এ যুগের দেবদাস

তারেকুর রহমান

দেবদাস একটা বটগাছের নিচে বসে আছে। এলোমেলো চুল, দেখলে মনে হয় কয়েক সপ্তাহ গোসল করেনি। গালের দাঁড়িগুলো বড় হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি জমেছে। একলা একলা বিড় বিড় করে কি যেন বলছে। একটু আগে দেবদাসের বাবা এসে ধমক দিয়ে বলে গেছেÑ শোন দেবু, এসব পাগলামি ছাড়। দুপুর হওয়ার আগে বাসায় ফিরবি। না হয় এমন মাইর দিমু, পুরা চেহারার ডিসপ্লে চেঞ্জ হয়ে যাবে। দেবদাস ওরফে দেবু এসব তোয়াক্কা করার মানুষ না। প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়েছে এটা এলাকাবাসীকে বোঝাতে হবে। তাই এই বেশ ধরেছে দেবদাস।
ফেসবুক অ্যাক্টিভিস্ট দেবদাস। খুঁজে খুঁজে মেয়েদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোই তার কাজ। যেখানে সেখানে গিয়ে কমেন্টস করে অ্যাড করার জন্য বলা তার স্বভাব।
একই গ্রামের সুন্দরি মেয়ে পার্বতীর সাথে তার ফ্রেন্ডশিপ হয়। পার্বতী অবশ্য ফেসবুকে এঞ্জেল পার্বতী নামে পরিচিত। তার ফলোয়ারের সংখ্যা কিছু দিন আগেই পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। দেবদাস তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতেই পারছিল না।
বারবার মেসেজ পাঠানোর পর পার্বতীই দেবদাসকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। পার্বতী ফেসবুকে হা হা লিখে পোস্ট দিলেও দুই তিন হাজার লাইক পড়ে। এটা দেবদাসের ভালো লাগে না। তার খুব হিংসা হয়। পার্বতীকে ভালো লাগে দেবদাসের। কিন্তু এত জনপ্রিয় একজন ফেসবুক ইউজারের প্রেমে পড়া সহজ কথা না। এর জন্য আগে দেবদাসের পোস্টে লাইকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দেবদাস ফেসবুকে বেশ দরিদ্র টাইপের। একটা পোস্ট দিলে বড় জোর ২০-৩০টা লাইক পড়ে। বিভিন্ন জনের ইনবক্সে হানা দিয়েও লাইক বাড়াতে পারেনি। ফেসবুকে লাইক বাড়ানোর জন্য অটোলাইক সিস্টেম ব্যবহার করল দেবদাস। এখন সে একটা পোস্ট দিলে হাজারও ছাড়িয়ে যায়। দেবদাস অটোলাইক সিস্টেম শিখেছে এক ফেসবুক সেলেব্রিটি থেকে। ইদানীং দেবদাসের পোস্টে পার্বতীও লাইক দেয়।
কিভাবে যেন দেবদাস পার্বতীর প্রেম হয়ে যায় তা ঠিক জানা যায়নি। দুইজন এখন নিয়মিত চ্যাট করে। সময় পেলে ডেটিংয়ে বের হয়। দেবদাস পার্বতীর পেছনে খরচ করতে করতে প্রায় ফতুর হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। বহু কষ্টে জোগাড় করা টিউশনির পুরো টাকাটাই ইনভেস্ট করা হয় পার্বতীর পেছনে। কিন্তু এত অল্প টাকা ইনভেস্ট করলে প্রেম কিভাবে টিকবে? পার্বতী খুবই রূপসচেতন মেয়ে। পার্বতী আটা ময়দা মাখার পাশাপাশি নানা রকম প্রসাধনী ব্যবহারে বেশ অগ্রগামী। এসব টাকা ম্যানেজ করার দায়িত্ব দেবদাসের উপর পড়েছে। পার্বতী সাফ জানিয়ে দিয়েছে, প্রেম করতে চাইলে এসব ম্যানেজ করতে হবে। অন্যথায় রাস্তা মাপো। দেবদাস রাস্তা মাপার মতো কঠিন কাজ করতে পারবে না। যেকোনো মূল্যে তার পার্বতীকে চাই-ই চাই। ডাব চুরি, বাবার পকেট মারা এইভাবে সেইভাবে টাকা জোগাড় করে পার্বতীর নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করছে দেবদাস।
কয়েক দিন ধরে পার্বতীকে ফেসবুকে অ্যাক্টিভ পাওয়া যাচ্ছে না। ফোন দিলে রিসিভ করে না। দেবদাসের মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে লাগল। দু’তিন দিন পর পার্বতীকে অনলাইনে দেখা গেল। দেবদাসের অস্থিরতা কিছুটা কমে যায়। দেবদাস পার্বতীকে জিজ্ঞেস করে,
-পার্বতী তোমাকে অনলাইনে দেখি না কেন?
-কয়দিন পর আর মোটেও দেখবা না।
-মানে কি?
-মানে হইলো আমার বিয়ে।
-বিয়ে? কি বলছ এসব?
পার্বতী দেবদাসের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই ব্লক করে দেয় দেবদাসকে। দেবদাস দ্রুত পার্বতীকে ফোন দেয়। কিন্তু মোবাইল বন্ধ। সব মেয়েই নাকি বিয়ের আগে সাবেক প্রেমিকাকে ব্লক মারে। আর নিজের সিমকার্ড পরিবর্তন করে। পার্বতীও তার ব্যতিক্রম না। দেবদাসের মনের আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা। কে তাকে আশা দেবে, কে তাকে ভরসা দেবে? পার্বতীর জন্য বন্ধুবান্ধব থেকে দূরে সরে গিয়েছিল দেবদাস। তাই এই বিপদের বন্ধুদের পাশে পাচ্ছে না দেবদাস।
পার্বতীর বিয়ের দিনণ ঠিক হয়ে গেল। জানা গেল পাত্র অনেক পয়সাওয়ালা। ফেসবুকেই তাদের পরিচয়। অনেক দিন ফেসবুকে চুটিয়ে প্রেম করার পর এখন পরিণয়ের দিকে গড়াচ্ছে। পাত্রের বয়স একটু বেশি। একটু বেশি বললে ভুুল হবে অনেক বেশিই। আগে এক বিয়ে হিয়েছে। সে ঘরে সন্তানও আছে। তবে পাত্রের অঢেল সম্পত্তির কাছে এসব কোনো ব্যাপার না। কথিত আছে, টাকাপয়সা থাকলে কিছু মেয়ের কাছে পাত্রের শত দোষ বা সমস্যা থাকলেও সেটা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। পার্বতীর েেত্রও তাই ঘটেছে। এ দিকে পার্বতীর বিরহে কাতর দেবদাস। তার খুব ইচ্ছা পার্বতীর স্বামী দেখতে কেমন। বেশ কৌতূহল নিয়ে পার্বতীর বিয়ের দিন চুপি চুপি বিয়ে বাড়িতে হাজির দেবদাস। আফ্রিকান মাগুর মাছের মতো ইয়া মোটা, কালো এক পুরুষের পাশে হাস্যোজ্জ্বল পার্বতী বসে আছে। দেবদাস নিজেকে কিছুতেই বোঝাতে পারল না, কেন পার্বতী এই লোকটাকে বিয়ে করতে রাজি হলো, তার কোনো উত্তর খুঁজে পেল না দেবদাস।
হঠাৎ করে দেবদাসের জীবনে এক সাইকোন নেমে এলো। এই বিপদের তার পাশে এসে দাঁড়ায় চন্দ্রমুখী। চন্দ্রমুখী দেবদাসকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। চন্দ্রমুখী নিজেও ছ্যাঁকা খেয়েছে। তাই সে বোঝে ছ্যাঁকার কি কষ্ট! দেবদাস তার প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেয়। এত দ্রুত সে পার্বতীকে ভুলতে পারবে না। তা ছাড়া দেবদাস আর কোনো মেয়েকে বিশ্বাস করে না। এ কথা সাফ জানিয়ে দেয় চন্দ্রমুখীকে। একবার ছ্যাঁকা খেয়ে যে আক্কেল দেবদাসের হয়েছে, তার রেশ কতদিন থাকে তা দেখার বিষয়।
দেবদাস পার্বতীকে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। শয়নে স্বপনে শুধু পার্বতী। বন্ধুরা সান্ত্ব—¡না দিতে এলে দেবদাস বলে, দেখবি পার্বতী তার ভুল বুঝে ঠিকই চলে আসবে। এ কথা শুনে এক বন্ধু বলল, এই তোরা দেবদাসরে এখানে রেখে চলে যা। ওর ব্রেন আউট হয়ে গেছে। দেবদাসের মানসিক অবস্থা যত না খারাপ, সে এর চেয়ে বেশি অভিনয় করে।
খোঁচা খোঁচা দাড়ি রেখেছে দেবদাস। সারাদিন বটগাছের নিচে বসে বিড়ি টানে। দেবদাসের বাবা ভালো করেই জানে, এটা দেবদাসের অভিনয়।
-শোন দেবু, এসব অভিনয় ছাড়। আমার সাথে এসব করবি না। আমি পুরনো খেলোয়াড়। আমি এসব বুঝি। বিকাল হওয়ার আগেই যেন তোরে ঘরে দেখি।
এ কথা বেশ ধমকের সুরে বললেন দেবদাসের বাবা। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো। বটগাছের নিচ থেকে দেবদাসের সরার কোনো নামগন্ধও নেই। সেখানেই বসে আছে দেবদাস। হঠাৎ দূরে আবছা আবছা কিছু দেখা গেল। কিছুণ পর পরিষ্কার হয়ে গেল ব্যাপারটা। দেবদাসের বাবা একটা লাঠি নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে দেবদাসের দিকে এগিয়ে আসছে। দেবদাস তার বাবাকে দেখে ভোঁ দৌড় দেয়। দেবদাস দৌড়াচ্ছে পেছনে লাঠি নিয়ে তার বাবা দৌড়াচ্ছে।
এরপর দেবদাসের কি হলো তা জানা যায়নি। 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.