ভাই শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে দল ও সরকারের ওপর নওয়াজের পুরো প্রভাব থাকবে
ভাই শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে দল ও সরকারের ওপর নওয়াজের পুরো প্রভাব থাকবে

অনিশ্চিত গন্তব্যে পাকিস্তান

আলফাজ আনাম

পাকিস্তানে গণতন্ত্র আরেক বার হোঁচট খেল। নির্বাচিত সরকারের পতন না ঘটলেও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে মেয়াদ শেষ করার আগে সরে দাঁড়াতে হলো। পানামা পেপারসে তার ও পরিবারের সদস্যদের নাম আছে এমন অভিযোগ তদন্ত করে পাকিস্তানের আদালত। এই তদন্তের সূত্র ধরে ২০১৩ সালের নির্বাচনে নিজ প্রার্থিতার মনোনয়নপত্রে নওয়াজ শরিফ তার সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক (ইউএই) কোম্পানি এফজেডই ক্যাপিটালের কাছ থেকে পাওয়া ১০ হাজার দিরহাম সম্মানী প্রদর্শন করেননি এই প্রমাণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষণা করে এই রায় প্রদান করে। পাকিস্তানের রাজনীতির বিশ্লেষকেরা মনে করেন এই রায়ের পেছনে নওয়াজকে সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সামরিক-বেসামরিক একটি মহল সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এ ক্ষেত্রে আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে কাজটি সারা হয়েছে। কারণ আদালত যে যৌথ তদন্ত দল গঠন করে তাতে পাকিস্তানের দু’টি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিও ছিল।
নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন শহিদ খাকান আব্বাসি। যিনি নওয়াজ শরিফের মন্ত্রিসভায় জ্বালানি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মেয়াদ হবে ৪৫ দিন। আব্বাসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির একটি মামলা চলমান রয়েছে। নওয়াজ শরিফের ভাই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়ে আসার পর তিনি যে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নিশ্চিত। এর মধ্যে দুর্নীতির মামলায় হয়তো নওয়াজকে কারাগারে যেতে হতে পারে। একই পরিণতি হতে পারে তার মেয়ে মরিয়মের।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন স্বাধীন বিচার বিভাগের কারণে নয় বরং নওয়াজের সাথে পাকিস্তানের সামরিক আমলাতন্ত্রের বিরোধের কারণে তাকে ক্ষমতা থেকে হয়তো সরে দাঁড়াতে হলো। তবে সার্বিকভাবে পাকিস্তানের রাজনীতি এখন আদালতের দুয়ারে। নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণার রায়ে উল্লাস প্রকাশ করেছে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ (পিটিআই)। নওয়াজের পদত্যাগের ঘোষণার পর রাস্তায় রাস্তায় মিষ্টি বিতরণ করেছে দলটির নেতাকর্মীরা। এখন ইমরানের দলের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। যে অর্থের কোনো উৎস প্রকাশ করা হয়নি। এ অভিযোগের শুনানি চলছে আদালতে। তবে ইমরান খান পাকিস্তানের প্রভাবশালী মহল বিশেষ করে সেনাবাহিনীর একটি অংশের নীরব সমর্থন পাচ্ছেন এমন গুঞ্জন রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আদালতের রায় তার বা তার দলের প্রতিকূলে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
নওয়াজের বিরুদ্ধে আদালতের এই রায়ে পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে মাসে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে আদালতে পিটিশন করেছিল ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ (পিটিআই), জামায়াতে ইসলামি পাকিস্তান ও জমহুরি ওয়াতন পার্টি। পিটিশন দায়েরের পর নওয়াজের অর্থপাচারের স্বপক্ষে আদালতে নথি জমা দেয় পিটিআই। এরপর আদালত চলতি বছরের মে মাসে একটি যৌথ তদন্ত দল গঠন করে। তদন্ত দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে এই রায় প্রদান করে।
নওয়াজ শরিফ সরকারের বিরুদ্ধে ইমরান খান দীর্ঘ দিন থেকে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। তিনি একাধিকবার রাজধানী ইসলামাবাদে অবস্থান ধর্মঘট করেছেন। সেখান থেকে সরকার পতনের ডাক দেয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়। এর আগে কানাডা প্রবাসী এক ধর্মীয় নেতা তারিকুল কাদরি হঠাৎ করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে উদয় হয়েছিলেন। লাখখানেক মানুষ নিয়ে বিশাল এক শোডাউন করেছিলেন। এরপর হঠাৎ করে পাকিস্তানের রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে তিনি হারিয়ে যান। পাকিস্তান ত্যাগ করে ফিরে যান কানাডায়। অবশ্য ইমরান খান হারিয়ে যাননি তিনি লেগে আছেন। কিন্তু তার পেছনে কারা আছে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ। অবশ্য ইমরান খানের দলই বলতে গেলে পাকিস্তানের এখন প্রধান বিরোধী দল। নেতৃত্বের শূন্যতায় পাকিস্তান পিপলস পার্টি দুর্বল রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্ম প্রকাশের স্বপ্ন দেখছেন ইমরান খান।
প্রভাবশালী মহলের সমর্থন নিয়ে ইমরান খান হয়তো নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করতে পেরেছেন। কিন্তু আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার মতো রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করা সহজ হবে না। কারণ পাকিস্তানের রাজনীতিতে নওয়াজের দল এখনো সবচেয়ে সুসংগঠিত। এ ছাড়া ক্ষমতা হারানোর মতো বৈরি পরিস্থিতি তাকে অনেকবার মোকাবেলা করতে হয়েছে। কিভাবে এমন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হয় তা তার জানা। এ ছাড়া দল বা সরকারের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণও থাকছে। ভাই শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে দল ও সরকারের ওপর তার পুরো প্রভাব থাকবে।
মেয়াদ শেষ করার আগে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর এমন পরিস্থিতি আগেও নওয়াজ শরিফকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। ১৯৯৩ সালে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তিনি বরখাস্ত হয়েছিলেন। আর ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ অভ্যুত্থান করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। অবশ্য শুধু নওয়াজ শরিফ নন, পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। এখন নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক দল মুসলিম লিগ (এন) শেষ পর্যন্ত সরকারের মেয়াদ কিভাবে শেষ করে এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনে দলটির অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা নিয়ে এখনই আলোচনা শুরু হয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতির মামলায় শেষ পর্যন্ত নওয়াজ শরিফের পরিণতি কী হয় তাও দেখার বিষয়। সম্ভবত পাকিস্তানের ভাগ্যনিয়ন্তা বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে তাকে একটি শিক্ষা দেয়ার জন্য এমন রায় এসেছে। এতে নওয়াজ শরিফের রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটতে যাচ্ছে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। আবার সামনে দিনগুলো তার জন্য যে আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে পাকিস্তানের রাজনীতিতে আরো বহু ঘটনা ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটিতে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না সেটি বড় প্রশ্ন।
তবে পাকিস্তানের দুই মেরুর মিত্র দেশ চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই চাইবে দেশটিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। কারণ পাকিস্তানে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে এর প্রভাব আফগানিস্তানে এসে পড়ে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। অপর দিকে পাকিস্তানে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ রয়েছে চীনের। পাকিস্তান চীনের এখন সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর ও গোয়াদর বন্দরের মতো বড় প্রকল্পগুলো চালু রাখতে দেশটিতে স্থিতিশীলতা খুবই জরুরি। ফলে পাকিস্তানের রাজনীতির নেপথ্য যারা ভূমিকা রাখছেন তাদের ওপর এক ধরনের চাপ থাকবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.