ডা: এনামের আত্মস্বীকৃতি ও জননিরাপত্তা
ডা: এনামের আত্মস্বীকৃতি ও জননিরাপত্তা

ডা: এনামের আত্মস্বীকৃতি ও জননিরাপত্তা

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারের সাথে আমরা খুব একটা পরিচিত ছিলাম না; যতটা এখন পরিচিত হয়েছি। এসব শব্দ অভিধানের চৌহদ্দির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত নিকট অতীতে। কারণ, এগুলোর ব্যবহার সচরাচর হতো না, বরং দেখা যেত একেবারেই কালেভদ্রে। দেশের সাধারণ মানুষ তো দূূরের কথা, অগ্রসর মানুষও এ শব্দগুলোর সাথে খুব কমই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু হালে এসব শব্দের অতি ব্যবহারই শুধু নয় বরং অপব্যবহারও শুরু হয়ে গেছে। আর এর মাত্রাটাও বেশ উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো, যা দেশের আত্মসচেতন মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিশ্চিত করে বলা খুবই মুশকিল।

সঙ্গতকারণেই দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা এসব শব্দের সাথে অতিপরিচিত হয়ে উঠেছেন। প্রথম দিকে এ নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এগুলোর যথেচ্ছ প্রয়োগ ও অপব্যবহারের কারণে গণমানুষের আগ্রহে ভাটা পড়েছে মনে করছেন বিদগ্ধজনেরা। আতঙ্ক কিন্তু পিছুও ছাড়ছে না এ নিয়ে। কোন দিন কখন কাকে ক্রসফায়ার দেয়া হচ্ছে, এ নিয়ে মহাতঙ্ক জনমনে দানা বেঁধে উঠেছে এবং প্রতিনিয়ত তাদের তাড়া করে ফিরছে এক অজানা আতঙ্ক। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছে। জননিরাপত্তা হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। সহসাই এ অবস্থার উত্তরণ না ঘটলে আমাদের ভাগ্যে আরো বিপত্তি আছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

যদিও ক্রসফায়ারবিষয়ক কর্মযজ্ঞ বিশেষ শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এখন পর্যন্ত। কিন্তু একটা অজানা উদ্বেগ সাধারণ মানুষের প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে। কারণ, ক্রসফায়ারবিষয়ক যে কল্পকাহিনী শোনানো হয়, তা রীতিমতো ‘আষাঢ়ে গল্প’; এর সাথে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক খুব একটা থাকে না। এমনই মনে করেন দেশের সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ। তাই এর আওতায় কে কখন এসে যায় তা ঠাহর করা বেশ কষ্টসাধ্যই বলতে হবে। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে অজানা আতঙ্ক।
আমরা যখন ক্রসফায়ার আর এনকাউন্টার শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হলাম, তখন রাষ্ট্রপক্ষ ফলাও করে প্রচার করতÑ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমাজবিরোধী তথা সন্ত্রাসীদের পাকড়াও করতে অভিযান চালালে সন্ত্রাসীরা নিরাপত্তাবাহিনীর ওপর গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে নিরাপত্তাবাহিনীর কর্মীরা পাল্টা গুলি করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসীদের মৃত্যু হয়। কিন্তু এসব গুলিবিনিময়ের সময় কখনো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হতাহত হতে দেখা যায়নি। ফলে এ নিয়ে কানাঘুষাও কম হয়নি। আর এসবের যৌক্তিক কারণ আছে বলেও মনে হয়।

মূলত এভাবেই আমাদের দেশে ক্রসফায়ার নামের অভিনব কর্মতৎপরতার সূচনা হয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি কখনোই প্রশ্নাতীত ছিল না, বরং এসব ঘটনাকে তখনো কল্পকাহিনীই মনে করতেন সব শ্রেণীর মানুষ। কিন্তু বর্তমান সময়ের ক্রসফায়ারের সাথে সে সময়ের ক্রসফায়ারের একটা তফাত ছিল বেশ দৃশ্যমান। তখন যারা ক্রসফায়ারে মারা যেত তাদের প্রায় সবাই ছিল চিহ্নিত সমাজবিরোধী ও ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। কালেভদ্রে এর ব্যত্যয় ঘটতেও দেখা যেত। কিন্তু তা মোটেই উল্লেখযোগ্য ছিল না। মূলত এসব কথা বলে ক্রসফায়ারকে বৈধতা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, অপরাধী যত বড়ই অপরাধ করুক না কেন আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার তার অবশ্যই আছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই কথিত ক্রসফায়ারের নামে নরহত্যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তাই এসবকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা বলায় অধিক যুক্তিযুক্ত বলেই মনে হয়।

আমাদের দেশে ক্রসফায়ার নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। বিরোধী দল, সুশীলসমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল, মানবাধিকার সংস্থাসহ সব মহলই এসব ক্রসফায়ারের বিষয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করে এসেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক মহলও বিষয়টি নিয়ে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেছে। কিন্তু ক্রসফায়ার নামে এই আজব ঘটনার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে ক্রসফায়ারের আওতা বেড়েছে বলেই মনে হয়। শুরুতেই শুধু চিহ্নিত ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীরা ক্রসফায়ারের লক্ষ্যবস্তুতে থাকলেও সে ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতার পর এর পরিধি বাড়ানো হয়েছে বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞমহল। অভিযোগ আছে, সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে ভিন্নমতকে দমনের জন্য চরমপন্থা বেছে নিয়েছে এবং বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার পরিবর্তে বলপ্রয়োগের অনৈতিক পন্থার আশ্রয় নিয়েছে।

এর আওতা থেকে বাদ যাচ্ছেন না ভিন্নমতের সুশীলব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। সব পেশার মানুষ ক্রসফায়ারের মুখোমুখি না হলেও গুম, অপহরণ ও গুপ্তহত্যার শিকার হচ্ছেন, গণমাধ্যমের দিকে তাকালে এমনটা মানে করার যথেষ্ট কারণ আছে। সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এক প্রতিবেদনে বিগত ছয় মাসে ৮৫ জনকে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশিত প্রতিবেদনে অবৈধভাবে আটক ও গুমের বিষয়ে ৮২ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ঘটনার যদি কিয়দংশও সত্য হয়, তাহলে তা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে।

কয়েক বছর ধরে ক্রসফায়ার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ চলছে। বিষয়টি নিয়ে এত তির্যক সমালোচনা হলেও সরকার এটি বন্ধ করেনি, বরং তা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সরকার বা বিরোধী পক্ষের এ বিষয়ে কোনো অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। ফলে ক্রসফায়ার নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল তা আগের মতোই রয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি ক্রসফায়ার নিয়ে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ডা: এনামুর রহমানের এক বক্তব্যে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। উঠেছে সমালোচনার ঝড়, যা ক্রসফায়ারসংক্রান্ত সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থানে প্রতিকূলে এবং বিরোধী দলগুলোর দাবির অনুকূলে চলে গেছে, যা সরকারকে কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিগত কয়েক বছরে সারা দেশে ক্রসফায়ারের নামে র‌্যাব-পুলিশ বিএনপি-জামায়াতের যেসব নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে, সরকারের ইশারাতেই এসব হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের দেয়া তালিকা অনুযায়ীই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাসাবাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করেছে। যার আত্মস্বীকৃতি সরকারদলীয় এমপি ডা: এনামুর রহমানের বক্তব্য থেকে মিলেছে। অবশ্য তিনি তার দেয়া বক্তব্য গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কিন্তু হত্যার আত্মস্বীকৃতি দেয়ার পর তা প্রত্যাহার কতটা তার অনুকূলে যাবে সে প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

কেউ কেউ একথা বলতে চাচ্ছেন, ডা: এনামের আত্মস্বীকৃতি পুরো দেশেরই বাস্তব চিত্র। কিন্তু আমরা এ কথা বলতে চাই না। কারণ, একজন সরকারদলীয় এমপির আত্মস্বীকৃতির জন্য সরকারদলীয় সব এমপি বা সরকারকে কোনো তথ্য-উপাত্ত ছাড়া দায়ী করা মোটেই সঙ্গত হবে না। কিন্তু সন্দেহ করার একটা অবকাশ তো থেকেই যাচ্ছে। কারণ, ক্রসফায়ারের ঘটনা শুধু যে সাভার এলাকায় ঘটেছে এমন তো নয়, বরং বিরোধী দল প্রভাবিত সব এলাকায়ই হয়েছে। তাই সন্দেহের তীরটা তো সংশ্লিষ্ট এমপি ও সরকারের দিকেই। তাই এই সন্দেহ অপনোদনের দায়িত্বও সরকারের। ডা: এনামের বক্তব্য যদি সরকারের বক্তব্য না হয়ে থাকে তাহলে সেটাও জনগণের কাছে খোলাসা করার দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। সরকার যদি এ বিষয়ে তাদের অবস্থান দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট করতে না পারে তাহলে তো এ ব্যর্থতার দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।

smmjoy@gmail.com

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.