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে এই যাত্রা। শোকর আলহামদুলিল্লাহ, পাঁচ দিনের মিসর সফরে অনেক কিছু দেখেছি, শিখেছি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। তবে অনেক কিছু দেখার বাকি রয়ে গেল। আবার এ দেশে আসা হবে কি না মহান আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন। মিসরি গাইড এয়ারপোর্টের একেবারে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত সহযোগিতা করে বিদায় নিলেন। তাদের এমন সহযোগিতা ও আন্তরিকতা পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। উড়োজাহাজ জেদ্দার উদ্দেশে উড়াল দিলো। আর আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আরব বসন্তের দেশ, প্রাচীন সভ্যতার দেশ এবং হজরত ইব্রাহিম, হজরত ইউসুফ, হজরত মুসা, হজরত হারুন, হজরত ইলিয়াস, হজরত সালেহ, হজরত লোকমান ও হজরত দানিয়েল আলাইহিমুসসালামসহ নাম না জানা বহু নবী-রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামের স্মৃতি ও পদচারণায় ধন্য পুণ্যভূমি মিসরকে বিদায় জানালাম।

লেখক : আইনজীবী, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.