চীনের নিয়ন্ত্রণে শ্রীলঙ্কার বন্দর উদ্বিগ্ন ভারত

আদিবা শাইয়ারা

ভারতের নানামুখী চাপ উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত হাম্বানটোটো বন্দরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে তুলে দিলো শ্রীলঙ্কা। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি আরো শক্ত হলো। কৌশলগত কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে আরব সাগর পর্যন্ত মুক্তার মালার মতো বন্দর বানাচ্ছে চীন এমন অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের। মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের গোয়াদরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে দেশটি। বাংলাদেশেও একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীন আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এসব বন্দরের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকলেও ভারতের আশঙ্কা সামরিক প্রয়োজনে চীন এসব বন্দরকে ব্যবহার করবে। চীনের যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন এসব বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার দণিাঞ্চলীয় হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না মার্চেন্ট পোর্ট হোল্ডিংস (সিএমপোর্ট)। ১১২ কোটি ডলারে ৯৯ বছরের জন্য বন্দরটি ইজারা নিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এই কোম্পানি। সিএমপোর্ট অবশ্য আগে থেকে কলম্বো গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করছে। কৌশলগত বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হাম্বানটোটা বন্দর অধিগ্রহণের সুবাদে শ্রীলঙ্কার দু’টি গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনা কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হলো।
শ্রীলঙ্কার বন্দর ও নৌবিষয়ক মন্ত্রী মাহিন্দ্রা সামারাসিংহে এবং কলম্বোয় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত য়ি জিয়ানলিং নিজ নিজ দেশের পে চুক্তি স্বার করেন। কলম্বোয় বন্দর ও নৌবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চুক্তি স্বারের পর মাহিন্দ্রা সামারাসিংহে বলেন, চলতি সপ্তাহে কয়েকটি দেশ হাম্বানটোটা বন্দর হস্তান্তরের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। আমরা বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ প্রশমনের উদ্যোগ নিয়েছি। এই বন্দর নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে তিনি ইঙ্গিত করে এই বক্তব্য রাখেন।
এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের পাশেই হাম্বানটোটা বন্দরের অবস্থান। গভীর সমুদ্রে বন্দরটি অধিগ্রহণের মাধ্যমে চীন ভারত মহাসাগরে সামরিক সুবিধা পেতে পারে বলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প থেকে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এ নিয়ে শ্রীলঙ্কার ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে ভারত। শ্রীলঙ্কার মন্ত্রী মাহিন্দ্রা সামারাসিংহে বলেছেন, চীন হাম্বানটোটা বন্দর পরিচালনা করবে। কিন্তু বন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব শ্রীলঙ্কার হাতেই থাকবে। হাম্বানটোটা বন্দরে কোনো দেশের নৌঘাঁটি হবে না। শ্রীলঙ্কার আইন অনুযায়ী বন্দর পরিচালিত হবে, এ মর্মে আমাদের শর্তে চীন সম্মত হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে বন্দর পরিচালনার বিষয়ে শ্রীলঙ্কা ও চীনের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তি স্বার হয়। ওই চুক্তিতে চীনা কোম্পানি সিএম পোর্টের হাতে হাম্বানটোটা বন্দরের ৮০ শতাংশ মালিকানা হস্তান্তরের কথা বলা হয়। বাকি অংশের মালিকানা রাষ্ট্রায়ত্ত শ্রীলঙ্কা পোর্ট অথোরিটির (এসএলপিএ) কাছে থাকবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়। বন্দরের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার দণিাঞ্চলীয় প্রদেশে চীনের একটি সংরতি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথাও চুক্তিতে বলা হয়। হাম্বানটোটা একটি লোকসানি বন্দর। ২০১৫ সাল থেকে এ বন্দর মাত্র ৪৪টি জাহাজ হ্যান্ডল করেছে। বন্দরের জন্য চীনের কাছ থেকে যে ঋণ নেয়া হয়েছে, নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেটাই পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এর আগে শ্রীলঙ্কার কলম্বো গভীর সমুদ্রবন্দর অধিগ্রহণ করে সিএমপোর্ট। চীনা কোম্পানিটি এক দশকের বেশি সময় ধরে বন্দরটি পরিচালনা করছে। শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ্রা রাজাপাকসের সময়ে এ অধিগ্রহণ চুক্তি হয়। রাজাপাকসের মতার শেষ বছর অর্থাৎ ২০১৪ সালে কলম্বো গভীর সমুদ্রবন্দরে চীনের দু’টি সাবমেরিন নোঙর করায় ভারত ােভ প্রকাশ করেছিল। এবারের চুক্তি স্বারের পর শ্রীলঙ্কার মন্ত্রী মাহিন্দ্রা সামারাসিংহে বলেছেন, বিদেশী কোনো সামরিক নৌযান কেবল শ্রীলঙ্কার অনুমোদনক্রমেই হাম্বানটোটায় নোঙর করতে পারবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে লোকসানি এই বন্দরটি শেষ পর্যন্ত চীন লাভজনক করতে সক্ষম হবে। কারণ এই বন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠবে চীনা বিনিয়োগে বিশাল শিল্পাঞ্চল। বন্দরটি চীনা কোম্পানির হাতে চলে যাওয়ার মাধ্যমে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনের প্রভাব যে অব্যাহতভাবে বাড়ছে তা আরেকবার প্রমাণ হলো। একই সাথে অর্থনৈতিক কারণে ভারত এই প্রভাব মোকাবেলার সক্ষমতা দেখাতে পারবে না তাও স্পষ্ট হয়ে গেল। কারণ শুধু ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো বিনিয়োগবিমুখ নীতি গ্রহণ করতে পারবে না কিংবা বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা প্রকল্প বছরের পর বছরে অকার্যকর করে রাখতে পারবে না।
আরব সাগরের তীরে পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর এবং ভারত মহাসাগরে হাম্বানটোটা বন্দরে চীনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কারণে চীনের কৌশলগত অবস্থান আরো শক্তিশালী হলো। গোয়াদর বন্দরের মাধ্যমে সরাসরি চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াংয়ের সাথে সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের জ্বালানি সরবরাহের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হবে। অপর দিকে হাম্বানটোটো বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে চীনের বন্দরগুলোতে পণ্য পরিবহন করা সহজ হবে। চীন ইতোমধ্যে বেল্ট ওয়ান পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বন্দর ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে স্থাপন করা হচ্ছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ।
ভারতের পক্ষ থেকে চীনের বেল্ট ওয়ান পরিকল্পনার বিরোধিতা করা হচ্ছে। ভারত মনে করে, চীনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভারতের প্রভাব আরো কমবে। অর্থনৈতিক কারণে চীনের ওপর এসব দেশের নির্ভরতা বাড়ছে। এ ছাড়া চীন উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য এখন বহু শিল্প কারখানা বিভিন্ন দেশে সরিয়ে নিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই সুযোগ সহজেই নিতে পারবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গভীর সমুদ্রবন্দরের পাশে গড়ে তোলা হচ্ছে সংরক্ষিত শিল্পাঞ্চল।
হাম্বানটোটাতেও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। যেখানে বিপুল শ্রীলঙ্কার নাগরিকের কর্মসংস্থান হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনের উপস্থিতি নিয়ে ভারত এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু চীনকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে সে পথ ভারতের জানা নেই। কারণ প্রশ্নটি অর্থনৈতিক সক্ষমতার, যা ভারতের নেই। কারণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা থেকে সামরিক পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করে। চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোকে ঘিরে যদি চীনের কোনো সামরিক পরিকল্পনা থেকেও থাকে তা ভারতের পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.