যেকোনো পরিস্থিতিতে তুরস্ক কাতারের পাশে থাকবে : এএফপি
যেকোনো পরিস্থিতিতে তুরস্ক কাতারের পাশে থাকবে : এএফপি

এরদোগানের কূটনৈতিক মিশন

আদিবা শাইয়ারা

কাতারের ওপর অবরোধ নিয়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় দেশগুলো নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। গত ৫ জুন ১৩ দফা শর্ত দিয়ে অবরোধ আরোপ করেছিল এসব দেশ। কিন্তু কাতারের অনমনীয় মনোভাবের কারণে পিছু হটে এখন ছয় দফা শর্ত মানার দাবি জানানো হয়েছে। সৌদি আরব ও তার তিন মিত্র দেশ আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর আশা করছে কাতার এসব শর্ত মেনে নেবে। নতুন এই ছয় শর্তের মধ্যে রয়েছেÑ
১. সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে কাতারকে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করতে হবে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে তহবিল জোগানো এবং নিরাপদ আশ্রয় দেয়া বন্ধ করতে হবে।
২. সন্ত্রাস বা বিদ্বেষ বাড়ায় এমন কথাবার্তা বন্ধ করতে হবে।
৩. রিয়াদ চুক্তি এবং তা বাস্তবায়নে জিসিসির ফ্রেমওয়ার্ক মেনে চলতে হবে।
৪. ২০১৭ সালের মে মাসে রিয়াদে আরব ইসলামিক আমেরিকান সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলো মানতে হবে।
৫. কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো যাবে না। কোনো রাষ্ট্রের বেআইনি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়া যাবে না।
৬. আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো আন্তর্জাতিক মহলের সব রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা মেনে নিতে হবে।
নতুন এই শর্ত আরোপের পর কাতারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহারের পর কেবল এসব দাবি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সাথে এই অবরোধের মাধ্যমে দেশটি দুর্বল নয়, বরং আরো আরো শক্তিশালী হয়েছে বলে কাতারের একজন মন্ত্রী দাবি করেছেন। এই অবরোধকে কেন্দ্র করে ছোট দেশ কিভাবে কূটনৈতিক দক্ষতায় প্রভাবশালী ও বড় দেশগুলোকে কোণঠাসা করতে পারে তার নজির স্থাপন করেছে।
কাতার নিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন দেশগুলোর নতুন শর্ত আরোপের পর কাতারের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান সঙ্কট নিরসনে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতার সফর করেছেন।
এরদোগানের এই সফরের মধ্য দিয়ে কাতারের সাথে উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর সঙ্কট নিরসনের পথ বেরিয়ে আসতে পারে। প্রকৃতপক্ষে উপসাগরীয় দেশগুলো চাপ প্রয়োগ করে কাতারকে নতজানু করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তুরস্ক, ইরান ও ইউরোপীয় দেশগুলো কাতারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করার পর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান বদল করে। এমন পরিস্থিতিতে নমনীয় অবস্থান নিয়ে ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কৌশল নিতে পারে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন দেশগুলো। তুরস্কের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সৌদি আরবকে উদ্যোগী ভূমিকা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সৌদি বাদশাহর সাথে আলোচনায় এ অঞ্চলে বড় ভাইয়ের ভূমিকা পালন করার অনুরোধ জানানো হয়, যাতে সব দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করা যায়। এরদোগান সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ছাড়াও প্রবল ক্ষমতাধর ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথেও কাতার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এর আগে কাতার সঙ্কট নিরসনে কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ আল আহমাদ আল সাবাহ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু তা বেশি দূর এগোয়নি। এরদোগান কুয়েতের আমিরের সাথে আলোচনা শেষ করে কাতার সফর করেন। এই সফরের মধ্য দিয়ে সঙ্কট নিরসনের পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতিতে তুরস্ক যে কাতারের পাশে থাকবে সে বার্তাও দেয়া হলো। কাতারের আমিরের সাথে তুরস্কের সেনাঘাঁটি স্থাপনের ব্যাপারেও আলোচনা করেছেন এরদোগান। এই সফরের মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাতারের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ২০১৫ সালে সামরিক চুক্তিতে স্বার করেছে দুই দেশ। আরব বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দোহার অন্যতম মিত্র হিসেবে সামনে চলে আসে আঙ্কারা। গত বছর প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর একাংশের অভ্যুত্থানের ব্যর্থ চেষ্টার সময় প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি।
অপর দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। অভ্যুত্থান চেষ্টার পর এরদোগানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাতারের বিশেষ বাহিনীর ১৫০ সদস্যের একটি ইউনিট তুরস্ক পাঠানো হয়েছিল। দুই দেশের নীতিনির্ধারণে আদর্শিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। মিসরভিত্তিক ইসলামপন্থী দল মুসলিম ব্রাদারহুড ও ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসকে সমর্থন দেয়ার ব্যাপারে দুই দেশ নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে। এ ছাড়া ইরানের প্রতিও দেশ দু’টির দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম। দুই পই স্বীকার করে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তি হলো ইরান। আঞ্চলিক রাজনীতিতে ক্ষুদ্র দেশ কাতার যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তার পেছনে রয়েছে তুরস্কের জোরালো কূটনৈতিক সমর্থন। এরদোগানের এই সফরের মধ্য দিয়ে কাতারের অবস্থান আরো শক্ত হলো।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.