রুশ-মার্কিন অস্থির সম্পর্ক

আহমেদ বায়েজীদ

রাশিয়ার ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পাস হওয়ার পর বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের অপেক্ষায়। ট্রাম্পের ক্ষমতা রয়েছে বিলটিতে স্বাক্ষর না করে ভেটো দেয়ার। তিনি কোন পথে হাঁটবেন সেটি স্পষ্ট নয়। তবে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করতে যাচ্ছেন বিলটিতে। রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অবরোধ আরোপ করলে কী হবে তার ফলাফল, রাশিয়াই বা কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে? আর বিশ্বের বৃহৎ শক্তিধর দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কই বা কোন পথে অগ্রসর হবে? কোনো কিছুই আগাম বলার সুযোগ নেই, তার প্রমাণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আগে একাধিকবার দিয়েছেন।
গত বছরের মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তার ও ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয়ার অভিযোগে রাশিয়ার ওপর নতুন করে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে উদ্যোগী হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ কট্টর সমালোচকেরাও প্রত্যাশা করেননি। ট্রাম্পের রাশিয়াপ্রীতি নতুন নয়। নির্বাচিত হওয়ার আগ থেকেই তিনি রাশিয়া ও ভøাদিমির পুতিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। এমনকি বারাক ওবামার চেয়ে পুতিনকে যোগ্য রাষ্ট্রনায়ক আখ্যা দিয়ে মার্কিনিদের সমালোচনাও কুড়িয়েছেন। ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পরও দেশ দু’টির দীর্ঘ দিনের সম্পর্কে নতুন মোড় নেবে বলেই আশা করা হচ্ছিল। কেউ কেউ তো এক ধাপ অগ্রসর হয়ে এমন আশা করেছিলেন যে শুধু সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বন্ধুত্বও গড়ে উঠতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুগে। অবশ্য সেই প্রত্যাশার মাঝে একটা বড় খুঁত হয়ে ছিল রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের আনুগত্য। রাশিয়ার ‘আশীর্বাদ’ নিয়ে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছেন এমন কথা তো হরহামেশাই উঠে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে। ফলে সব মিলেই দু’টি দেশের সম্পর্ক নতুন একটি যুগে প্রবেশ করবে বলে আভাস দিয়েছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকাররা। পুতিন ও ট্রাম্পের মুখ থেকে এ বিষয়ে অনেক কথাও শোনা গেছে। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই পদক্ষেপ অনেকটাই অপ্রস্তুত করে দিয়েছেন সবাইকে। উল্টো রাশিয়ার সাথে আরো বৈরিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই নিষেধাজ্ঞার ফলে। সিএনএন ও ইউএসএ টুডের কলামিস্ট খ্যাতিমান মার্কিন বিশ্লেষক ডেভিড এ অ্যান্ডেলম্যানের ভাষায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন। এখন তাকে উল্টো রুশ-চীন জোটের মোকাবেলা করতে হয় কি না তার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রসঙ্গত চলতি সপ্তাহেই বাল্টিক অঞ্চলে যৌথ নৌমহড়া চালিয়েছে রাশিয়া ও চীনা নৌবাহিনী।
ধারণা করা হচ্ছে, রাশিয়া ইস্যুতে কঠোর হওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও দলীয় নেতাদের চাপে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এতে বাধা দিতে পারেননি। একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে এমনিতেই ট্রাম্পের ইমেজ টালমাটাল অবস্থায়। তাই রাশিয়াপ্রীতি থাকলেও তা প্রকাশ করতে পারেননি এ যাত্রায়। রিপাবলিকান পার্টির হাই প্রোফাইল অনেক নেতাই প্রকাশ্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। ক্রিমিয়া ইস্যুতে বারাক ওবামার সময়ই রাশিয়ার ওপর বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই এবারের এই পদক্ষেপের প্রধান চালিকা হয়তো নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার কিংবা ট্রাম্পের প্রচারণা দলের সাথে বেআইনি যোগাযোগ। তবে কোনো কিছুর সম্ভাবনাই এখনো শেষ হয়ে যায়নি। যদিও মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নি¤œ কক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে কংগ্রেসম্যানদের একচেটিয়া সমর্থনে পাস হয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা। তবে শেষ কার্ডটি কিন্তু প্রেসিডেন্টের হাতেই রয়েছে! তিনি স্বাক্ষর করলে বিলটি আইনে পরিণত হবে, আর স্বাক্ষর না করে ভেটো দিলে সেটি আবার চলে যাবে কংগ্রেসে। সে ক্ষেত্রে নতুন করে দরকার হবে আরো আনুষ্ঠানিকতার।
ট্রাম্প কী করবেন সেটি হয়তো একমাত্র তিনিই জানেন। তবে এবার দলীয় এমপিদের যে চাপ তার ওপর রয়েছে তাতে একগুঁয়েমি কোনো আচরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তা ছাড়া ঘরে-বাইরে প্রেসিডেন্ট যতখানি চাপে রয়েছেন তাতে তার পক্ষেও সহজ হবে না সবার মতকে উপেক্ষা করা। ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ঠিকমতো ঘর গুছিয়ে নিতে পারেননি। একের পর এক কর্মকর্তা পাল্টানো হচ্ছে প্রশাসনে। রাজনীতি ও কূটনীতি কোনো ক্ষেত্রেই ‘দল গুছিয়ে মাঠে নামার’ লক্ষণ নেই তার মধ্যে। সর্বশেষ হোয়াইট হাউজ থেকে বিদায় নিয়েছেন গণমাধ্যম প্রধান অ্যান্থনি স্কারামুচি। যোগদানের মাত্র ১০ দিনের মাথায় তিনি চাকরি হারিয়েছেন। তার ওপর রয়েছে রুশ সংযোগ নিয়ে বিতর্ক। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি যাকে বলছে, ‘হোয়াইট হাউজের আকাশে রুশ মেঘ’। এসবই ট্রাম্প প্রশাসনে অস্থিরতার লক্ষণ। আর সে কারণেই ধারণা করা হচ্ছে দলীয় নীতিনির্ধারকদের মতের বাইরে গিয়ে ট্রাম্প রাশিয়ার প্রতি নিষেধাজ্ঞা বিলে স্বাক্ষর না করে পারবেন না। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সও মঙ্গলবার এমন আভাস দিয়েছেন।
ট্রাম্প বিলে স্বাক্ষর করবেন কি করবেন না তার অপেক্ষা না করেই প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু হয়েছে রাশিয়ার পক্ষ থেকে। মস্কোর মার্কিন দূতাবাস থেকে সাত শতাধিক কর্মীকে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। হুমকি দিয়েছেন আরো কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর। কাজেই আগামী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসে কী ঘটতে চলেছে তা অনুমান করার কোনো সুযোগ নেই। তবে দু’টি দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যে আশাবাদ দেখা গিয়েছিল তা যে হচ্ছে না সেটি অনেকটাই নিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে এমন ধারণা হয়তো ছিল না রাশিয়ার। ট্রাম্প ক্ষমতায় আশার পর তাদের প্রত্যাশা ছিল অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিবিসির কূটনৈতিক রিপোর্টার ও বিশ্লেষক জনাথান মার্কাসের ভাষায়, ‘রাশিয়া আবহাওয়া পরিবর্তনের আশায় ছিলÑ যার মধ্যে অন্যতম ছিল পশ্চিমা অবরোধ প্রত্যাহার। তার চেয়েও বেশি যে জিনিসটি তাদের কাক্সিত ছিল তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছা, যা সারা বিশ্বে ওয়াশিংটনের সমান মর্যাদা এনে দেবে মস্কোকে। সিরিয়া কিংবা আইএসবিরোধী যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে সমান গুরুত্ব পাবে হোয়াইট হাউজ ও ক্রেমলিন। কিন্তু তাদের এই স্বপ্ন মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে।’
এই বিশ্লেষক মনে করেন রাশিয়া আসলে ট্রাম্প যুগের যুক্তরাষ্ট্রকে অবমূল্যায়ন করেছে। ট্রাম্প তার অস্থির ও অনুগত মানসিকতা নিয়ে রাশিয়ার ওপর কোনো অবরোধ আরোপ করতে পারবেন সেটি ধারণাই ছিল না মস্কোর। রাশিয়া যেমন আশা করেছিল বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আবার রাশিয়ার পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া নিয়েও আছে দ্বিমত। কেউ কেউ মনে করেন কূটনৈতিক কর্মী হ্রাসের মতো ‘সহজ’ একটি ব্যবস্থা নিয়ে রাশিয়া নিজেদের দুর্বলতাই প্রকাশ করল। কারো কারো কাছে রাশিয়ার এই ব্যবস্থা হাস্যকরও। তবে অনেকে মনে করেন তুলনামূলক সহজ অ্যাকশন নিয়ে রাশিয়া মূলত সম্পর্ক রক্ষার দরজা খোলা রাখতে চাইছে। যেকোনো মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্রতা বা সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে রাশিয়ার জন্যই তা অনেকগুণ বেশি লাভজনক। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার দাপট বা কূটনৈতিক তৎপরতা যতই থাকুক, মূলত এখনো রাশিয়ার অবস্থান বিশ্বে য্ক্তুরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক পেছনে। এখনো বিশ্ব ব্যবস্থার প্রধান চালিকা পশ্চিমা বিশ্ব। আর রাশিয়ার জন্য সেই ঘাটতি পূরণের প্রধান শর্ত হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়ে পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.