প্রিয় বন্ধু

রঙের ঝলক
রফিকুল আমীন খান

বন্ধু একটি শব্দ, যার বিস্তৃতি অসীম। গ্রিক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল বলেছেন ‘বন্ধুত্ব হচ্ছে দুই দেহে বাস করা এক আত্মা’। বন্ধু নিয়ে তার এ কথা আজো দুনিয়াজোড়া খ্যাত। বন্ধু দিবস নিয়ে কথা হবে আর তার কথা আসবে না, তা কী করে হয়? মাত্র আট শব্দে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বন্ধুত্ব কী তা বুঝিয়ে গেছেন। এমারসন বন্ধুত্বকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ বলেছেন। কেউ বলেছেন, ‘বন্ধু মানে নীল সাগরে উছলে পড়া ঢেউ/মনের মতো খুঁজে পাওয়া কেউ। বন্ধু মানে দূরে থেকেও অনেক কাছাকাছি/সকাল-বিকেল জানিয়ে দেয়া বন্ধু আমি আছি।’ এভাবে অনেকে অনেকভাবে ভাবেন বন্ধুকে নিয়ে। সেই বন্ধুত্বের বন্ধনকে মর্যাদা দিতে আগস্টের প্রথম রোববার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বন্ধু দিবস। সে হিসেবে এবারের বন্ধু দিবস ৬ আগস্ট।
সব বয়সেই বন্ধুত্ব হয়। শুধু বয়স ও স্থান-কাল ভেদে সম্পর্কটা একটু ভিন্ন মাত্রায় কিংবা ভিন্ন রঙে প্রকাশ পায় এই যা। এই যেমন ছেলেবেলার বন্ধুত্বের আবেদন থাকে একরকম। সম্পর্কটা কম স্থায়ী হয়। বন্ধু আসে বন্ধু যায়। মানসিক বিকাশ ঘটার সাথে সাথে বন্ধু ও বন্ধুত্বের বিকাশ ঘটে। এভাবে বয়স বাড়তে বাড়তে যখন কৈশোরে পৌঁছে তখন সম্পর্কটা আরেকটু গাঢ় হয়। যৌবনে এ সম্পর্ক নতুন বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। রোমাঞ্চে ভরা থাকে। বার্ধক্যে যা ভিন্ন আবেদন নিয়ে আসে।
যদিও লোভ, লালসা, হিংসাসহ জাগতিক সব অরাজক কর্মকাণ্ড মধুর এ সম্পর্ককে মাঝে মধ্যেই ভুল পথে পরিচালিত করে। সম্পর্কের মাঝে বয়ে আনে বিপর্যয়। তা সত্ত্বেও মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব আছে, থাকবে চিরদিন। মোটকথা সমাজে চলতে হলে বন্ধুত্ব চাই-ই চাই। সমাজে বসবাস করতে হলে কাউকে-না-কাউকে বন্ধু ভাবতেই হবে। যার সাথে সুখ-দুঃখ ভাগ করা যায়। প্রাণ খুলে কথা বলা যায়। যিনি আত্মার আত্মীয়, নির্ভরতার প্রতীক। যাকে বিশ্বাস করে পাড়ি দেয়া যায় সাত সমুদ্র তেরো নদী। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘যদি থাকে বন্ধুর মন গাং পাড় হইতে কতক্ষণ’।
তবে জীবনান্দের ওই গাং পাড়ি দিতে চাইলে প্রয়োজন ভালো বন্ধুত্ব। একজন ভালো বন্ধুই পারে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে দিতে। ভালো বন্ধু সব সময় বন্ধুর ভালো কামনা করেন। বন্ধু হাসলে তিনিও হাসেন, কাঁদলে তিনিও কাঁদেন। বন্ধুর বিপদে যত বাধাই আসুক ছুটে যান বন্ধু। প্রয়োজনে বন্ধুর জন্য আত্মোৎসর্গ করতেও পিছপা হন না। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এমন বন্ধুর সংস্পর্শ পেতে মন ব্যাকুল থাকে।
ভালো বন্ধুত্বের নমুনা জাতীয় কবি নজরুল ও তার মোতাহার হোসেন চৌধুরীর বন্ধুত্বের গল্প থেকে জেনে নিতে পারি। বন্ধু মোতাহার হোসেন চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে নজরুল নিজের আবেগকে এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন, ‘...আমার চোখের জলের মতিহার, বাদল রাতের বুকের বন্ধু। যে দিন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর আর সবাই আমায় ভুলে যাবে, সে দিন অন্তত তোমার বুক বেঁধে উঠবে। আমার জীবনের সবচেয়ে করুণ পাতাটির কথা তোমার কাছে লিখে গেলাম। আকাশের সবচেয়ে দূরের যে তারাটির দীপ্তি চোখের জলকণার মতো ঝিলমিল করবে, মনে কর, সেই তারাটি আমি। আমার নামেই তার নামকরণ কর, কেমন?’
এটাই হলো বন্ধত্ব। বন্ধুর জন্য বন্ধুর মন কাঁদবেই। জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে আজ যে যেখানেই থাকি না কেন চলার পথে বন্ধুত্ব নামের এই পাথেয়টির তুলনা বোধহয় আর কিছুর সাথেই চলে না। এ এমনই বিষয় যেন কিছু না থাকলেও বন্ধুত্ব থাকলে চলে আবার সব থাকলেও বন্ধুত্ব ছাড়া চলে না! কিন্তু বন্ধুত্ব তো তাই যাকে কোনো নিক্তি দিয়ে মাপা যায় না, সংজ্ঞা দিয়ে বাধা যায় না। হয়তো তার প্রয়োজনও নেই। তবু মানুষ যুগে যুগে দেশে দেশে বন্ধুত্বকে যেমন উদযাপন করেছে, তেমনি একে ব্যাখ্যা করারও চেষ্টা করেছে। সে কারণেই এখন দেশে দেশে বন্ধু দিবস পালিত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভাবনার শেষ নেই যেন। তাদের কাছেই শুনি বন্ধু দিবস নিয়ে তাদের ভাবনা।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রী স্বর্ণা বন্ধু দিবস নিয়ে বললেন, “এদিন আমরা বন্ধুরা মিলে খুব মজা করি। বাইরে ঘুরতে যাই এবং সবাই একসাথে খাওয়া-দাওয়া করি। একে অপরকে বিভিন্ন উপহার দিই। তবে এবারের ফ্রেন্ডশিপ ডে’টা একেবারে নিরামিষ যাবে; কারণ ক’দিন পরই ফাইনাল পরীক্ষা, তাই ঘুরতে বের হওয়া হবে না। কিন্তু মোবাইলে ওদের উইশ করব।”
ইমরান নাজির একটি বায়িং হাউজে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘স্টুডেন্ট লাইফের বন্ধুত্বটাই অনেক বেশি উপভোগ্য। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা ক্লাস শেষে দল বেঁধে বন্ধুরা মিলে কলেজের মাঠে বসে আড্ডা দিতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এখন নানা ব্যস্ততার কারণে সে বন্ধুদের খোঁজই নেয়া হয় না। তবে স্টুডেন্ট লাইফের সে সব বন্ধুদের এখনো খুব ফিল করি। মাঝে মধ্যে তাদের সাথে ফেসবুকে কথা হয়। ইচ্ছে আছে এবারের ফ্রেন্ডশিপ ডেতে সেসব বন্ধুর নিয়ে সেই কলেজের মাঠে বসে আগের মতো আড্ডা দেয়া।
বন্ধু দিবস নিয়ে এভাবে তরুণদের ভাবনার শেষ নেই যেন। তবে ঠিক কবে থেকে বন্ধু দিবস পালন করা হচ্ছে তার সঠিক ইতিহাস নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে বেশ কিছু ইতিহাস দেখে ধারণা করা যায় ঊনবিংশ শতাব্দীর ত্রিশ থেকে চল্লিশের দশকের মধ্যবর্তী সময়েই বন্ধু দিবস পালন শুরু হয়। বেশ কয়েকটি বন্ধু দিবসবিষয়ক ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ বিশেষত প্যারাগুয়েতে প্রথম বন্ধু দিবস পালন শুরু হয়। সালটা ছিল ১৯৫৮।
অনেকেই আবার ধারণা করেন ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই দিন উদযাপন শুরু হয়। পরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যায়। এসব দেশে বন্ধু দিবসে বন্ধুদের ফুল, কার্ড, রিস্ট ব্যান্ড প্রভৃতি উপহার দিয়ে বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়।
সে যাই হোক, বন্ধু দিবস নিয়ে যত বিতর্কই থাক না কেন ছোট্ট একটি শব্দ হলেও এর বিস্তৃতি কিন্তু কোনো সীমারেখার মধ্যে বেঁধে দেয়া যাবে না। বন্ধুত্বের পরিধি আকাশের মতো সীমাহীন, সাগরের মতো বিশাল। তাই বন্ধু দিবসে সব বন্ধুত্বের বন্ধন হোক আরো অটুট। এ কামনা সব বন্ধুর জন্য। ভালো থেকো বন্ধু।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.