জমজম কূট
জমজম কূট

স্রষ্টার অপূর্ব নিদর্শন জমজম কূপ

ড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান

আরবের মক্কা নগরে অবস্থিত জমজম কূপ মহান স্রষ্টা আল্লাহর রহমতের উৎস ও অন্যতম অপূর্ব নিদর্শন। মুসলিম ইতিবৃত্তে এ কূপটির উৎপত্তি হজরত ইবরাহিম আ: এবং তার স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাঈল আ:-এর জীবন কাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম পবিত্রময় একটি কূপ। কাবাগৃহের ফজিলতের সাথে জমজম কূপের মাহাত্ম্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

নামকরণ
জমজম আরবি শব্দটির অর্থ হচ্ছে প্রাচুর্য, সঞ্চিত হয়ে জমা হওয়া। যেহেতু সূচনা থেকেই এতে পানির প্রাচুর্য লক্ষ করা গেছে এবং ব্যবহারের ফলে হ্রাসপ্রাপ্ত না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে তাই এর এই নামকরণ।

অবস্থান
জমজম কূপটি হারাম শরিফে পবিত্র কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের যে স্থানে হাজরে আসওয়াদ অবস্থিত, তার বিপরীত দিকে ২০ মিটার (৬৬ ফুট) দূরে অবস্থিত। প্রায় ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং ১৪ ফুট চওড়া একটি আয়তক্ষেত্রের মতো কূপটি। গভীরতা ১৪০ ফুট।

ইতিহাস
হজরত ইব্রাহিম আ: হজরত ইসমাঈল আ:-এর জন্মের কিছু দিন পর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসমাঈল আ:-কে তার মা বিবি হাজেরা আ:-সহ পবিত্র মক্কার অখ্যাত এক উপত্যকায় আবাসন দেয়ার আদেশপ্রাপ্ত হলেন। হজরত ইব্রাহিম আ: মহান আল্লাহর নির্দেশে বর্তমান কাবাগৃহের কাছে জনমানবহীন এক নির্জন প্রান্তরে কিছু খেজুর এবং একটি মশকে কিছু পানি দিয়ে ইসমাঈল আ: ও তার মা হাজেরা আ:-কে রেখে আসেন।

ভীতিপ্রদ এ অঞ্চলে বসবাস করা একজন নারীর জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও অসহনীয় ব্যাপার ছিল। কঠিন পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে হজরত ইব্রাহিম আ: নিজেও চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।

তিনি সওয়ারি পশুর লাগাম ধরে অশ্রুসজল নয়নে স্ত্রী ও পুত্রকে বিদায় জানানোর সময় হজরত হাজেরা আ:-কে বললেন, ‘হে হাজেরা! এ সব কিছু মহান আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী করা হয়েছে। আর তাঁর আদেশ পালন করা থেকে পালিয়ে বেড়ানোর কোনো পথ নেই। মহান আল্লাহর দয়া ও কৃপার ওপর নির্ভর করো। আর নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করো যে, তিনি আমাদের লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করবেন না।

এরপর তিনি মহান আল্লাহর কাছে একাগ্রতাসহকারে প্রার্থনা করে বললেন, ‘হে প্রভু! এ স্থানকে নিরাপদ শহর ও জনপদে পরিণত করো। এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা মহান আল্লাহ ও শেষ বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে তাদের বিভিন্ন ধরনের ফল ও খাদ্য রিজিক হিসেবে প্রদান করো’। (সূরা বাকারা : ১২৬)।

হজরত ইব্রাহিম আ: চলে যেতে থাকায় হজরত হাজেরা আ: হজরত ইব্রাহিম আ:-এর কাছে আবার জানতে চাইলেন, আল্লাহ কি আপনাকে এ কাজের নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন হজরত হাজেরা আ: বললেন, ‘তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না’।

হজরত হাজেরা আ: যথাস্থানে ফিরে এলেন। আর ইব্রাহিম আ: সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখান থেকে স্ত্রী-পুত্র তাঁকে দেখতে পাচ্ছে না, সে সময় তিনি কাবার দিকে মুখ করে দুই হাত তুলে এ দোয়া করলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের কাছে, যাতে তারা সালাত কায়েম করতে পারে। তুমি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রুজি দান করো, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে’ (সূরা ইব্রাহিম : ৩৭)।

এ দোয়া করে হজরত ইব্রাহিম আ: চলে গেলেন। কিছু দিন পর মশকের পানি ফুরিয়ে গেলে হাজেরা আ: এবং ইসমাঈল আ: তৃষ্ণায় ছটফট করতে লাগলেন। হজরত হাজেরা আ: পানির সন্ধানে ছুটলেন। নিকটস্থ সাফা পর্বতে আরোহণ করে তিনি চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করলেন- কোথাও পানি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না বা কোনো কাফেলা এদিকে আগমন করছে কি না। কিন্তু কোথাও কিছু দেখতে না পেয়ে তিনি নেমে এলেন। অতঃপর মারওয়া পর্বতে আরোহণ করে চতুর্দিকে তাকিয়ে কিছু না পেয়ে আবার নেমে এসে সাফা পর্বতে আরোহণ করলেন।

এভাবে সাফা এবং মারওয়া পর্বতে সাতবার আরোহণ ও অবরোহণ এবং দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে উদ্বিগ্নভাবে ছোটাছুটি করলেন। অবশেষে তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ের ওপর তখন নিচে একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং সেখান থেকে ইসমাঈল আ:-এর কাছে ফিরে এলেন। তিনি একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন, যিনি নিজের পায়ের গোড়ালি বা ডানা দ্বারা মাটিতে আঘাত করলেন, আর অমনি সেই স্থানে একটি পানির ধারা প্রবাহিত হলো। এটাই পরবর্তীকালে জমজম কূপ নামে খ্যাত হয়।

হজরত হাজেরা আ:-এর চতুর্দিকে প্রস্তর দ্বারা বাঁধ নির্মাণ করে একে হাউজের মতো করে দিলেন এবং সর্বপ্রথম পানি ধরে রাখেন। অতঃপর তিনি পানি পান করলেন এবং তার পুত্রকে দুধ পান করালেন।

পৌত্তলিক যুগে জুরহুমিরা শত্রুতাবশত কূপটি বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে মহানবী সা:-এর পিতামহ আবদুল মুত্তালিব কূপটি পুনরায় আবিষ্কার করে খনন করে এর চতুর্দিকে পাকা প্রাচীর নির্মাণ করে দেন। সে থেকে আজ অবধি মহান স্রষ্টা আল্লাহর অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে সেখান থেকে অনবরত প্রয়োজনীয় পানি বের হয়ে আসছে।

বৈশিষ্ট্য
জমজম কূপ কখনো শুকিয়ে যায়নি। বরং পানির চাহিদা যত বেড়েছে, কূপের পানির সরবরাহও সে অনুপাতে বেড়ে গেছে।

জমজম কূপের পানিতে লবণাক্ততা এবং স্বাদ সুদূর অতীতে যেমন ছিল বর্তমানেও তাই আছে।

লাখো কোটি লোক এর পানি পান করে কেউই এ কথা বলতে পারেনি যে, এর পানি পান করে আমার অসুবিধা হয়েছে। বরং এর পানি রোগ নিরাময়ক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

প্রত্যেক হাজী তৃপ্তিসহকারে জমজমের পানি পান যেমন করেন, তেমনি দেশে ফেরার সময় ক্যানভর্তি পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নিয়ে আসেন।

জমজম কূপের পানি কখনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের প্রয়োজন হয়নি।

এ পানিতে ক্লোরিন মেশানো হয়নি বা ক্লোরিন দ্বারা জীবাণুমুক্ত করা হয়নি। যেমন বিভিন্ন নগর, জনবহুল এলাকায় সরবরাহকৃত পানি ক্লোরিনের সাহায্যে পরিশোধিত করা হয়।

পানিতে সাধারণত জলজ উদ্ভিদ, শৈবাল, শেওলা বা ক্ষুদ্র আলজি জন্মেÑ এগুলোতে প্রাণ থাকে এবং উষ্ণতায় বা বিষাক্ততায় তা মরে যায়। পানিতে জীবাণুর জন্ম হয়। এর ফলে পানির স্বাদ ও গন্ধ নষ্ট হয়। কিন্তু জমজমের পানিতে কখনো জলজ জীবাণু বা উদ্ভিদের জন্ম হয়নি।

ফুটন্ত বা পরিশোধিত জীবাণুমুক্ত পানি রেখে দিলেও কিছুকাল পর তাতে জলজ উদ্ভিদ বা জীবাণুর সৃষ্টি হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় টিন, ক্যান বা বোতলে জমজমের পানি রেখে দিলেও এতে কোনো জীবাণু সৃষ্টি হয় না।

জমজম কূপের পানিতে ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম সল্টের পরিমাণ মক্কার অন্যান্য কূপের চেয়ে বেশি বলে এর পানি খেয়ে ক্লান্ত হাজীদের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।

শিক্ষা
মহান আল্লাহর হুকুমকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে স্ত্রী-পুত্রসহ সব কিছু ত্যাগ করতে হবে।

সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে ও তার ওপর ভরসা করতে হবে।

পরিবার ও সন্তানদের জন্য দোয়া করতে হবে।

একক কিংবা যৌথ উদ্যোগে সামাজিক কাজ সম্পাদন করতে হবে।

হজরত হাজেরা আ: এর মতো সুদৃঢ় ঈমানের অধিকারী হওয়ার জন্য সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।

আল্লাহর আনুগত্য ও ধৈর্যের পরিণাম সর্বদা কল্যাণকরই হয়।

জমজমের পানি পান করার নিয়ম
জমজমের পানি কিবলামুখী হয়ে বিসমিল্লাহ বলে তিন নিঃশ্বাসে দাঁড়িয়ে পান করা উত্তম। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেন, ‘আমি জমজমের পানি মহানবী সা:-এর কাছে পেশ করলাম। তিনি তা দাঁড়িয়ে পান করলেন’ (বুখারি)।

জমজমের পানি পান করার দোয়া : ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে পর্যাপ্ত জীবন-উপকরণ, উপকারী জ্ঞান এবং সব রোগ থেকে নিরাময় প্রার্থনা করি।’ এর পানির দ্বারা উপকার লাভ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। খালেছ নিয়তে তা পান করলে উপকার লাভ অবশ্যম্ভাবী।

বরকতময়
হজরত আয়েশা রা: জমজমের পানি সাথে করে মদিনায় নিয়ে আসতেন, আর বলতেন, রাসূলুল্লাহ সা: তা বহন করে নিয়ে আসতেন (তিরমিজি)।

শেষ কথা
পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম পানি হলো জমজমের পানি। সুদূর অতীত থেকে আম্বিয়ায়ে কেরাম, আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দারা, সিদ্দিকিন, সালেহিন প্রমুখ এই কূপের পানি পান করেছেন এবং এখনো পান করছেন। এই বরকতময় কূপ আল্লাহর রহমতে কিয়ামত পর্যন্ত অটুট থাকবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.