ফিলিস্তিনি জনগণ, আরব বিশ্ব এবং পুরো মুসলিম উম্মাহর প্রতিক্রিয়া যাচাই করার জন্যই ইসরাইল আল-আকসা বন্ধ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে : এএফপি
ফিলিস্তিনি জনগণ, আরব বিশ্ব এবং পুরো মুসলিম উম্মাহর প্রতিক্রিয়া যাচাই করার জন্যই ইসরাইল আল-আকসা বন্ধ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে : এএফপি

কাঁদছে আল-আকসা নীরব মুসলিম বিশ্ব

আহমেদ বায়েজীদ

আল-আকসা মসজিদে ইসরাইলের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার নতুন তৎপরতা শুরু হয়েছে। আগে বিভিন্ন অজুহাতে মসজিদটিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করত ইসরাইল; কিন্তু এবার কোনো রাখঢাক না রেখেই সরাসরি অ্যাকশনে নেমেছে ইহুদিবাদী দেশটি। পরপর দুই শুক্রবার মসজিদটিতে জুমার নামাজ আদায় করতে দেয়া হয়নি মুসলিমদের। প্রতিবাদে বিক্ষোভ করা লোকদের ওপর চালানো হয়েছে গুলি। নিরাপত্তার নামে বিশ্ব মুসলিমের তৃতীয় পবিত্র এ স্থানটিতে বসানো হয়েছে সেনাপাহারা, নজরদারি ক্যামেরাসহ নানা সামগ্রী। আল-আকসা শুধু ফিলিস্তিনিদের নয়, পুরো মুসলিম উম্মাহর কাছেই পবিত্র একটি স্থান। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, অত্যন্ত নিন্দনীয় এ ঘটনায় অনেকটাই নীরব রয়েছে মুসলিম বিশ্ব। দু-একটি দেশ ছাড়া কেউ এগিয়ে আসছে না ইসরাইলি দখলদারিত্বের প্রতিবাদ করতে। ফিলিস্তিনের মাহমুদ আব্বাস সরকারের ভূমিকাও ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’। তবে বসে নেই সাধারণ ফিলিস্তিনিরা। বুকের রক্ত দিয়ে তারা পবিত্র আল-আকসার সম্মান রক্ষায় লড়াই করে যাচ্ছেন।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে জেরুসালেম ইসরাইলের দখলে। কিন্তু এর আগে কখনো আল-আকসা বন্ধ করে দেয়ার নজির নেই। তাই এবার ইসরাইল আগের চেয়ে অনেক বেশি আটঘাট বেঁধে নেমেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকাররা। দিন যতই যাচ্ছে, জেরুসালেমে সেনাসংখ্যা ততই বৃদ্ধি করছে ইসরাইল। গত মঙ্গলবার আল-আকসার গেট থেকে মেটাল ডিটেক্টর সরিয়ে নিলেও নিরাপত্তার নামে আরো অনেক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। মুসলিমদের প্রথম কেবলা আল-আকসাকে পবিত্র ধর্মীয় স্থান মনে করে ইহুদিরাও। যে কারণে এই মসজিদটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য প্রায়ই হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এক সময় মসজিদটি পুরোপুরি মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন তা নেই। ইসরাইলের বেঁধে দেয়া নিয়মেই এখন সেটিকে পরিচালনা করতে হয়। সেখানে প্রবেশ ও প্রার্থনার অধিকার দেয়া হয়েছে ইহুদিদেরও।
আরব বিশ্বের অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দিন দিন আল-আকসা থেকে মুসলিমদের বিতাড়িত করার যে ইসরাইলি নীলনকশা, তারই একটি ধাপ হয়তো এবারের পদক্ষেপ। এ ঘটনায় ইসরাইল সফল হলে কিংবা বড় কোনো বাধার সম্মুখীন না হলে আল-আকসা থেকে মুসলিমদের পুরোপুরি বিতাড়িত করতে হয়তো বেশি সময় নেবে না। ফিলিস্তিনি জনগণ, আরব বিশ্ব এবং পুরো মুসলিম উম্মাহর প্রতিক্রিয়া যাচাই করার জন্যই ইসরাইল আল-আকসা বন্ধ করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এর কঠোর প্রতিবাদ না হলে তারা উৎসাহ পাবে ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে কিছু করার জন্যÑ সেটি হতে পারে মুসলিমদের আল-আকসায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরাবি আল-রানতাবি লিখেছেন, ‘অনেক আরব দেশ আল-আকসার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেয়ার কারণে ফিলিস্তিনিরা বুঝে ফেলেছেন, এর মধ্যে অশুভ কিছু আছে এবং ইসরাইল যে নিরাপত্তার কড়াকড়িকে সাময়িক বলছে, তা আসলে স্থায়ী।’
গত ১৪ এপ্রিল আল-আকসা চত্বরে এক সংঘর্ষে তিন ফিলিস্তিনি ও দুই ইসরাইলি পুলিশ নিহত হওয়ার পর মসজিদটি বন্ধ করে দেয় ইসরাইল। এক দিন পর খুলে দেয়া হলেও নামাজ আদায়ে বাধা দেয়া হচ্ছে সেখানে। রহস্যজনকভাবে আরব বিশ্বসহ মুসলিম দেশগুলো বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে না। ফিলিস্তিন ইস্যুতে এমনিতেই অনেক মুসলিম দেশের রহস্যজনক নীরবতা দেখা যায়, এবারের বিষয়টিতে তা আরো বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। একমাত্র তুরস্ক ও ইরান ছাড়া কোনো দেশ শক্ত প্রতিবাদ জানায়নি আল-আকসা চত্বরে ইসরাইলি বর্বরতার। আরব শাসকগোষ্ঠীর অনেকের বিরুদ্ধেই গোপনে ইসরাইলের প্রতি সমর্থনের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়। এবার তা আরো জোরালো হয়েছে। ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যবহারকারীরা মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ফিলিস্তিনের পাশে না দাঁড়ানোর জন্য। ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে একজন লিখেছেনÑ “আরব শাসকেরা এখন কাতারকে ‘শায়েস্তা’ করতে আর ট্রাম্পের আশীর্বাদ নিয়ে নিজেদের গদি রক্ষায় ব্যস্ত। তাদের সময় কোথায় আল-আকসার সম্মান রক্ষার।” আরব বিশ্ব বিশেষ করে সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন তরুণেরা। অতীতে আল-আকসায় যখনই ইসরাইল হস্তক্ষেপ করেছে, সৌদি আরব সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু এবার একেবারেই নীরব ভূমিকা পালন করছে।
তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ও তার সরকার বিষয়টিতে বেশ শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। ইরানও ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছে। ফিলিস্তিনের মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভূমিকা এখানে রহস্যজনক। আল-আকসা মসজিদের সম্মান ও অধিকার রক্ষায় জোরালো কোনো পদক্ষেপই এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি তার পক্ষ থেকে। ইসরাইলের সাথে সহযোগিতার সমঝোতাগুলো বাতিল করার ঘোষণা দিলেও তা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না ফিলিস্তিনিদের কাছে। ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের সব পক্ষকে নিয়ে তিনি ইসরাইলের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন বলে যে আশা করা হচ্ছিল, তার কিছুই হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালেহ আল নামি এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এমনকি শিশুরাও জানে, আল-আকসা ইস্যুতে ইসরাইলের সাথে নিরাপত্তার সহযোগিতা বন্ধের ঘোষণায় তিনি মিথ্যা বলছেন।’
কারো সহযোগিতা পেল কি না কিংবা কেউ পাশে দাঁড়াল কি না তার জন্য অপেক্ষা করেননি ফিলিস্তিনিরা। এমনকি কোনো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেরও পরোয়া করেননি তারা, সবাই যার যার অবস্থান থেকে রুখে দাঁড়িয়েছেন ইসরাইলি দখলদারিত্বের। গাজা, পশ্চিম তীরসহ ফিলিস্তিনের সর্বত্র বিক্ষোভ হচ্ছে আল-আকসার পক্ষে। ইসরাইলিদের গুলিতে প্রতিদিনই হতাহত হচ্ছেন নিরীহ ফিলিস্তিনিরা। বিশ্লেষক ওরাবি আল-রানতাবি আরো লিখেছেন, (ফিলিস্তিনিরা জানেন) নিরাপত্তার নামে ইসরাইলের ধরপাকড় আসলে তেলআবিবের দখল ও বসতি স্থাপনের ফন্দি। তারা কিছু বোকা আরবের মতো নেতানিয়াহুর নষ্ট পণ্য কিনবেন না এবং ইসরাইলের মিথ্যা গল্প তারা বিশ্বাস করবেন না। তাই তো কোনো নেতৃত্ব বা সংগঠিত আন্দোলনের অপেক্ষা না করে তারা যার যার অবস্থান থেকেই বিক্ষোভে নেমেছেন। এই বিশ্লেষকের মতে, ফিলিস্তিনিরা জানেন আরবরা প্রতিক্রিয়া দেখালেও তা হবে বড়জোর ওয়াশিংটনে টেলিফোন কিংবা বিবৃতি ও শান্তি স্থাপনের আহ্বান।
একটি বিষয় স্পষ্ট, এবারের ঘটনায় ফিলিস্তিনে মাহমুদ আব্বাসের অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। তার প্রতি আস্থা অনেকগুণ কমেছে নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদেরÑ এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি হামাসের বর্তমান অবস্থানকেই যুক্তিযুক্ত মনে করছেন তারা। কারণ এ ঘটনার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হামাস যদি গাজা থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে হামলা চালায় তাহলে ইসরাইল সুযোগ পেয়ে যাবে বিশ্বসম্প্রদায়ের নজর সেদিকে ঘুরিয়ে নিতে। মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম আল কুদসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আল-আকসা থেকে দৃষ্টি ফেরাতে প্রয়োজনে গাজায় আরেকটি যুদ্ধ বাধাতেও পিছপা হবে না ইসরাইল। যার মাধ্যমে বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে পুরো মুসলিমের। এমনিতেই গত মঙ্গলবার গাজায় ট্যাংকের গোলা নিক্ষেপ করেছে ইসরাইল। ধারণা করা হচ্ছে, হামাসকে প্রতিরোধে উৎসাহিত করতে এটি একটি টোপ। হামাসের সাথে গাজায় যুদ্ধ বাধলে ইসরাইল ও সেকুলার মিডিয়া সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেবে আল-আকসার দিক থেকে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.